সময় কী? সময়ের জন্ম, শুরু কিংবা শেষই বা কবে? এর জবাব দেয়া সহজ নয়। পরিষ্কার করে বললে এ প্রশ্নের কোনো জবাব এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ নয়। সময়ের ধারণা এক্সপেরিমেন্টাল বিজ্ঞান, ইতিহাসচিন্তা, ধর্ম, তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ের সঙ্গে জড়িত।
মানুষ চিন্তাশীল। মানুষ যন্ত্র তৈরি করে, প্রতীক তৈরি করে। এখানেই সে মেরুদণ্ড আছে এমন অন্য সব প্রাণীর চেয়ে আলাদা। আইনস্টাইনের পর পদার্থবিজ্ঞান তথা চিন্তার জগতে সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম স্টিফেন হকিং। তার কাজের অন্যতম ক্ষেত্র দুনিয়ার আবির্ভাব পর্ব। হকিংয়ের মতে এ মহাবিশ্ব চিরকাল ছিল না। ‘১৫ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ও খোদ সময়ের জন্ম।’ কিন্তু প্রশ্ন তো থেকেই যায়, বিগ ব্যাংয়ের আগে সময় কেন থেমে থাকবে। এখানেই হয়তো বিজ্ঞান আর অধিবিদ্যার সীমানা গুলিয়ে যায়।
সময় প্রাণিজগতের জন্য কতটা গুরুত্ব বহন করে, সেটা একবার দেখা যাক। ১৯৫০-এর দশকে জীববিজ্ঞানীরা যুক্তরাষ্ট্রের কানেক্টিকাটে অবস্থিত নিউ হেভেন হার্বার থেকে এক ডজন ঝিনুক নিয়ে সেগুলোকে ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে যান। ঝিনুকগুলোকে নিউ হেভেন হার্বার থেকে আনা পানিতেই রাখা হয়, কিন্তু তাদের জন্য নিকশ অন্ধকারের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর বিজ্ঞানীরা ঝিনুকগুলোর খাবারের প্যাটার্ন পর্যবেক্ষণ করেন। বিজ্ঞানীদের আশা অনুযায়ী, ঝিনুকগুলো নিউ হেভেন হার্বারের সময়সূচিই অনুসরণ করছিল, সে অনুযায়ীই তারা তাদের খোলস উন্মুক্ত করছিল। অথচ ঝিনুকগুলো তাদের বাড়ি থেকে হাজার মাইল দূরে নতুন টাইমজোনে চলে এসেছিল। কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক পর অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল। ঝিনুকগুলোর খোলস খোলা ও বন্ধ করার সময় বদলাতে শুরু করল। এটা সবারই জানা, সাগরে জোয়ার-ভাটার সময়সূচি নিয়মিত বদলে যায়। এ বদল সূর্যের প্রভাবে নয়, বরং চাঁদের প্রভাবে হয়। চার সপ্তাহ পর্যবেক্ষণের পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, ঝিনুকগুলো তাদের নতুন আবাস ইলিনয়ের সাগরের বা চাঁদের সময়সূচি অনুসরণ করতে শুরু করেছে। প্রশ্ন ওঠে, ল্যাবরেটরির বদ্ধ দেয়ালের মধ্যে থেকেও কীভাবে এ নিম্নবর্গের প্রাণী চাঁদের সময়সূচি টের পেল? ঝিনুক তো ঝিনুক, এমনকি আলুও সময় বুঝতে পারে। আলুর চোখগুলো তুলে ফেলে সেগুলোকে একেবারে আবদ্ধ একটি পরিবেশে রাখা হয়, আলুগুলোকে বাইরের আলো, তাপমাত্রা, চাপ, আর্দ্রতা ও আলোর তীব্রতা থেকে পৃথক করে ফেলা হয়। বাইরে দিন না রাত, সেটা কিন্তু আলুর পক্ষে আর জানার উপায় থাকল না। কিন্তু তার পরও দেখা যায়, আলুগুলোর অক্সিজেন ব্যবহারের চক্র দিনে-রাতে যেভাবে বদলাত, সেই বদ্ধ পরিবেশেও সেটা অব্যাহত ছিল। এমনকি ঋতুর পরিবর্তনও এ আলুগুলো বুঝতে পারে।
১৯৩০-এর দশকে জার্মান জীববিজ্ঞানী কার্ল ফন ফ্রিস্ক মৌমাছিদের নিয়ে একটি পরীক্ষা করেন। তিনি তার এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলেন, সেই বন্ধু যখন বাসার ছাদে প্রাতরাশ করার জন্য যেতেন, ঠিক তখনই সেখানে কয়েকটি মৌমাছি হাজির হতো। টেবিলে মিষ্টি কিছু থাকুক বা নাই থাকুক, মৌমাছিগুলো সেখানে সময়মতোই হাজির থাকত। সেই বন্ধুটি অবাক হয়ে ভাবতে শুরু করেন, মৌমাছিগুলো এ নির্দিষ্ট সময়ে কীভাবে হাজির হয়? তাদের কি ঘড়ি আছে, নাকি তারা কোনোভাবে তার নাশতা করার খবর পায়? কার্ল ফন ফ্রিস্ক এ প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজতে গিয়ে তার পরীক্ষা শুরু করেন। দিনের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে খাবার রাখা হয়। কার্ল খেয়াল করেন, মৌমাছিগুলো তাদের বাসা থেকে বেরিয়ে সরাসরি খাবারের উেস পৌঁছে যাচ্ছে। এটা পরিষ্কার হয়ে যায়, বাইরে থেকে যাওয়া মৌমাছিরা বাসায় থাকা মৌমাছিদের খাবারের উৎস ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে। কার্ল মৌমাছির বাসায় গুপ্তচরগিরি করে দেখতে পান, বাসায় পৌঁছে চাকে মধু জমা করে মৌমাছিগুলো এক বিশেষ ধরনের নৃত্য পরিবেশন করে। এরপর দেখা যায়, দলবেঁধে আরো মৌমাছি সেই খাবারের উেস উড়ে যায়।
এ নাচ দিয়ে মৌমাছিরা কী তথ্য প্রেরণ করত? নাচ দেখে কীভাবে মৌমাছিরা বুঝে নিত খাবারের অবস্থান? প্রশ্নগুলো বহু দিন কার্ল ও তার সহযোগীদের চোখের ঘুম হারাম করেছিল। খাবারের গন্ধ তাদের পথ প্রদর্শক নয়, এটা নিশ্চিত। আবার মৌচাকের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে সহকর্মীর নাচও মৌমাছিদের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। তাহলে যেকোনো তথ্যের আদান প্রদান নিশ্চয় তাদের মধ্যে স্পর্শের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। এরপর আরো পর্যবেক্ষণ থেকে কার্ল বুঝতে পারেন মৌমাছির নাচের রহস্য। মৌমাছিরা নির্ভর করে সূর্যের ওপর। সূর্যের আলোকরশ্মি ও খাবারের উেসর মধ্যে যে কৌণিক দূরত্ব, মৌমাছিরা তাদের নাচের মাধ্যমে সেটাই সঙ্গীদের জানিয়ে দেয়। এই কোণ নির্ধারিত হয় মৌমাছির বাসা থেকে খাবারের উৎস ও সূর্যের রশ্মি দর্শনের ওপর। এরপর আসে আরেক প্রশ্ন, নিয়মিত একটা নির্দিষ্ট সময়কে মৌমাছিরা কীভাবে শনাক্ত করে? বোঝা যায়, মৌমাছিদের মধ্যে কিছুটা সময়জ্ঞান অবশ্যই আছে। কার্ল বুঝতে পারেন, দিক ও দূরত্ব নির্ণয়ে মৌমাছিরা যেমন সূর্যকে ব্যবহার করে, তেমনি তারা সময় নির্দিষ্ট করতেও সূর্যের সাহায্য নেয়। এবং অবশ্যই মৌমাছিদের সময় সম্পর্কে ধারণা আছে। মৌমাছিরা বুঝতে পারে, সূর্যের কিরণ কোন জায়গা থেকে এলে খাবারের সন্ধানে বের হওয়ার সময় হয়েছে। মৌমাছিদের বেশ অনেক বছর গবেষণা করে কার্ল উপসংহার টানেন, ‘মনে হবে তাদের ঘড়ির প্রয়োজন নেই, সময় নিয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই, স্মৃতি নেই, ক্ষুধা নেই, সূর্যের অবস্থান নিয়েও তাদের ধারণা নেই...’
মানুষসহ সব প্রাণেরই সময় সম্পর্কে ধারণা আছে। চোখ দিয়ে প্রাণী দেখতে পায়, কান দিয়ে শুনতে পারে। কিন্তু সময় পরিমাপের কোনো অঙ্গ কোনো প্রাণীরই নেই, এমনকি মানুষেরও নেই। তা সত্ত্বেও সব জীবিত প্রাণী সময়কে অনুভব করতে পারে পরিপার্শ্বের পরিবর্তনের সাপেক্ষে।
১৭২৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিজ্ঞানী জ্যাঁ দে মিয়ারা ল্যাবরেটরিতে গাছের ওপর আলো-আঁধারির পরীক্ষা করেন। প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে পৃথক করার পরও দেখা যায়, গাছের শারীরিক প্রক্রিয়াগুলো আগের সময় মেনেই চলছে। সময়ের সঙ্গে প্রাণের এ সম্পর্ক এমনকি এককোষী জীবেও দেখা যায়। আবার কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে প্রাণীকে নতুন সময় চক্রের সঙ্গে প্রশিক্ষিত করে তোলা যায়। ইঁদুরকে প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে সরিয়ে কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন দৈর্ঘে আলো-অন্ধকারে রেখে দেখা যায়, তারা অজ্ঞাত কোনো ঘড়ির সাহায্যে তাদের নির্দিষ্ট কার্যকলাপ একই সময়ে করে। এসব পরীক্ষা থেকে দেখা যায়, সময় সম্পর্কে জীবের এক ধরনের জটিল সম্পর্ক রয়েছে। এসব থেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন মানুষের সামনে হাজির হয় যেটা আমরা নৃবিজ্ঞানী অ্যান্টনি এভেনির মুখে শুনি : “সব জীবিত জীবের মধ্যে কি সময়ের ধারণা প্রবৃত্তিগত, নাকি আমরা আমাদের শরীর-মনের বাইরে দুনিয়ার ঘড়ি দিয়ে পরিচালিত?”
সময় নিয়ে এ উপমহাদেশের চিন্তাবিদ, দার্শনিক, পদার্থবিদরা কী ভাবতেন? প্রাচীন আমল থেকেই ভারতীয় দার্শনিক, পণ্ডিতরা স্থান, সময়, বস্তু ও চেতনার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছেন। তারা সময় ও স্থানকে আপেক্ষিক হিসেবে মূল্যায়ন করতেন। ভারতীয় বা হিন্দু ঐতিহ্যে সময়ের ধারণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে সময়কে বৃত্তাকার, চক্রাকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে আব্রাহামীয় ঐতিহ্যে সময় হচ্ছে সরলরৈখিক অর্থাৎ, দুনিয়া একদিন সৃষ্টি হয়েছে এবং সেটা একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। অন্যদিকে হিন্দু ঐতিহ্যে সৃষ্টি আসলে একটা চক্র, এটি চারটি যুগ অতিক্রম করে। এতে বলা হয়, সৃষ্টি হয় ধ্বংসের জন্য এবং ধ্বংস হয় নতুন করে সৃষ্টির জন্য। পুনর্জন্মের ধারণাও সময়ের এ চক্রাকার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইতিহাস চর্চাতেও এ চক্রাকার ও সরলরৈখিক সময়ের ধারণা নিয়ে বিপুল তর্ক-বিতর্ক আছে। কারণ এ সময়ের ধারণা ঐতিহাসিকদের পদ্ধতি এবং কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ইতিহাস সচেতনতাকে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। খ্রিস্টীয় তত্ত্ববিদরা মনে করেন, খ্রিস্ট ধর্ম ইতিহাসে আবির্ভূত হয়নি বরং খ্রিস্ট ধর্মের মাধ্যমে ইতিহাস যাত্রা শুরু করেছে। বিশিষ্ট খ্রিস্টীয় সন্ত সেন্ট অগাস্টিন মনে করতেন, সময়ের জন্ম মানুষের আগে। ঈশ্বর এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করার সঙ্গে সঙ্গে সময়ের যাত্রা শুরু এবং তখন মানুষের অস্তিত্ব ছিল না। তাই সময় মানুষের সচেতনতার ওপর নির্ভরশীল নয়। সেন্ট অগাস্টিনের সময় নিয়ে মৌলিক ধারণাগুলো হচ্ছে— সময় ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন এবং সময় অসীম নয়।
প্রাচীন ভারতে সময়কে গণনা করে দুটি দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে— একটি হলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একটি সৃষ্টিচক্রের ব্যাপ্তি ৮৬৪ কোটি বছর এবং আলোর বেগ নিমেষে ৪৪০৪ যোজনা, যা আধুনিক আদর্শ সেকেন্ডে ১৮৬,০০০ মাইলের প্রায় সমান। ‘যোগ বশিষ্ঠ’ হিন্দু দর্শনের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এতে বশিষ্ঠ মুনি কর্তৃক রামকে দেয়া নানা উপদেশ লিপিবদ্ধ আছে। এই গ্রন্থে সময় নিয়ে কিছু ধারণার কথা জানা যায়—
* সময়কে বিশ্লিষ্ট করা সম্ভব নয়, কারণ সময়কে যত ভাগই করা হোক তা সবসময়ই অবিনশ্বর।
* দুনিয়া কুমারের চাকার মতো, দেখে মনে হবে স্থির, কিন্তু এটি যথেষ্ট গতিতে ঘূর্ণায়মান।
হিন্দু পুরাণের ধারণায় সময় হচ্ছে সৃষ্টি আর ধ্বংসের একটি চক্র, যার নাম ‘কল্প’। সূর্য সিদ্ধান্ত অনুসারে, ‘সময় সবকিছু সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংস করে। সময় দুই ধরনের সসীম ও অসীম। অসীম সময়ের কোনো শুরু বা শেষ নেই। আমরা কেবল সসীম সময়কে জানি— এ সময়ের শুরু ও শেষ আছে। সান্ত সময় আবার দুই ধরনের— বস্তুগত ও দার্শনিক। পরিমাপযোগ্য সময় হলো বাস্তব, কিন্তু দার্শনিক সময়কে গণনা করা সম্ভব নয়।
বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতা ভেদে সময়ের ধারণা যে অত্যন্ত জটিল এবং বিস্তৃত সেটা স্পষ্ট, এ স্বল্পপরিসরে সেসব আলোচনার সুযোগ নেই। তার চেয়ে আমরা বরং আরও কিছুটা সামনের দিকে এগোই।
মানুষের মধ্যে সময়ের ধারণা আছে এবং তাহলে সময়কে তো নির্দিষ্ট করতেই হবে। মানুষ স্বভাবতই মৌমাছির মতো সূর্যের কিরণের কোণ তার চোখ দিয়ে মাপতে পারে না। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মানুষ শুরুতে মৌখিক পদ্ধতিতে সময় গণনা করেছে এবং তারপর এসেছে লিখিত পদ্ধতি। সময় নিয়ে মানুষের ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধর্মের মধ্যে নিহিত আর তা হলো দুনিয়া ও মানুষের সৃষ্টি। সময়ের সূচনা বলতে তো দুনিয়ার সৃষ্টি। আর ধর্মতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সৃষ্টির রহস্যের ব্যাখ্যা। ধরা যাক গ্রিক ও ব্যাবিলনের মানুষের সৃষ্টি কাহিনী। এগুলো তাদের সময়ে লিখিত ছিল না, বরং মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। এখন আমরা সময় দেখতে দেয়ালে ঝোলানো বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার এবং ঘড়ির দিকে তাকাই। আমাদের কাছে শুনতে কিছুটা অবিশ্বাস্য ঠেকলেও এটা সত্য যে একসময় মানুষ স্রেফ স্মৃতিশক্তি ব্যবহার করে সময় গণনা করত। খ্রিস্টের জন্মের সাত শতক আগে গ্রিক কবি হেসিয়োড সময় গণনার একটি সূত্র তৈরি করেছিলেন, যা আজকের দিনের লিখিত ক্যালেন্ডারের সমতুল্য। হেসিয়োডের পুরো সূত্র তার মাথায়ই ছিল এবং যুগে যুগে অনেকেই সেই সূত্র মাথায় বয়ে বেড়িয়েছেন। এ সূত্র ছিল গীতিকাব্যের মতো, যার নাম ছিল ওয়ার্কস অ্যান্ড ডেজ।
ওয়ার্কস অ্যান্ড ডেজ হেসিয়োড তৈরি করেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে। দুই শতক এটা মৌখিকরূপেই প্রচলিত ছিল। গীতিকাব্যের মতো বাজনাসহকারেই এটা গাওয়া হতো। হোমারের মতো হেসিয়োডও ছিলেন কৃষক, যিনি জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছিলেন গ্রিসের উত্তরাঞ্চলে। ওয়ার্কস অ্যান্ড ডেজ হেসিয়োড মূলত একটি খামার পরিচালনার নির্দেশনা, সময় নির্দেশনার জন্য এটা রচিত হয়নি। কিন্তু তার পরও এটা একটা ক্যালেন্ডার হিসেবেই কাজ করে।
লেখার শুরু কবে, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। কোনো ক্রম অনুসরণ করে প্রতীক দিয়ে কিছু প্রকাশ করাকে যদি লিখনরীতি হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে সময়ের লিখিত ধারণার বয়স আজ ২০ হাজার বছর হতে চলল।
আলেকজান্ডার মারশ্যাক তার দ্য রুটস অব সিভিলাইজেশন গ্রন্থে মধ্য আফ্রিকা ও ফ্রান্সের পুরনো প্রস্তর যুগের কিছু গুহা থেকে উদ্ধার করা দাগ কাটা হাড়কে বিশ্লেষণ করে সেগুলোকে চান্দ্র বর্ষপঞ্জির আদিরূপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অবশ্য এ নিয়ে মতভেদ আছে।
এখন আমরা যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি, তাতে ১২টি পাতা থাকে এবং প্রতিটি পাতা ৩০ বা ৩১টি ছোট ছোট বর্গাকার ঘরবিশিষ্ট, শুধু দ্বিতীয় পাতাটি বাদে। ক্যালেন্ডার সময়কে ভাগ করে বছর, মাস, তারপর দিন। এরপর তাকানো যাক আমাদের হাতের কবজির দিকে, সেখানে থাকা হাতঘড়ি আমাদের দিনের সময়কে ভাগ করে দেয়। এখন অবশ্য ঘড়ির জায়গা নিয়েছে স্মার্টফোন, যদিও উভয়ের সময় গণনার কাজ একই। স্মার্টফোনে এখন ক্যালেন্ডারও পাওয়া যায়। দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের দিনও ফুরাচ্ছে। আমরা সাধারণত যেসব ঘড়ি হাতে দিই, সেগুলো সেকেন্ড, মিনিট আর ঘণ্টার হিসাব দেয়। এখন এমন ঘড়ি তৈরি হয়েছে, যেগুলো ১ সেকেন্ডের শতভাগ কিংবা হাজার ভাগের এক ভাগকেও পড়তে পারে। প্যাটেক ফিলিপ্পে সুইস দুনিয়ার সবচেয়ে জটিল ঘড়ি তৈরি করেছে। এ ঘড়ির ওজন ২ দশমিক ৪ পাউন্ড। এতে ২৪টি কাঁটা আছে, ঘড়িতে ব্যবহূত স্ক্রুর সংখ্যা ৩৩২। এ ঘড়ি একই সঙ্গে এক ডজনের বেশি কাজ করে। ঘড়িটির দাম ৩০ থেকে ৬০ লাখ ডলার।
একটা বিষয় স্পষ্ট, সভ্যতা বিকশিত হতে শুরু করার পর সময়কে জানা জরুরি থেকে আরো জরুরি হয়ে ওঠে। শিক্ষা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ব্যবসা, বাজার ইত্যাদি কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সময় জানা আবশ্যক। রোমান ফোরামে সূর্যের ছায়া অনুসরণ করে সময় ঘোষণার জন্য নির্দিষ্ট লোক থাকত।
আজটেকদের রাজধানীতে বাজারের সূচনা ও সমাপ্তি ঘোষণার জন্য লোক থাকত। সংগঠিত সমাজে মানুষের নানা ধরনের কাজ করতে সময়ের হিসাব জানতে পারাটা খুব জরুরি। সময়কে পরিমাপ ও সময় পরিমাপক পদ্ধতি আবিষ্কারের বিজ্ঞানের আগ্রহের চেয়ে ধর্মীয় কারণ বেশি ভূমিকা রেখেছে। মধ্যযুগে ইউরোপের খ্রিস্টান সমাজে প্রার্থনার সময় ঘোষণা যেন নির্ভুল সময়ে হয়, সেটা কঠোরভাবে পালন করা হতো। এ সময় পরিমাপে যেসব উপকরণ তৈরি হয়েছিল, সেগুলো একেকটা শিল্প নিদর্শন হয়ে উঠেছিল।
ধর্ম, বাণিজ্য, নগর ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামো বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যযুগে ইউরোপে গণসময় ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে ‘ওয়ার্ক ক্লক’ নামে নতুন একটি ধারণার আধিপত্য শুরু হয়। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য সময় ঘোষণা করার মানুষ ছিল। তবে গ্রামাঞ্চলে মানুষ ওই সূর্য ও চাঁদের মাধ্যমেই সময়ের হিসাব রাখত।
সময়কে পরিমাপ করা ভিন্ন একে ব্যবহার করা অন্য কোনো উপায় নেই। আর পরিমাপ করা ব্যতীত সময় মানুষের জন্য অর্থহীন। সময় পরিমাপের দুটি মৌলিক ভিত্তি রয়েছে। একটি হচ্ছে নিজ অক্ষের ওপর পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং অন্যটি সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণন। নিজ অক্ষের ওপর পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে পাওয়া যায় দিন ও রাত এবং সূর্যের চারদিকে ঘুরলে সেখানে পাওয়া যায় এক বছর। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সময় পরিমাপে অপরিহার্য, সেটা হলো চাঁদের ঘূর্ণন। চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে একবার ঘুরে এলে সেটা হয় এক মাস। আর ক্যালেন্ডারের কাজ হলো এই দিন, মাস ও বছরের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা। ক্যালেন্ডারের তিনটি সম্ভাব্য রূপ রয়েছে— ১. সৌর ক্যালেন্ডার। বলা হয় এ ক্যালেন্ডারেই বছরের দৈর্ঘ্য ঠিকঠাক পরিমাপ করা হয়। তবে মাসের হিসাব সঠিক হয় না। ২. চান্দ্র ক্যালেন্ডার। এখানে মাসের হিসাব সঠিক হলেও বছরের হিসাবে সমস্যা থাকে। ৩. লুনিসোলার ক্যালেন্ডার। এতে চাঁদ ও সূর্য উভয়কেই ব্যবহার করা হয়। এখানে মাস ও বছরের অসমতা দূর করতে চেষ্টা করা হয়।
আমরা সাধারণত দিন গণনা করি ২৪ ঘণ্টাকে ধরে। যদিও দিনের যে আভিধানিক অর্থ, সেটা কিন্তু সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত, মানে ১২ ঘণ্টা। ইতিহাসে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় বিভিন্ন কালে, সভ্যতায় মানুষ বিভিন্নভাবে দিন গণনা করেছে। শুরুর দিকে মানুষ দিন গণনা শুরু করত সন্ধ্যায়। এ পদ্ধতি গ্রিকদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। আবার সিজার ও ট্যাসিটাসের বিবরণ থেকে জানা যায়, প্রাচীন গল ও জার্মানরা তাদের দিন, ঋতু গণনা করত রাতকে ভিত্তি ধরে।
ইহুদিদের দিন শুরু হয়ে সন্ধ্যায়। রোমানদের দিন শুরু হতো বিভিন্ন সময়ে। ম্যাক্রোবিয়াসের কথা মতো, রোমানদের দিন শুরু হতো মধ্যরাত থেকে। আবার কখনো কখনো রোমানরা দিন গণনা করত ভোর ৬টা থেকে। এই হিসেবে রোমানদের মতে, যিশুর মৃত্যুর সময় নবম ঘণ্টায়, অর্থাৎ বেলা ৩টায়।
গ্রিকদের ক্যালেন্ডার ছিল লুনিসোলার, চাঁদ ও সূর্যের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার চেষ্টা ছিল তাদের। ম্যাক্রোবিয়াসের বিবরণ মতে, গ্রিকদের সাধারণ বছর ছিল চান্দ্র ১২ মাসের অর্থাৎ ৩৫৪ দিনের। সৌর মাস যে ৩৬৫ দিনে হয় সেটা তারা জানত, আর তার সঙ্গে সমন্বয় করতে তারা প্রতি আট বছরে একবার ক্যালেন্ডারে ৯০ দিন যোগ করত। এই আট বছরের চক্রকে অক্টেটেরিস বলা হতো।
আধুনিক ইউরোপের ক্যালেন্ডারের উদ্ভব হয়েছে রোমানদের কাছ থেকে। ম্যাক্রোবিয়াস ও সেনসোরিনাসের মতে রোমার বছরে মাস থাকত ১০টি, দিন ৩০৪টি। বছর শুরু হতো মার্চ মাস থেকে। এরপর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস দুটি যোগ করেন রোমান সম্রাট নুমা পম্পিলিয়াস। অবশ্য অনেক গবেষক মনে করেন রোমান বছর শুরু থেকেই ১২ মাসের ছিল। রোমান কবি ওভিদের লেখা ‘ফাস্টি’তে অবশ্য ১০ মাসের কথাই বলা আছে। অন্যদিকে প্লুটার্ক লিখে গেছেন রোমুলাসের আমলে রোমান বছর গণনা হত ৩৬০ দিনে এবং মাস ছিল ১২টি। তবে এটা নিশ্চিত নুমার আমলে রোমান ক্যালেন্ডারে ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয় এবং সেটা একটা স্থায়ী চেহারা পায়। এর আগে রোমান মাস বা বছরের সুনির্দিষ্ট দিন ছিল না, মাঝে মাঝে দিনের সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটত। আরেকটা কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে নুমা নিশ্চিত করেছিলেন যেন বছরে দিনের সংখ্যা বেজোড় হয়। এরপর জুলিয়াস সিজারের আমলে রোমান ক্যালেন্ডারে আরেক দফা বড় সংস্কার সাধিত হয়। এই জুলিয়ান ক্যালেন্ডারেই বছরকে ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টায় নির্দিষ্ট করা হয়।
৩২৫ খ্রিস্টাব্দে জেনারেল কাউন্সিল অব নাইসিয়া আদেশ জারি করে যে, পুরো দুনিয়ার সব স্থানে একই সময়ে ইস্টার পালন করতে হবে। এরপর এই উদ্দেশ্যে চলে নানা সংস্কার, গবেষণা। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে চালু হয়ে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি চালু করেছিলেন বলে এর নাম গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার।
বর্তমানে প্রচলিত ক্যালেন্ডারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো এবং যেটা ধারাবাহিকভাবে টিকে আছে, সেটা হলো জিউশ ক্যালেন্ডার। এটা একটা লুনিসোলার ক্যালেন্ডার। এর মাসগুলো পর্যায়ক্রমে ২৯ ও ৩০ দিনের হয়। জিউশ ক্যালেন্ডারে বছর শুরু হয় তিসরি মাস দিয়ে।
মুসলিম ক্যালেন্ডারও লুনিসোলার, এর মাসগুলো চান্দ্রমাস। জিউশ ক্যালেন্ডারের সঙ্গে এর কিছু মিল আছে। আলেকজান্ডার ফিলিপ তার দ্য ক্যালেন্ডার : ইট’স হিস্টরি, স্ট্রাকচার অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট গ্রন্থে লিখেছেন মুসলিম বা হিজরি ক্যালেন্ডারে আছে কিছু অসাধারণ, উন্নত বৈশিষ্ট্য। এ ক্যালেন্ডার মূলত চান্দ্র এবং বর্তমান দুনিয়ায় ব্যবহূত হয় এমন চান্দ্র ক্যালেন্ডারগুলোর মধ্যে সেরা হিসেবে বিবেচিত। এতে দিন ও চাঁদকেই সময়ের প্রাকৃতিক একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
লেখার শেষে সময় নিয়ে বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির কাছে ফিরতে চাই। আর এক্ষেত্রে স্টিফেন হকিং সর্বশেষ মহারথী। স্টিফেন হকিংয়ের মৃত্যুর পর প্রকাশিত শেষ বই ব্রিফ অ্যানসারস টু দ্য বিগ কোয়েশ্চেনস-এ সময় নিয়ে তার ধারণার বিশদ জানা যায়। হকিংয়ের মতে, সময়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে। এটা বোঝার জন্য তিনি একটি বিবরণীও দিয়েছেন, ‘এই ধারণাটি বুঝতে ধরে নিন মহাশূন্যে একটি ব্ল্যাক হোল ভাসছে। একটা সাধারণ ব্ল্যাক হোল হচ্ছে প্রকাণ্ড এক নক্ষত্র, যে নিজেই নিজের মধ্যে আটকে থাকে। এটি এত বড় যে এর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে এড়িয়ে আলোও যেতে পারে না। তাই এটি পুরোপুরি কৃষ্ণবর্ণের। এর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত বেশি শক্তিশালী যে, এটা সময়কেও আটকে রাখে। কীভাবে, সেটা বুঝতে কল্পনা করুন একটি ঘড়িকে। ঘড়িটি ব্ল্যাক হোলের যত কাছে যাবে, এটি তত ধীর হতে থাকবে। সময় নিজেই ধীর হয়ে যাবে। এবার ঘড়িটিকে ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে কল্পনা করুন। প্রচণ্ড মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে ঘড়িটি থেমে যাবে। ঘড়িটি এজন্য থেমে যাবে না যে এটা ব্ল্যাক হোলে ভেঙে গেছে বরং এজন্য থেমে যাবে কারণ ব্ল্যাক হোলে সময়ের অস্তিত্বই নেই।’ অবশ্য হকিং এটাও জানিয়েছেন, অনেক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক এটাই বিশ্বাস করেন, সময়ের কোনো শুরু বা শেষ নেই, সময় অসীম। কে জানে এ তর্কের শেষ কোথায়!
সূত্র :
অ্যান্টনি এভেনি, এম্পায়ারস অব টাইম
স্টিফেন হকিং, ব্রিফ অ্যানসারস টু দ্য বিগ কোয়েশ্চেনস
আলেকজান্ডার ফিলিপ, দ্য ক্যালেন্ডার: ইট’স হিস্টরি, স্ট্রাকচার অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট
ভি. কে. মহেশ্বরী, কনসেপ্ট অব টাইম ইন ইন্ডিয়ান ফিলোসফি
সুভাষ কাক, কনসেপ্ট অব টাইম, স্পেস অ্যান্ড কনশাসনেস ইন অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া






