অ্যানফিল্ডের কিংবদন্তিতুল্য কোচ ইয়ুর্গেন ক্লোপের বিদায় শেষে এমন এক কোচ দায়িত্ব নিলেন যিনি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলে অপরিচিত, তেমন বড় কোনো সাফল্যও নেই। আর্নে স্লট ডাচ ক্লাব ফেনুর্ডে সফল হলেও তাকে ঘিরে লিভারপুল সমর্থকদের উচ্চাশা ছিল না হয়তো। তাকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যেও ছিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউবা আবার অল রেডদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিলেন চরম উৎকণ্ঠায়। যদিও সব উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তাকে তাড়িয়ে অ্যানফিল্ডে অভিষেক মৌসুমটা রাঙিয়েছেন ৪৬ বছর বয়সী আর্নে স্লট।
স্লটের কাছে লিভারপুল সমর্থকদের চাওয়া ছিল বড়জোর প্রিমিয়ার লিগে সেরা চারে থাকা, আর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের টিকিট নিশ্চিত করে খেলে যাওয়া। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি অ্যানফিল্ডে উৎসবের উপলক্ষ তৈরি করে দিয়েছেন প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এনে দিয়ে। লিভারপুলের কোচ হওয়া মানেই বিশাল চাপের মুখে থাকা। স্লট অবশ্য শুরুর সেই চাপকে দারুণভাবে জয় করে নিয়েছেন।
গত মৌসুমে চমক দেখানো স্লট এবারো দারুণ সূচনা পেয়েছে। শুক্রবার রাতে অ্যানফিল্ডে এবারের লিগের উদ্বোধনী ম্যাচে বোর্নমাউথকে ৪-২ গোলে হারিয়েছে লিভারপুল। এ ম্যাচে অভিষেক হয়েছে নতুন কেনা মিলোস কেরকেজ, জেরেমি ফ্রিমপং, হুগো একিতিকে, ফ্লোরিয়ান ভির্টজের।
স্লট কিংবা লিভারপুল সমর্থকদের জন্য গতবারের চেয়ে এবারের শুরুটা আলাদাই। এবার অল রেডরা ২০২৫-২৬ প্রিমিয়ার লিগ মৌসুম শুরু করেছে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। গত মৌসুমে চার ম্যাচ হাতে রেখেই শিরোপা জিতে নেয়া দলটি রানার্সআপ দলের চেয়ে এগিয়ে ছিল ১০ পয়েন্টে।
পর্তুগিজ ফরওয়ার্ড দিয়েগো জোটার গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর অ্যানফিল্ডে নেমে আসে শোকের ছায়া। সেই সঙ্গে লিভারপুলের শিরোপা উদযাপনের সময় বহু সমর্থক আহত হন। এ দুটি ঘটনা না ঘটলে মৌসুমের সূচনাটা আরো রঙিন হতে পারত চ্যাম্পিয়নদের।
জোটার মৃত্যু আর যারা চলে গিয়েছেন তাদের শূন্যতা পূরণে ও শিরোপার জন্য লড়াই করতে চলতি গ্রীষ্মকালীন দলবদলে অন্তত ৩০ কোটি পাউন্ড (প্রায় ৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা) খরচ করেছে লিভারপুল, যা তাদের এবারো শিরোপার শক্ত দাবিদার করে তুলবে।
এ মুহূর্তে ইউরোপের আলোচিত স্ট্রাইকার ভির্টজকে ১১৬ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে বায়ার লেভারকুসেন থেকে কিনেছে লিভারপুল। এছাড়া ফুল-ব্যাক কেরকেজ ও ফ্রিমপংকে কিনতে ৭০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ হয়েছে অল রেডদের। কেরকেজকে লেভারকুসেন থেকে ও ফ্রিমপংকে বোর্নমাউথ থেকে কিনেছে ইংলিশ চ্যাম্পিয়নরা। এরপর এনট্র্যাখট ফ্রাংকফুর্ট থেকে এসেছেন স্ট্রাইকার একিতিকে, যার জন্য অল রেডদের খরচ পড়েছে ৭০ মিলিয়ন পাউন্ড। অভিষেক রাঙিয়েছেন একিতিকে। একটি গোল করেছেন, আর ঝলমলে পারফরম্যান্সে মুগ্ধ করেছেন অ্যানফিল্ডের দর্শকদের।
ক্রিস্টাল প্যালেসের অধিনায়ক ও ডিফেন্সিভ মার্ক গুয়েহিকে কেনার জোর প্রচেষ্টা চলছে। তার জন্য ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করা লাগতে পারে লিভারপুলকে। ইতালির পারমা থেকে ২৬ মিলিয়ন পাউন্ড ফি দিয়ে অল রেডরা কিনেছে ১৮ বছর বয়সী সেন্টারব্যাক জিওভানি লিওনিকে।
চলতি গ্রীষ্মের তো বটেই লিভারপুলের ও ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি দিয়ে অ্যানফিল্ডে আনা হতে পারে আলেক্সান্ডার ইসাককে। তার জন্য নিউক্যাসল ইউনাইটেড চায় ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ড। সুইডিশ স্ট্রাইকার ম্যাগপাইদের বলে দিয়েছেন, তিনি লিভারপুলেই যোগ দেবেন। স্লট আরেকটি লিগ শিরোপা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জিততে মরিয়া। এজন্য তিনি চ্যাম্পিয়ন দল নিশ্চিত করতে চান। প্রথম মৌসুমেই দলকে লিগ শিরোপা এনে দেয়ায় ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ গ্রীষ্মকালীন দলবদলে তার সব চাওয়াই পূরণ করে চলেছে।
কোটি কোটি পাউন্ড খরচ করে গড়া দল নিয়ে স্লট এবারো চাপে থাকবে। এটা প্রত্যাশার চাপ। গতবারের চেয়েও বেশি চাপে থাকবেন নিশ্চিতভাবে। এত বেশি অর্থ খরচ করে দল গড়ার পর শিরোপা জিততে না পারলে সেটিকে তার শোচনীয় ব্যর্থতা হিসেবেই দেখা হবে।
শিরোপার রেসে লিভারপুলের প্রতিদ্বন্দ্বী আর্সেনাল, চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটিও তাদের স্কোয়াডের শক্তি বাড়িয়েছে। গতবারের মতো একদলীয় ‘শাসন’ যেন না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে মরিয়া বাকি বড় দলগুলো।
লিভারপুল ও ইংল্যান্ডের সাবেক মিডফিল্ডার ড্যানি মার্ফি মনে করেন, এবারের বাড়তি চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন স্লট। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, স্লট এমন এক ম্যানেজার যে কিনা আগেই চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। তাকে বেশ শান্ত মনে হয়। তিনি সবকিছু স্পষ্ট আর ভিন্ন পরিস্থিতিতে কীভাবে মানিয়ে নিতে হয়, সেটিও ভালোই জানেন। গত মৌসুমজুড়ে স্লটের টেম্পারামেন্টও ছিল চমৎকার। খুব বেশি সময় আসেনি যখন তাকে ধুঁকতে হয়েছে। আপনি হয়তো বলবেন, জয়রথে থাকলে শান্ত থাকা সহজ হয়। কিন্তু যখন তারা চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজির কাছে কিংবা কারাবাও কাপ ফাইনালে নিউক্যাসলের কাছে হারল তখনো আমি তাকে খুবই শান্ত ও স্থির থাকতে দেখেছি।’
ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আর্নল্ড ফ্রি ট্রান্সফারে রিয়াল মাদ্রিদে নাম লিখিয়েছেন। লুইস দিয়াজ নাম লিখিয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখে, ডারউইন নুনেজ গেছেন আল হিলালে। আবার ডিফেন্ডার জারেল কুয়ানসাহ নাম লিখিয়েছেন বায়ার লেভারকুসেনে। সব মিলিয়ে পুরানো-নতুনের কম্বিনেশন ঠিক করতে বেশ পরিশ্রম করতে হবে লিভারপুল কোচকে। সম্প্রতি কমিউনিটি শিল্ডে ক্রিস্টাল প্যালেসের কাছে হেরেছে অল রেডরা, যে ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন ফ্রিমপং, কেরকেজ, ভির্টজ ও একিতিকেরা সবাই। এ ম্যাচটি দেখে স্লট নিশ্চয়ই সামনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অনেকটা ধারণা পেয়েছেন। এদের নিয়েই লিগের উদ্বোধনী ম্যাচে জয় পেয়েছেন স্লট।










