সে ও বার্গম্যান আমার জীবনে প্রথম এসেছিল। আজ সে নেই, ব্যারিম্যান আছেন। সে মানে ঋ। আমার শেষ কৈশোরে আমি তাকে বলতাম, বার্গম্যান। অনেকদিন পর অনুবাদক আলম খোরশেদ শেখালেন, তিনি ইংমার ব্যারিমান, একদিন কথা প্রসঙ্গে। প্রথম যেদিন ব্যারিম্যান আমার জীবনে এলেন, তিনি প্রধান ছিলেন না, ছিলেন পার্শ্বজন। মনে পড়ে, প্রথমবার ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ আমি আর ঋ। ইসাক বর্গ যখন নস্টালজিক হন, ফিসফিস করে তার কানে বলেছিলাম, তুমিও একদিন চলে যাবে আর আমি এভাবে স্মৃতির গন্ধ নেব। শেষ সারির দেয়ালঘেঁষা আসনের সুবিধা পুরোপুরি নিয়ে কানের লতিতে মৃদু চুমু ভুলি কী করে, তখন তো বুনো স্ট্রবেরি, ভিন্ন তাত্পর্যে, আমাদের জীবনে। সেসব দিনে ছিল গ্রীষ্মের উষ্ণতা ও মনিকার উচ্ছলতা। ‘একদিন এভাবে পালানো গেলে মন্দ হতো না’, ‘সামার উইথ মনিকা’ শেষে বলেছিলাম। আজ গ্রীষ্ম ভিন্ন তাত্পর্যে, আবহাওয়ার মতো একটা বাস্তব জিনিসের কি স্মৃতিকাতর মনের ওপর প্রভাব বেশি? শীতে হাড় হিম হয়ে আসে যেন, এমনকি মজ্জার ভেতর লিখিত হয় তোমাকে আর ছুঁতে পারব না এই বোধ। ইংমার ব্যারিম্যানের লেখাপত্র ছুঁয়ে দেখি ব্যক্তিগত পল্লবগ্রাহীতায়, দেখি যে স্পর্শ করার গহনবাসনা তিনিও লালন করতেন, সিনেমায়। এখন প্রযুক্তিদীর্ণ সময়ে আমরা কি আত্মার ভেতর খনন বিস্মৃত হয়েছি? আমাদের সবার ভেতর একজন ব্যারিম্যান আছেন মনে হয়, সাদা-কালো, একা আর শীতল। অনেকদিন ফারো দ্বীপ স্বপ্নে এসেছে। ধূসর, নিরস এক দ্বীপ। ছোট সব গাছ, বাতাসের উৎপাতে আকাশের দিকে বেড়ে উঠতে পারে না, পাথর সত্যিকার পাথুরে। যেন এই দ্বীপ সৃষ্টির অনাদিকাল থেকে আছে। টাইম আর স্পেসের বোধ লুপ্ত হয়ে আছে। কিছুই ঘটে না সেখানে, কোনোদিন ঘটেনি আর ঘটবে না। ইংমারের ঘরের জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে দ্বীপের কজন সদস্য ভেড়া ও আমি উঁকি দিই। দেখি, তিনি কাজ করছেন। চিঠি লিখছেন হয়তো, পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করি: প্রিয় ইনগ্রিড, চুক্তি ভঙ্গ করে চলে যাওয়া ঠিক হলো? ২৪টা বছর ধরে যে যৌথ স্বপ্ন দেখে গেলাম, তা থেকে উঠে মসৃণভাবে চলে গেলে কেন? তুমিই তো ফারোর সম্রাজ্ঞী। এক বছর ধরে আস্তে আস্তে, যেন হাতের মুঠোয় ধরা বালির মতো গলে যাচ্ছিলে তুমি। এখন জীবন অর্থহীন। কেবল ঘড়ি দিয়ে কাজ করে যাওয়া। তুমি...’, পা টিপে সরে আসি, পেছাতে পেছাতে দেখি, একটা বিশাল মাকড়সা আমার দিকে ধেয়ে আসছে আর আমার ঘুম ভেঙে যায়, সারা মুখে ঘাম। এমনই ব্যারিম্যানিয়াক ছিলাম একদিন।

মনে আছে, ১ আগস্ট ২০০৭-এর দুপুরের দিকে পড়েছিলাম, ৩০ জুলাই পরপর দুজন ফিল্ম টিচার চলে যাওয়ার খবর আর কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম তোমাকে জড়িয়ে ধরে। আমার নিজের ঘর ছিল না, বন্ধুর ব্যালকনি ছিল। তুমি ওড়নায় চোখ মুছে দিয়েছিলে আর বলেছিলে, ছেলেদের চোখে জল মানায় না। বলেছিলাম, বাবা মারা গেলেও কাঁদব না! তুমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলে। ঋ, ১১ বছরের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আজ বলি, লেখালেখি কিংবা সিনেমা দেখা কিংবা তোমাকে ভালোবাসা কোনোটাই পাস টাইম ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের বছর সুইডেনে বাতিল রাশিয়ান ফিল্মের ক্যানের স্তূপ থেকে আবিষ্কার করলেন তারকোভস্কিকে। সঙ্গী বন্ধু পরিচালক বেলগ্রেড। মেশিনচালককে ঘুষ দিয়ে দেখতে বসা ফিল্ম আন্দ্রেই রুবলভ। ঋ, ফুটপাত থেকে কিনে দেয়া ফিফটি রাশিয়ান আর্টিস্টের সেকেন্ড এন্ট্রি ছিলেন ইনি, আজো অভ্রান্ত মনে পড়ে। ব্যারিম্যানের মাথা খারাপ হয়ে গেল, ফিল্মটা দেখে, চোখ লাল সত্ত্বেও আবিষ্কার করলেন, সাবটাইটেল তো ছিল না, তবু বোঝা গেল কী করে! শরীর আর বেদনার ভাষা কি সাবটাইটেলরহিত আন্তর্জাতিক? যেমন কিনা ক্ষুধা, কান্না আর একলা থেকে যাওয়ার ভাষা? বিদ্রোহের? ২০ মিনিটের জন্য দেখা হয়নি এ দুই মহাশিল্পীর। পাশাপাশি দুটো ধূমকেতুর মতো পরস্পরকে অতিক্রম করে গেছেন তাঁরা। স্যাক্রিফাইস ছবির শুটিং যখন চলছিল গটল্যান্ডে, ইতিহাস হতে পারত একদিন, হলো না। পরে ব্যারিম্যান লেখেন কোথাও একটা, ভাষার দূরত্বের কারণেই দেখা করতে যাননি এবং এটা অনুশোচনা হয়েই রয়ে যায় সব সময়, কেননা তিনি জীবনবোধের জন্য ভালোবাসতেন তারকোভস্কিকে। ঋ, এসব আমাকে অস্তিত্বচ্যুত করে, নন্দনের আনন্দ পাই। তুমি কি জানো, জীবনানন্দ দাশ ৬৬ হ্যারিসন রোডের যে মেসবাড়িতে ছিলেন, তার উল্টো দিকেই থাকতেন ব্যোমকেশস্রষ্টা শরদিন্দু? কেউ কাউকে চিনতেন না। ভাবতে পারো! তোমার কি মনে হয় না, জীবনানন্দের জীবদ্দশায় উপন্যাসগুলো আলোর মুখ দেখলে বাংলা গদ্য আরেকটু মানুষ হতো! আমি ভাবি, ব্যারিম্যানের এই খ্রিস্টবিশ্বাসে আমূল সমর্পণ সত্ত্বেও শরীর ও মনের এত ভয়ঙ্কর, স্নায়ু ছেঁড়া দোলাচল আর এল না তো!

পুরনো ডায়েরি নোটে দেখি লেখা:

ব্যারিম্যানের সিনেমার কর্তৃত্ববিস্তারী ভাষা তার ব্যক্তিত্বের ঘোর লাগা শক্তির প্রকাশ। তিনি অভিনেতা, কলাকুশলী, প্রযোজক আর দর্শক সবাইকেই সম্মোহিত করে রাখেন। সুইডেনের প্রধান ফিল্ম স্টুডিও সবেনেস্ক ফিল্মিডাস্ট্রিতে চল্লিশের দশক শুরুর দিকে একটা লেখালেখির চাকরির জন্য আবেদন পাঠান। (কেন যেন কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের উক্তি মনে পড়ল, অপ্রাসঙ্গিক, ‘সুনীলেরও বয়ঃসন্ধি ছিল’)। স্টিনা ব্যারিম্যান, চিত্রনাট্য বিভাগের প্রধান, তার সাক্ষাত্কার নেন। ‘তিনি যেন শ্লেষদীর্ণ হাসি নিয়ে নরকের অন্ধকারতম এলাকা থেকে আবির্ভূত হন আমার সামনে’— অনেকদিন পর তিনি স্মৃতিচারণ করেন। ‘কিন্তু তার সেই ঘণ্টা দুই আলাপের টান এমন মারাত্মক ছিল যে, আমাকে স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে পরপর তিন কাপ কফি খেতে হয়েছিল।’ স্টিনা ব্যারিম্যানকে নিতে বাধ্য হলেন।

পাতা ওল্টাই:

তার চলচ্চিত্রপঞ্জিতে তিনি মানুষের মনের সারবস্তু এত ভালো করে নিংড়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন যে, স্টিনার মতো তার প্রেমে না পড়ে আমাদের উপায় থাকে না। নারীকে প্রজ্ঞাবান জীবনীশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে কৃষ্ণ হাসিমাখা তিনি নির্মাণ করেছেন দ্য ম্যাজিসিয়ান, যৌন বিচ্ছিন্নতার ব্যারিমানীয় পাঠ আছে দ্য সাইলেন্সে, থ্রু এ গ্লাস ডার্কলি মানবমনের ইনস্যানিটির গবেষণাগার হিসেবেই প্রায় গোয়েন্দা তত্পরতায় কাজে লাগান কিংবা পার্সোনার বিধুর বধিরতা, স্মৃতিচারণের উজ্জ্বল অশ্রুমালা আছে বুনো স্ট্রবেরিতে, শেষোক্ত ছবিতে ঈশ্বরের সাথেও বোঝাপড়া চেয়েছেন তিনি, যেমন মৃত্যুর সাথে দাবা খেলতে বসে গিয়েছিলেন নাইট আন্তোনিয়াস ব্লক। এভাবে গল্পের খোলসে (মনে রাখতে হবে, তার বেশির ভাগ গল্পের জন্ম নিজস্ব মাথার উর্বর ভূমিতে) তিনি কি এমনকি এ সময়েরও একা মানুষদের যাপন সম্পর্কে কিছু সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন?

মার্ক্সবাদী রাজনীতিতে যুক্ত ছিলাম আমি আর ঋ। সে-ই আমাকে বলেছিল, দেখো, ঋত্বিক ঘটক তোমার বার্গম্যানকে ধাপ্পাবাজ, জোচ্চোর বলছেন। সাতাশের মতান্ধ আমি, প্রশ্নহীন ধরে নিয়েছি ঋত্বিক ঠিক। আজ, প্রায় এক যুগ পর বুঝি, মার্ক্সবাদ অনেক কিছু ব্যাখ্যা করতে পারে না। বস্তুবাদ সমগ্র মানুষের ও সর্বপ্রাণের ইঙ্গিত বোঝে না। একটি ফড়িঙের দুপুরের অবসাদ বোঝে? একটি যুবতীর বোবা শিশুর কাছে মা ডাক শুনতে না পারার বেদনা বিষয়ে লেনিন কিছু বলেছেন? খোদ মার্ক্সই তো হিজড়াদের উৎপাদন কাঠামোয় রাখেননি। জীবনানন্দকে বলা হয়েছিল পলায়নবাদী। মার্ক্সীয় বীক্ষণ বেশির ভাগ সময় এত একপেশে যে, এজন্যই বোধহয় একবার বলেছিলেন, ক্ষমা করবেন, আমি মার্ক্সবাদী নই। জীবনানন্দ আইবুড়ো ভিখারির যৌন সমস্যা নিয়েও চিন্তিত ছিলেন, উপমহাদেশের বামপন্থী বিবেচনায় আত্মার আলোকচিত্র বিবেচনাযোগ্য নয়। এ অঞ্চলে আশাবাদ যেন বৃক্ষে উল্লম্ব ঝুলে থাকা ফল। তবে ঋত্বিক তার আবেগের জায়গা থেকে ঠিক। যারা ব্যারিম্যানের ছবির মনোযোগী দর্শক, তাদের মনে হবে, তিনি আসলে অপূর্ব মনঃসমীক্ষক, তুমুল প্রেমিক। নিজেই লিখেছেন, নিজেকে তার ম্যাজিসিয়ান মনে হয়। কেননা ‘সিনেমার আছে চোখে ধুলো দেয়ার ক্ষমতা’। অথচ তিনি ধুলো দেয়ার চেষ্টাই করেননি, বরং আমাদের দৃষ্টিকে সম্প্রসারিত করেছেন। ঈশ্বরে অবিশ্বাসী ঋত্বিকের পক্ষে ব্যারিম্যানের আস্তিক্যবোধের প্রকৃত তাত্পর্য উপলব্ধি সম্ভব হয়নি। রবীন্দ্রগানের মনোযোগী শ্রোতা যেমন কখনো কখনো প্রার্থনা ও প্রেমের গান নিয়ে দ্বিধান্বিত হন আর শ্রোতার মনে হয়, প্রার্থনা ও প্রেম একাকার, সেভাবে ব্যারিম্যানের ঈশ্বরবোধ তো গোঁড়া নয়, প্রেমে আর স্পর্শের আনন্দে তিনি নির্মাণ করে গেছেন একের পর এক ছবি, যতটা আস্তিক তিনি খ্রিস্টীয় বোধ সত্ত্বেও, যিশুর স্বর্গলাভ নয়, বরং ক্রুশকাঠ বহনের ইতিহাস তিনি খুঁটিয়ে দেখান আর মানববিশ্বে আমাদের বেদনাজীর্ণতার ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন। ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজে যদিও একটি চরিত্রের মুখ দিয়ে বলান, যারা ‘সাফারিং’ করে তাদের জন্য তার কোনো সহানুভূতি নেই। অথচ তার চলচ্চিত্রমালা দেখলে মনে হয়, এক দিগন্তজোড়া ব্ল্যাকবোর্ড তিনি তুলে দিয়েছেন এই মরপৃথিবীর হাতে, যেখানে ভঙ্গুর ও ক্ষয়ে আসা চক নিয়ে দিনগত পাপক্ষয়, গ্লানি লিপিবদ্ধ করব।

ভেবে দেখো ঋ, এমনকি মহান যিশু ক্রুশকাঠ নিজেই বহন করেছিলেন।