অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তিতুল্য মেলবোর্ন ক্রিকেট স্টেডিয়াম। এক লাখ দর্শক ধারণক্ষম এ মাঠে ২০২২ সালের টি২০ বিশ্বকাপে মুখোমুখি হলো ভারত-পাকিস্তান। পাকিস্তানের ১৫৯ রানের জবাবে বিরাট কোহলি লড়াকু ফিফটিতে ভারতকে জয়ের রেসে রাখেন। শেষ ওভারে স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় দুই দল। ছয় উইকেট হাতে নিয়ে ভারতের প্রয়োজন ১৬ রান। প্রথম বলেই সাজঘরের পথ ধরেন হার্দিক পান্ডিয়া। ৫ বলে প্রয়োজন ১৬ রান। পরের দুই বলে আসে ৩ রান। ৩ বলে প্রয়োজন ১৩ রান। মোহাম্মদ নওয়াজের ‘‌নো বল’কে ছক্কা হাঁকান কোহলি। সেখানেই কি শেষ পাকিস্তানের আশা?

ভারতের তখন প্রয়োজন ৩ বলে ৬। এরপর ২ বলে ২ রান। তখন রানআউট দিনেশ কার্তিক! শেষ বলে ২ রান, ব্যাটিংয়ে রবিচন্দ্র অশ্বিন। প্রচণ্ড চাপের মুখে নওয়াজ দিলেন ওয়াইড। শেষ বলে লাগে এক রান। অশ্বিন লেগে বল পাঠিয়ে এক রান সংগ্রহ করে নিলে উল্লাসে ফেটে পড়ে মেলবোর্নের গ্যালারি। দলকে জিতিয়ে অঝোরে কেঁদেছেন ভারতীয় সুপারস্টার কোহলি। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় বলেই আবেগটা ছুঁয়ে যায় তাকে।

এমনই লড়াই হয় ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচে। বৈশ্বিক আসরে ভারত এগিয়ে থাকলেও এ দ্বৈরথ নিয়ে ক্রিকেট পিপাসুদের মধ্যে উন্মাদনার যেন শেষ নেই। এটি বৈশ্বিক আসরকেও নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। যদিও ২০২৩ সালে ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠেয় আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভূরাজনৈতিক কারণে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পাকিস্তান যদি এ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করে, তবে আসরটি রঙ হারাবে।

দুই দলই একে অপরের দেশে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ভারত বলেছে, সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের মাটিতে এশিয়া কাপ খেলতে যাবে না তারা। পাশাপাশি তাদের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) দাবি করছে, আসরটি যেন সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা কাতারে হয়।

পাকিস্তান সরকারও শক্ত জবাব দিয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণের কথা উল্লেখ করে ইসলামাবাদ গত মার্চে বলেছে, অক্টোবর-নভেম্বরে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে দল পাঠাবে না পাকিস্তান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তান আসন্ন বিশ্বকাপ বয়কট করলে তা এ খেলাটির ভবিষ্যতের জন্য খুবই খারাপ একটি বার্তা যাবে এবং ক্রিকেটের বড় ক্ষতিসাধন করবে। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের ক্রীড়া ও রাজনৈতিক সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটবে। কাশ্মীর ইস্যু ও সীমান্ত সন্ত্রাসের কারণে দুই দেশের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে বৈরী সম্পর্ক বিরাজমান। ভূরাজনীতি বড় প্রভাব ফেলেছে দুই দেশের ক্রিকেটের ওপরও। ১৫ বছর ধরে একে অপরের বিপক্ষে টেস্ট খেলেনি ভারত ও পাকিস্তান। ভারতীয় ক্রিকেট দল সর্বশেষ পাকিস্তান সফরে যায় ২০০৬ সালে। আর পাকিস্তান দল ভারতের মাটিতে সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলে ২০১৩ সালে। সেবার ২-১-এ সিরিজ জিতে নেয় পাকিস্তান। এরপর বিশ্বকাপসহ বড় আসরগুলোতে দেখা হলেও দ্বিপক্ষীয় সিরিজ হয়নি।

প্যারিস ভিত্তিক এসকেইএমএ বিজনেস স্কুলের ক্রীড়া ও ভূরাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক সাইমন চ্যাডউইক বলেছেন, ‘‌এটা শুধু দুই জাতির ও একটি টুর্নামেন্টেরই ব্যাপার নয়। যারা ক্রিকেট খেলে, তারা যেখানে খেলে এবং যারা খেলাটির ওপর ক্ষমতার চর্চা করে তাদেরও স্বার্থসংশ্লিষ্ট।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনমনীয় অবস্থানই এ অচলাবস্থা তৈরি করেছে বলে মনে করেন পাকিস্তানভিত্তিক ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। করাচিভিত্তিক ক্রিকেট বিশ্লেষক আব্দুল গাফফার বলেন, ‘‌পাকিস্তান কখনই ভারতে খেলতে আপত্তি করেনি। এমনকি ১৯৯৯ সালে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামে ডানপন্থী চরমপন্থীরা ক্রিকেট পিচ খুঁড়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটালেও পাকিস্তান তাদের দল পাঠায়।’

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাজীব শুক্লা সম্প্রতি স্থানীয় এক স্পোর্টস নিউজ চ্যানেলকে বলেছেন, দুই দেশ কবে নাগাদ একে অপরের বিপক্ষে খেলবে, তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেছেন, এটি যেহেতু দ্বিপক্ষীয় সিরিজ নয়, তাই এখানে বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয় নয়। তার কথায়, ‘‌এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপ আয়োজন করছে যথাক্রমে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। নিরপেক্ষ কোনো দেশে খেলার সিদ্ধান্ত এলেও তা আসবে ওই দুটি বডির কাছ থেকেই।

ভূরাজনৈতিক কারণে ক্রিকেটের মতো অন্য খেলার বড় আসরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত মাসে ফিফা যেমন অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে ইন্দোনেশিয়াকে বাতিল করে দেয়, কেননা বালির গভর্নর ইসরায়েল ফুটবল দলকে আতিথেয়তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। 

বিশ্বকাপ বয়কট করা অবশ্য পাকিস্তানের জন্য বিরাট আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। চ্যাডউইক বলেছেন, যখন কোনো দেশের শীর্ষ দলগুলো বড় কোনো ইভেন্টে অংশ নেয় ও সফলতা পায়, তখন অবধারিতভাবেই আর্থিক সক্রিয়তায় প্রবৃদ্ধি ঘটে। তিনি বলেন, ‘‌ক্রীড়া সাফল্য ভালো লাগার একটি আবহ তৈরি করে ও জাতীয় সংহতি বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে এমন আসরের মধ্য দিয়ে দেশের ব্র্যান্ডও উজ্জ্বল হয়।’

তিনি মনে করেন, পাকিস্তান যদি ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করে তবে ‘‌বড় কিছু’ হারাতে পারে।

পাকিস্তানের ডন পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে কাজ করা গাফফার আরো বলেছেন, বিশ্বকাপ বয়কটের ধকল সইতে পারবে না পাকিস্তান। তার কথায়, ‘‌২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আয়োজন করবে পাকিস্তান। কিন্তু বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করলেও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আয়োজন সম্ভব হবে না।’

তিনি জানান, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের আগে পাকিস্তানকে এ নিশ্চয়তা নিতে হবে যে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারত অংশগ্রহণ করবে।  

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনাই কেবল সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দিতে পারে। পাকিস্তানের সাবেক ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটার আরজাক খান বলেন, ‘আমি আশা করব যে চূড়ান্ত অবস্থানে না গিয়ে উভয় পক্ষ বরং নিজেদের মধ্যে সমস্যাগুলো কীভাবে মিটমাট করে ফেলা যায় তা নিয়ে ভাববেন। ক্রিকেটেরই জয় হওয়া উচিত, ক্ষুদ্র রাজনীতির নয়।’