অলিম্পিয়াকোসের মাঠে ৭ মিনিটের মধ্যে হ্যাটট্রিক করেছেন রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি ফরওয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে। এটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ড। তার চেয়ে ৩০ সেকেন্ড কম নিয়ে রেকর্ডের অধিকারী লিভারপুলের মোহাম্মদ সালাহ। ২০২২ সালের অক্টোবরে স্কটিশ দল রেঞ্জার্সের বিপক্ষে ৬ মিনিট ১২ সেকেন্ডে হ্যাটট্রিক করেছিলেন মিসরীয় ফরওয়ার্ড। এবার এমবাপ্পে হ্যাটট্রিক করলেন ৬ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে।
চলতি মৌসুমে এটা এমবাপ্পের দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক। এর আগে তিনি হ্যাটট্রিক করেন কাজাখস্তানের দল কাইরাত আলমাটির বিপক্ষে। সব মিলিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ফরাসি ফরওয়ার্ডের এটা পঞ্চম হ্যাটট্রিক। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক হ্যাটট্রিকধারীর তালিকায় তিনি আছেন চতুর্থ স্থানে। আটটি করে হ্যাটট্রিক করে শীর্ষে অবস্থান করছেন লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ছয়টি হ্যাটট্রিক করে তিনে পোলিশ স্ট্রাইকার রবার্ট লেভানডোভস্কি।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ সংখ্যক গোলের দিক থেকেও পঞ্চম স্থানে রয়েছেন এমবাপ্পে। আর মাত্র আট গোল করলেই তিনি রিয়াল মাদ্রিদ কিংবদন্তি রাউল গঞ্জালেজকে ছুঁয়ে ফেলবেন। রাউল বর্তমানে চারে অবস্থান করছেন। রিয়ালের হয়ে আগের তিন ম্যাচে কোনো গোল করতে পারেননি এমবাপ্পে। গোলক্ষুধা নিয়ে মাঠে নেমে তিনি করলেন গুনে গুনে চার গোল।
বাম পা, ডান পা ও হেডে তিন গোল করে ‘পারফেক্ট’ হ্যাটট্রিকের রেকর্ডটা এখনো ধরে রেখেছেন মাইক নিওয়েল। ১৯৯৫ সালে নরওয়েজিয়ান ক্লাব রোজেনবার্গের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন ইংলিশ ক্লাব ব্ল্যাকবার্নের হয়ে।
সব মিলিয়ে ১১৫ জন খেলোয়াড় চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হ্যাটট্রিক করেছেন। ২০২২-২৩ মৌসুমে হ্যাটট্রিকের সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন সালাহ। পিএসজির ভিতিনহা সর্বশেষ খেলোয়াড় হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হ্যাটট্রিক করেছেন গত বুধবার টটেনহ্যামের বিপক্ষে। পিএসজির সাবেক খেলোয়াড় এমবাপ্পে চার গোল করার পর একই রাতে হ্যাটট্রিক করেন ভিতিনহা।
২০১৬-১৭ মৌসুমে ব্যাক-টু-ব্যাক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন রোনালদো ও মেসি। ২০২১-২২ মৌসুমে যা করেন করিম বেনজেমা। একটি জায়গায় সবাইকে ছাড়িয়ে যান লুইজ আদ্রিয়ানো। ২০১৪-১৫ মৌসুমে বাতে বরিসভের বিপক্ষে দুই ম্যাচে আট গোল করেন শাখতারের এ স্ট্রাইকার।
চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত হ্যাটট্রিক করেছেন রিয়াল মাদ্রিদের এমবাপ্পে (দুটি), বার্সেলোনার ফারমিন লোপেজ, গ্যালাতাসারের ভিক্টর ওসিমেন ও পিএসজির ভিতিনহা।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সবচেয়ে কম বয়সে হ্যাটট্রিক করার কীর্তিটা রাউল গঞ্জালেজের। ১৯৯৫ সালে ১৮ বছর ১১৩ দিন বয়সে ফেনারবাখের বিপক্ষে রিয়ালের হয়ে হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। আর সবচেয়ে বেশি বয়সে হ্যাটট্রিকের কীর্তিটা রিয়ালেরই আরেক সাবেক ফরওয়ার্ড করিম বেনজেমার। ২০২২ সালে চেলসির বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ফরাসি সুপারস্টার। অর্থাৎ দুটি রেকর্ডই রিয়ালের খেলোয়াড়ের গড়া।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অভিষেকেই হ্যাটট্রিক করেছেন মোট দশজন! এসি মিলানের মার্কো ফন বাস্তেন (১৯৯২), নিউক্যাসলের ফাউস্টিনো আসপ্রিলা (১৯৯৭), ম্যাকাবি হাইফার ইয়াকুবু আইয়েগবেনি (২০০২), ম্যানইউর ওয়েন রুনি (২০০৪), উদিনেসের ভিনসেঞ্জো ইয়াকুইন্তা (২০০৪), ভলফসবুর্গের গ্রাফাইট (২০০৯), পোর্তোর ইয়াসিন ব্রাহিমি (২০১৪), সলজবুর্গের আর্লিং হালান্ড (২০১৯), ডায়নামো জাগরেবের মিসলাভ ওরসিচ (২০১৯) ও আয়াক্সের সেবাস্তিয়ান হলার (২০২১)। এর মধ্যে ফন বাস্তেন আর হলার উভয়ই অভিষেকে চার গোল করার কৃতিত্ব দেখান। অভিষেকে প্রথমার্ধেই হ্যাটট্রিক পূর্ণ করা প্রথম খেলোয়াড় হালান্ড।
একাধিক ক্লাবের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হ্যাটট্রিক করেছেন রবার্ট লেভানডোভস্কি (ডর্টমুন্ড, বায়ার্ন ও বার্সেলোনা), ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাস), ফিলিপ্পো ইনজাগি (জুভেন্টাস ও এসি মিলান), মার্কো সিমোন (এসি মিলান, মোনাকো), রয় ম্যাকে (দেপোর্তিভো, বায়ার্ন), রুদ ফন নিস্তেলরয় (পিএসভি আইন্দহোফেন ও ম্যানইউ), আন্দ্রিই শেভচেঙ্কো (ডায়নামো কিয়েভ ও এসি মিলান), দিদিয়ের দ্রগবা (মার্সেই, চেলসি), মাইকেল ওয়েন (লিভারপুল, ম্যানইউ), স্যামুয়েল এতো (বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান), নেইমার (বার্সেলোনা, পিএসজি), অলিভিয়ার জিরু (আর্সেনাল, চেলসি), আর্লিং হালান্ড (সলজবুর্গ, ম্যানসিটি), হ্যারি কেন (টটেনহ্যাম, বায়ার্ন), কিলিয়ান এমবাপ্পে (পিএসজি, রিয়াল মাদ্রিদ)।
এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি গোলের কীর্তিটা কার? বার্সেলোনায় খেলার সময় ২০১২ সালে জার্মান ক্লাব বায়ার লেভারকুসেনের বিপক্ষে একাই ৫ গোল করেছিলেন লিওনেল মেসি। বার্সা জিতেছিল ৭-১ গোলে। এরপর অবশ্য শাখতারের লুইজ আদ্রিয়ানো ও ম্যানসিটির হালান্ড ভাগ বসিয়েছেন মেসির রেকর্ডে। আদ্রিয়ানো ২০১৪ সালে বাতে বরিসভের বিপক্ষে ও হালান্ড ২০২৩ সালে আরবি লিপজিগের বিপক্ষে ৫ গোল করার কৃতিত্ব দেখান।
এছাড়া এক ম্যাচে ৪ গোল করেছেন মার্কো ফন বাস্তেন, সিমোন ইনজাগি, দাদো পারসো, শেভচেঙ্কো, মেসি, বাফেটিম্বি গোমিস, মারিও গোমেজ, লেভানডোভস্কি (২ বার), ইব্রাহিমোভিচ, রোনালদো, সের্জে নাবরি, জোসিফ ইলিসিচ, অলিভিয়ার জিরু, সেবাস্তিয়ান হলার, হ্যারি কেন ও এমবাপ্পে। ২০১৯ সালে ক্রেভেনা জেভেজদার বিপক্ষে ১৬ মিনিটে ৪ গোল করে রোনালদোর রেকর্ড ভেঙে দেন লেভানডোভস্কি। রোনালদো ৪ গোল করেছিলেন দুই অর্ধ মিলিয়ে ২১ মিনিটে।
আরো নানা রেকর্ড রয়েছে হ্যাটট্রিক নিয়ে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিকের কীর্তিটা ফন বাস্তেনের। ১৯৯২ সালে গোটবার্গের বিপক্ষে এসি মিলানের হয়ে হ্যাটট্রিক করেছিলেন এ ডাচ কিংবদন্তি। ডিফেন্ডারেরও আছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হ্যাটট্রিক করার কীর্তি। ২০১৭ সালে বেলজিয়ান ক্লাব অ্যান্ডারলেখটের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন পিএসজির ডিফেন্ডার লেইভিন কুরজাওয়া।
সর্বোচ্চ ১৮টি হ্যাটট্রিক করেছেন রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়রা। এছাড়া বার্সেলোনার ১৬টি, বায়ার্ন মিউনিখের ১২টি, পিএসজির ৮টি, লিভারপুল, ম্যানসিটি ও ম্যানইউর ৭টি করে, আর্সেনাল ও জুভেন্টাসের ৬টি করে এবং এসি মিলানের ৫টি হ্যাটট্রিক রয়েছে। আর সর্বাধিক ৭টি হ্যাটট্রিক হজম করেছে গ্রিক দল অলিম্পিয়াকোস। এছাড়া অ্যান্ডারলেখট ৬টি, আয়াক্স ও বার্সেলোনা ৫টি করে এবং বাতে বরিসভ ৪টি হ্যাটট্রিক হজম করেছে।
২০২৪-২৫ মৌসুমে সর্বাধিক ১২টি হ্যাটট্রিক হয়েছে। এছাড়া ২০১৯-২০ মৌসুমে ১০টি, ২০১৬-১৭ মৌসুমে ৯টি, ২০১৩-১৪, ২০০৪-০৫ ও ২০০২-০৩ মৌসুমে ৮টি করে ১২টি হ্যাটট্রিক হয়েছে। আবার একটি ম্যাচ ডেতে সর্বাধিক তিনটি হ্যাটট্রিকের রেকর্ড রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি একই দিনে হ্যাটট্রিক করেছিলেন পিএসজির ওসমান দেম্বেলে, ইন্টার মিলানের লাউতারো মার্টিনেজ ও মরগান রজার্স।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ ২৩টি হ্যাটট্রিক করেছেন ব্রাজিলীয়রা (১৬ খেলোয়াড়)। এছাড়া ফ্রান্সের ১৩ খেলোয়াড় ২১টি, আর্জেন্টিনার ৫ খেলোয়াড় ১৩টি, ইংল্যান্ডের ১০ খেলোয়াড় ১৩টি ও পর্তুগালের ৫ খেলোয়াড় ১২টি হ্যাটট্রিক করেছেন।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে এখনো কেউ হ্যাটট্রিক করতে পারেননি। তবে সেমিফাইনালে ৫টি ও কোয়ার্টার ফাইনালে ৮টি হ্যাটট্রিক হয়েছে।
হ্যাটট্রিক না করাদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন বায়ার্ন মিউনিখ গ্রেট টমাস মুলার (৫৭ গোল)। এছাড়া আতোঁয়া গ্রিজম্যানের ৪৩ গোল, এডিনসন কাভানির ৩৫ গোল, আরিয়েন রোবেনের ৩১ গোল, প্যাট্রিক ক্লুইভার্টের ২৯ গোল ও ডেভিড ত্রেজেগের ২৯ গোল রয়েছে।










