নারী কাবাডি বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসে প্রথম পদক নিশ্চিত করল বাংলাদেশ। গতকাল থাইল্যান্ডকে হারিয়ে চলতি আসরের সেমিফাইনালের টিকিট পাওয়ার পাশাপাশি পদকও নিশ্চিত হয়েছে স্বাগতিকদের। সেমিফাইনালে চাইনিজ তাইপের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। আরেক সেমিতে লড়বে প্রথম আসরের দুই ফাইনালিস্ট ভারত ও ইরান। আজ বিকাল চারটায় ভারত-ইরান ও বিকাল পাঁচটায় বাংলাদেশ-তাইপে ম্যাচ।

আগেই সমীকরণ জানা ছিল—থাইল্যান্ডকে হারালেই সেমিফাইনাল, সেই সঙ্গে কাবাডি বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো পদক পাবে বাংলাদেশ। মিরপুর শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে গতকাল গুরুত্বপূর্ণ এ ম্যাচে শুরুতে থাইল্যান্ড দাপট দেখালেও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের গুছিয়ে নেয় বাংলাদেশ। লিড নিয়েই প্রথমার্ধ শেষ করা বাংলাদেশ উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে থাইল্যান্ডকে ৪০-৩১ পয়েন্ট হারিয়ে নারী কাবাডি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের টিকিট এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে দেশের প্রথম পদকও নিশ্চিত করেছে।

থাইল্যান্ড টস জিতে রেইড বেছে নেয়। থানিয়ালাক বেনরিথ বোনাস পয়েন্ট নিয়ে শুরু করেন। দ্বিতীয় রেইড থেকে শ্রাবণী মল্লিক বাংলাদেশকে প্রথম পয়েন্ট এনে দেন, যা ছিল বোনাস পয়েন্ট। পরের রেইডে শ্রাবণী একজনকে আউট করেন। মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশকে প্রথমবার লিড এনে দেন মেইবি চাকমা। রেখা আক্তারি ট্যাকল করতে গিয়ে পয়েন্ট দেন, ফিরতি রেইড থেকে পয়েন্ট নিয়ে আসেন বৃষ্টি বিশ্বাস। নবম মিনিটে ইনজুরি নিয়ে ম্যাট ছাড়েন বাংলাদেশী রেইডার শ্রাবণী মল্লিক। ১১-১১ সমতা থেকে বৃষ্টি এক রেইডে দুজনকে আউট করেন, লিড পায় বাংলাদেশ। ১৪-১২ পয়েন্টে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় স্বাগতিকরা।

বিরতির পর দ্রুতই প্রতিপক্ষকে অলআউট করে বাংলাদেশ, এগিয়ে যায় ১৮-১৩ পয়েন্টে। সময়ের সঙ্গে আধিপত্য বাড়তে থাকে বাংলাদেশের। এই সময় রেইড ও ট্যাকল—দুই বিভাগেই দারুণ নৈপুণ্য দেখায় লাল-সবুজরা। দ্বিতীয়বারের মতো থাইল্যান্ডকে অলআউট করে ৩১-১৮ পয়েন্টে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। শেষদিকে থাইল্যান্ড মরিয়া হয়ে লড়াই করেছে বটে, তা হারের ব্যবধানই শুধু কমাতে পেরেছে। ৪০-৩১ পয়েন্টের জয়ে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো পদক নিশ্চিত করল বাংলাদেশ।

কাবাডি বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠলেই ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত হয়। ন্যূনতম ব্রোঞ্জ তো পাবেই, সেই সঙ্গে চ্যাম্পিয়ন কিংবা রানার্সআপ হওয়ার সুযোগ তো থাকছেই বাংলাদেশের।

ঢাকায় চলমান আসরের শুরু থেকেই পদকের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে আসছিলেন বাংলাদেশের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর থাইল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের মাধ্যমে সেমিফাইনাল ও পদক নিশ্চিত করার পর লাল-সবুজ শিবিরে ছিল অন্তহীন উচ্ছ্বাস। দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের অভিবাদনের জবাব দেন লাল-সবুজ পতাকা নেড়ে।

পদক জয়ের পর বাংলাদেশ কোচ আরদুজ্জামান মুন্সি বলছিলেন, ‘আমরা এশিয়ান গেমস এবং তার আগে ইরানে এশিয়ান নারী চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেছি। লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে যেকোনো মূল্যে একটি পদক খুব দরকার ছিল। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি, এখন পর্যন্ত আমরা সফল। আমরা চেষ্টা করব সামনে আরো ভালো করার।’

তিনি আরো বলেন, ‘আপনাদের মাধ্যমে আমার একটি বার্তা থাকবে—আমাদের হাতে গোনা কয়েকজন মেয়েই কাবাডি খেলে। আমাদের পর্যাপ্ত খেলোয়াড় নেই। পর্যাপ্ত খেলোয়াড় গড়ে তোলার জন্য বিকেএসপিতে কাবাডির ব্যবস্থা নেই। বিকেএসপিতে মেয়েদের কাবাডির ব্যবস্থা করতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকেই কাবাডি শুরু করতে হবে। খেলাটিকে যদি আমরা পেশা হিসেবে নিতে না পারি, তাহলে কিন্তু আমাদের কাবাডি দাঁড়াতে পারবে না। পাশাপাশি বাহিনীগুলো যদি দল গঠন করে, তাহলেও আমরা অনেক খেলোয়াড় পাব। কাবাডি আমাদের জাতীয় খেলা। এ খেলায় আমাদের অনেক সম্ভাবনা আছে—বিশ্বকাপে স্বর্ণপদক আনার মতোও সম্ভাবনা আছে। এখন না হলেও ভবিষ্যতে। আমাদের ধারাবাহিকতা যদি বজায় থাকে, আমরা যদি সুযোগ-সুবিধা পাই, আমরা অবশ্যই ভালো কিছু করতে পারব।’

বাংলাদেশ দলের রেইডার বৃষ্টি বিশ্বাস বলেন, ‘অনেক ভালো লাগছে। ফেডারেশন ও দল-সংশ্লিষ্ট এবং দেশের সবাইকে পাশে থাকার জন্য, দোয়া করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। গ্রুপ চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই আমাদের টার্গেট ছিল থাইল্যান্ড ম্যাচ। সামর্থ্যের সেরাটা দিয়ে থাইল্যান্ডকে হারানোর পরিকল্পনা ছিল। আমরা সেটা করতে পেরেছি। এজন্য কোচিং স্টাফ, ফেডারেশনের কর্মকর্তা এবং দল-সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ। ফেডারেশন কর্মকর্তা, কোচিং স্টাফ এবং খেলোয়াড়রা এক ইউনিট হয়ে কাজ করেছি বলেই লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘অবশ্যই আমাদের আত্মবিশ্বাস ছিল যে আমরা জিতব। পরের লক্ষ্য ফাইনাল খেলা। আমরা হাল ছাড়ব না, নিজেদের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করব।’