অনুবাদ: শওকত হোসেন
পামুকের ইংরেজি অনুবাদক হিসেবে কীভাবে শুরু করেছিলেন?
আমি আসলে লন্ডনে ওরহান পামুকের প্রতিনিধিত্বকারী এজেন্সিতে কর্মরত একজন লিটারেরি এজেন্ট। মূলত রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু কয়েক বছর আগে, কাজ শুরুর অল্পদিন পরই আমার বস— ওরহানের এজেন্ট তিনি— নতুন অনুবাদকের খোঁজ করার কথা বললেন। আমি তুর্কি হওয়ায় তাকে সাহায্য করতে বললেন আমাকে। তো আমি বললাম, আমার কথাও ভেবে দেখতে পারেন তিনি। নমুনা অনুবাদ করলাম আমি। ওরহানের সেটা পছন্দ হলো। সেই থেকে শুরু।
অনুবাদে কি আপনার কোনো পটভূমি ছিল, নাকি হঠাৎ করেই হয়ে গেছে?
অনুবাদে আমার কোনো পটভূমি নেই। এ নিয়ে কখনো পড়াশোনা করিনি, এমনকি আগে এ কাজ করিওনি। কিন্তু তিনটি ভাষায় কথা বলতে পারি আমি। আমার জন্ম তুরস্কে, বড় হয়েছি ইতালিতে। তো বরাবরই আমি একাধিক ভাষার সঙ্গে বাস করেছি। এক অর্থে সারা জীবনই সবকিছু অনুবাদ করেছি— আরো কম কঠিন, দৈনন্দিন প্রেক্ষিতে। কোনো ভাবনা বা টেক্সটের ভিন্ন ভাষায় অনুবাদের চিন্তার সঙ্গে সবসময়ই পরিচিত ছিলাম আমি।
২০১৫ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত ‘আ স্ট্রেঞ্জনেস অব মাই মাইন্ড’-এর পর ‘দ্য রেড হেয়ার্ড উওম্যান’ আপনার অনূদিত ওরহান পামুকের দ্বিতীয় উপন্যাস। এ দুটি অভিজ্ঞতা কোন দিক থেকে ভিন্ন?
পাঁচ-ছয় বছর আগে ওরহানের লেখা ইস্তাম্বুলে তার মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স সম্পর্কে লেখা ‘দি ইনোসেন্স অব অবজেক্টস’ নামে একটা ক্যাটালগও তর্জমা করেছিলাম আমি। তবে সেটা তুলনমূলকভাবে খুদে টেক্সট ছিল এবং উপন্যাস থেকে একেবারেই ভিন্ন। দুটো উপন্যাসের তুলনার বেলায় একটি অন্যটির অর্ধেক দৈর্ঘ্যের। অনুবাদ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সময়ের সঙ্গে খাপে খাপে মিলে যায়। ‘আ স্ট্রেঞ্জনেস অব মাই মাইন্ড’ অনুবাদ করতে চার মাসের কিছু বেশি সময় লেগেছে। আর ‘দ্য রেড হেয়ার্ড উওম্যান’ অনুবাদে লেগেছে দুই মাস।
কিন্তু দৈর্ঘ্য বাদে এগুলো একেবারেই অন্য ধরনের বই। ‘আ স্ট্রেঞ্জনেস অব মাই মাইন্ড’-এর গোটা উপন্যাসজুড়ে দেখা দেয়া বহু চরিত্র আর কণ্ঠস্বর ধারণ করছে। বিস্তারিত বর্ণনার দিক থেকে এটা প্রায় ডিকেন্সনীয়, ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে। ‘দ্য রেড হেয়ার্ড উওম্যান’-এরও নিজস্ব চ্যালেঞ্জ ছিল। একদিক থেকে এটা দার্শনিক ধরনের। আমার মনে হয়, এর অংশবিশেষকে আপনি চিন্তার পরীক্ষা বলেই ভাবতে পারবেন। সুতরাং এ দুটি সম্পূর্ণই ভিন্ন ধরনের বই।
অনুবাদ প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু বলুন। কীভাবে এগোয় এটা? প্রথমে তুর্কি ভাষায় প্রকাশের অপেক্ষা করেন, নাকি পামুক লেখা শেষ করামাত্র শুরু করে দেন?
ব্যাপারটা নির্ভর করে। ‘দ্য রেড হেয়ার্ড উওম্যান’-এর বেলায় আমি অনুবাদ শুরু করার সময়ই তুর্কি ভাষায় ওটা বের হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং আমার কাছে একটা বাস্তব কপি ছিল। কিন্তু ‘আ স্ট্রেঞ্জনেস অব মাই মাইন্ড’-এর ক্ষেত্রে ওরহান লেখা শেষ করতে করতে অর্ধেক তর্জমার কাজ শেষ করে ফেলেছিলাম। তবে সেটা আসলে দুর্ঘটনাক্রমেই ঘটেছে, প্রকাশনার সময়সূচির ব্যাপার।
পামুকের আগের অনুবাদক মরিন ফ্রিলি ইস্তাম্বুলের অদূরে বিউকাদা দ্বীপে পামুকের সঙ্গে প্রায় প্রতিটি পঙিক্ত নিয়ে দীর্ঘ, বিতর্কপূর্ণ আলোচনার কথা বলেছেন। আপনিও কি তার সঙ্গেই কাজ করেন, নাকি একা থাকতে দেয়া হয় আপনাকে?
ওরহানের সঙ্গে খুবই নিবিড়ভাবে কাজ করি আমি। ওর ইংরেজি অত্যন্ত ভালো, তাই গোটা অনুবাদ পড়ে মন্তব্য করতে পারেন। তাকে আমি খুব বেশি তর্কপ্রিয় হতে দেখেনি। হয়তো স্রেফ আমার কপাল ভালো ছিল। দিন শেষে ফলদায়ী একটা কিছু পেতে চেয়েছি আমরা। এ ধরনের প্রেক্ষিতে লেখক কী বলতে চাইছেন, সেটা সবচেয়ে ভালো করে তিনিই জানেন। তো পরামর্শ কোনোভাবে শুদ্ধ না হলে আমি সাধারণত তার মূল্য দেখতে পাই।
মতদ্বৈধতার মূল জায়গাগুলো কী?
একই ধরনের ধারণা প্রকাশে ইংরেজিতে তুর্কি ভাষার তুলনায় অনেক বেশি শব্দ রয়েছে। তো মোটামুটি ঘন ঘন যে জিনিসটা উঠে আসে সেটা হলো, তুর্কি ভাষ্যে পুনরাবৃত্তি হওয়া কোনো শব্দকে ইংরেজিতে অন্য কিছু নিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় কিনা। এটা দুটো ভাষা এবং তাদের শব্দভাণ্ডারের ভেতর পার্থক্যের স্বাভাবিক পরিণাম।
আমি শুনেছি যে, তিনি যতদূর সম্ভব তুর্কি ব্যাকরণগত কাঠামো বজায় রাখার চেষ্টা করতে চান। তুর্কি ইংরেজি ভাষার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মধ্য এশিয়ায় জন্ম নেয়া একটা ভাষা পরিবার থেকে এসেছে। সুতরাং শব্দ ও বাক্য গঠন একেবারেই আলাদা। তো পামুক যতদূর সম্ভব ওই কাঠামো বজায় রাখতে চাইলে তো ব্যাপারটা খুবই চ্যালেঞ্জিং হওয়ার কথা।
আমাদের আলোচনায় লাইন ধরে বিস্তারিততে যাওয়ার দিকে যাই না। কোনো একটা বিশেষ অংশের কোনো কোনো শব্দ নিয়ে হয়ে থাকে সেটা। সুতরাং আমি এমন কোনো অবস্থায় পড়িনি, যেখানে তিনি আমাকে তুর্কি ভাষায় বাক্যের শেষে ক্রিয়াপদ আছে বলে ইংরেজিতেও সেভাবে রাখতে বলেছেন। অনুবাদক হিসেবে আমার মনে হয়, কাঠামোর পাশাপাশি টেক্সট কী বলছে, সেদিকেও বিশ্বস্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটুকুই করার আছে আপনার। বেশি বাড়াবাড়ি করে বসলে স্রেফ খারাপ দেখায়।
আমার তো মনে হয়, অনুবাদের ক্ষেত্রে এটা একটা বিরাট বিতর্ক: নির্ভুলতা নাকি সাবলীলতা?
হ্যাঁ, এটা অন্যতম বড় বিতর্কের বিষয়। এ বিষয়ে আমার কোনো একাডেমিক পটভূমি নেই। তবে পাঠক হিসেবে নিজের রুচি মোতাবেক কাজ করে যাই। কোনো একটা অনূদিত টেক্সট পড়ার সময় সম্ভব হলে সেটা অনুবাদ হওয়ার কথাটা ভুলে যেতে চাই। খোদ এ ব্যাপারটাই যে বিতর্কমূলক অবস্থান, সে ব্যাপারে আমি সজাগ।
অনূদিত উপন্যাসের অনূদিত হওয়ার বাস্তবতা থেকে পাওয়া এক ধরনের মূল্য থাকে। ক্লীশে শোনাতে পারে, এটা পাঠকদের জন্য এক জগতের সেতু। তো অনুবাদ পড়ার কথা ভুলে যাওয়ার কথা বলা বলতে গেলে যেন বোঝাতে চায় যে, এটা অপ্রাসঙ্গিক। তো আমি জানি, কোনো টেক্সটের অনূদিত কথা ভুলে যাওয়া উচিত বলার মানে সম্ভবত বিষয়কে বেশি সরলীকৃত করে ফেলা। কিন্তু একই সময়ে আপনি যে ভাষায় পড়ছেন, সেটি ওই ভাষায় লেখা হয়নি মনে হলে চট করেই পড়ার বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারেন।
সুতরাং আমার একাডেমিক ও ব্যক্তিগত কৌশল হলো অনুবাদক হিসেবে আমি যা করছি, সেটা হলো মূল টেক্সটের প্রতি যতদূর সম্ভব বিশ্বস্ত থাকা, কিন্তু পড়লে মনে হবে, ইংরেজিতেই লেখা হয়েছে হয়তো।
মরিন ফ্রিলি ২০০০ সালের দিকে পামুককে ঘিরে থাকা নানা রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এসব ব্যাপারে আপনি কি উদ্বেগ বোধ করেন, নাকি এসব দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন?
তুর্কি হিসেবে এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই। ওরহান পামুকের বই অনুবাদ করার বহু আগে থেকেই এসব আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলত। আমি এখন তার চেয়ে বেশি জড়িত বা উদ্বিগ্ন নই। গত কয়েক বছরে এর সঙ্গে সম্পর্কিত নেতিবাচক কোনো কিছুর অভিজ্ঞতা আমার হয়নি। সম্ভবত ১০ বছর আগের বিচারে এখন তুর্কি খবরে ওরহানের কম উপস্থিতি এর কারণ। সুতরাং এ পর্যন্ত আমার ভাগ্য ভালোই যাচ্ছে।
তুরস্কে অনেকে দাবি করে থাকেন যে, পামুকের ইংরেজি অনুবাদকরা তার কথাকে ‘উন্নত’ কিংবা ‘পাশ্চাত্যকরণ’ করে থাকেন, যার মানে তিনি তুর্কি ভাষায় তেমন ভালো নন। আপনি এ সমালোচনা সম্পর্কে কী বলবেন?
আমি তার এ ধরনের মন্তব্য শোনার ব্যাপারে অবগত। এর সঙ্গে সত্যির কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে করি না। অনুবাদকের পক্ষে কোনো লেখকের রচনাকে পাল্টে না ফেলে ‘উন্নত’ করা সম্ভবই না; আর কোনো অনুবাদকেরই লেখকের রচনাকে পাল্টে ফেলা উচিত নয়। লেখকের ভূমিকায়ই মুখ্য। সারা পৃথিবীতে ওরহানের রচনা বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সুতরাং কেবল ইংরেজি অনুবাদকদের কল্যাণেই তিনি জনপ্রিয় বোঝানো ভ্রান্তিমূলক। এটা চীনা, ফরাসি, জার্মান, ইতালিয়সহ আরো ডজনখানেক ভাষায় তার বই নিয়ে কাজ করা অন্য অনুবাদকদের কাজও নাকচ করে দেয়। এ সমালোচনার ভেতর রাজনৈতিক উপাদান আছে বলে আমি মনে করি এবং ভিত্তিহীন বলেই মনে হয়।
ইংরেজিতে তার বই পড়তে গিয়ে অনেকেই অসুবিধার মুখে পড়েন— সম্ভবত তুর্কি ভাষায়ও সমানসংখ্যক পাঠকও তাই। সুতরাং ইংরেজিতে তার খুব বেশি জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
আমার মনে হয়, সত্যিকারের রচনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই, বরং অতীতে তার প্রকাশ করা অবস্থানই এর কারণ, যা খুব ভালোভাবে গ্রহণ করা হয়নি।
এ মুহূর্তে অনুবাদই কি আপনার মুখ্য মনোযাগের বিষয়, নাকি আরো অনেক কাজ রয়েছে হাতে?
আমি পূর্ণকালীন লিটারেরি এজেন্টের কাজ করি এবং বছরদুয়েক বিরতিতে ওরহান পামুক কোনো বইয়ের কাজ শেষ করলেই অনুবাদের জন্য কিছুদিন ছুটি নিই। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে রাতে অনুবাদ করতে পারলেই ভালো হতো, কিন্তু আমার পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। ছুটি নিয়েই অনুবাদে ডুবে যেতে হয় আমাকে, কাজ শেষে আবার ফিরে আসা। ওরহান এখন একটা নতুন বই লিখছেন, কিন্তু এখনো ওটার কোনো শব্দও দেখিনি, তো ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছি আমরা।






