গত এক দশকে ইউরোপের ফুটবল লিগগুলোয় ছিল অর্থের ঝনঝনানি। কে কাকে হারিয়ে বড় বড় খেলোয়াড় কিনবে, তারকাপুঞ্জ গড়ে তাকে পুঁজি করে বাণিজ্য করবে আর বড় বড় ট্রফি জিতে নেবে—সেই প্রতিযোগিতা চলছিল ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোয়। ইউরো-ডলারের শক্তি প্রদর্শনের সেই প্রতিযোগিতা কি অনেকটাই কমে এল? এখন সুপারস্টারের পেছনে না ছুটে বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তারুণ্যনির্ভর দল গড়ায় মনোযোগী ক্লাবগুলো।
২০১৭ সালে দুনিয়া কাঁপানো ট্রান্সফার ফি ২২২ মিলিয়ন ইউরো বা ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে বার্সেলোনা থেকে ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমারকে দলভুক্ত করে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। সেই একই বছর মোনাকো থেকে ফরাসি সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পেকেও নেয় পিএসজি। যদিও কৌশলগত কারণে প্রথম মৌসুমটা ধার চুক্তিতে ছিল, ২০১৮ সালে তাকে স্থায়ীভাবে কিনে নেয় ক্লাবটি। এমবাপ্পের ট্রান্সফার ফি ছিল ১৮০ মিলিয়ন ইউরো, যা এখন পর্যন্ত ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। পিএসজিতে গোলের রেকর্ড গড়ে গত বছর এমবাপ্পে যোগ দিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদে।
২০১৯ সালে বেনফিকা থেকে ১২৬ মিলিয়ন ইউরোয় (১১৩ মিলিয়ন পাউন্ড) হোয়াও ফেলিক্সকে কিনে নেয় অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল ক্লাব হিসেবে পরিচিত স্পেনের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। যদিও এটি ছিল তাদের ‘ব্যর্থ প্রকল্প’। দলের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় জায়গা হারান। পরে ধারে খেলানো হয় চেলসি, বার্সেলোনা ও এসি মিলানে। ইউরোপের পাট চুকিয়ে সম্প্রতি সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসেরে নাম লেখান ২৫ বছর বয়সী ফেলিক্স। ছয় বছরের ব্যবধানে তার ট্রান্সফার ফি নেমেছে ২৬ দশমিক ২ মিলিয়ন পাউন্ডে!
২০২২ সালের বিশ্বকাপে আলো ছড়ান তরুণ মিডফিল্ডার এঞ্জো ফার্নান্দেজ। ঝলমলে পারফরম্যান্স তাকে নিয়ে আসে পাদপ্রদীপের আলোয়। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব চেলসিতে এসেছেন নতুন মালিক টড বোহেলি। তারা আর্জেন্টাইন তরুণ তুর্কিকে কিনে নিলেন ১২১ মিলিয়ন ইউরোয়। শুরুতে টিকে থাকতে লড়াই করলেও এখন অবস্থান পাকা করেছেন এবং তিনি চেলসির অধিনায়ক।
২০১৯ সালে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ থেকে ফরাসি স্ট্রাইকার আতোয়াঁ গ্রিজম্যানকে ১২০ মিলিয়ন ইউরোয় (১০৭ মিলিয়ন পাউন্ড) কিনে নেয় বার্সেলোনা। এটা ইতিহাসের পঞ্চম সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি।
সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১০ জন খেলোয়াড়ের ট্রান্সফার ফি ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি। এর মধ্যে ২০২০ সালের আগে পাঁচজন ও পরে পাঁচজন। আর শীর্ষ পাঁচের মধ্যে মাত্র একজনের দলবদল হয়েছে ২০২০ সালের পরে, তিনি এঞ্জো ফার্নান্দেজ। ক্রমেই উচ্চ ফি দিয়ে কেনার প্রবণতা কমছে। চলতি দলবদলে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে একশ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় হয়েছে শুধু একজনের পেছনে—তিনি ফ্লোরিয়ান ভির্টজ। তাকে জার্মানির বায়ার লেভারকুসেন থেকে কিনেছে লিভারপুল। এছাড়া ৫০ থেকে ৭১ মিলিয়ন পাউন্ডের মধ্যে আছেন ১১ জন।
ক্লাবগুলো এখন দেদার খরচের কৌশল থেকে সরে এসে ভবিষ্যতের জন্য টেকসই দল গঠনে মনোযোগী হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে নেয়া যেতে পারে চেলসিকে। ২০২২ সালে টড বোহেলির নেতৃত্বে চেলসির মালিকানায় আসে আমেরিকান কোম্পানি ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটাল। এরপর দলবদলের বাজারে কোটি কোটি পাউন্ড খরচ করে তারা। ব্লুজরা মূলত তারকা খেলোয়াড় না কিনে অপেক্ষাকৃত তরুণ খেলোয়াড় কেনার কৌশল বেছে নেয়। তাতেই সফল দলটি। এঞ্জো ফার্নান্দেজ, কোল পারমারের মতো তরুণদের হাত ধরে এবার ইউরোপসেরা পিএসজিকে হারিয়ে ৩২ দলের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছে চেলসি!
নতুন মালিকানায় সাতটি দলবদলে চেলসি খরচ করেছে ১৩২ কোটি পাউন্ড। এর মধ্যে আক্রমণভাগেই ৫৬ কোটি পাউন্ডের বেশি (প্রায় ৪৩ শতাংশ) অর্থ ঢেলেছেন টড বোহেলিরা। এবারের দলবদলে ব্রাইটন স্ট্রাইকার হোয়াও পেদ্রোকে তারা কিনেছে ৬ কোটিতে। ফ্লুমিনেন্সের একাডেমি থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়টি চুক্তি করার পরই ক্লাব বিশ্বকাপে পালমেইরাসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছেন। ২০২৩ সালে যোগ দেয়ার পর ব্রাইটনের হয়ে ৭০ ম্যাচে ৩০ গোল করেছেন তিনি। ব্রাইটন তাকে কিনেছিল ৩ কোটি পাউন্ডে।
গত বছরের চুক্তি অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্মে পালমেইরাস থেকে চেলসিতে যোগ দিয়েছেন ১৮ বছর বয়সী ব্রাজিলীয় উইঙ্গার এস্তেভাও। তিনি এরই মধ্যে প্রাক-মৌসুম ম্যাচও খেলেছেন। এছাড়া চলতি দলবদলে চেলসি কিনেছে লিয়াম দেলাপকে। কোল পালমার, নিকোলাস জ্যাকসন, পেদ্রো নেতো, নোনি মাদুয়েকে, ক্রিস্টোফার এনকুনকু, মার্ক গুইয়ু ও টাইরিক জর্জ আগে থেকেই আছেন। ফলে এবার লিগে তারুণ্যনির্ভর শক্তিশালী এক দল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চেলসি। বড় কোনো খেলোয়াড় না কিনলেও চলে লন্ডনের পরাশক্তিদের।
একইভাবে লিওনেল মেসি, নেইমার ও কিলিয়ান এমবাপ্পে চলে যাওয়ার পর তরুণ খেলোয়াড়দের ওপর ভরসা করার ‘বিলাসিতা’ দেখায় পিএসজি, যারা অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে অনেক সমালোচিত হয়েছিল। সেই পিএসজি তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়েই বাজিমাত করেছে এবার। লুই এনরিকের অনবদ্য কোচিং আর তারুণ্যের শক্তিতে ২০২৪-২৫ মৌসুমে প্রথমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জিতে নিয়েছে পিএসজি, যা তারা পারেনি মেসি, নেইমার ও এমবাপ্পের মতো তিন সুপারস্টারকে নিয়েও!
বার্সার একাডেমির কথা কে না জানে। সেই একাডেমি থেকে উঠে এসে বিশ্ব জয় করেছেন মেসি, জাভি, ইনিয়েস্তা, পিকে, আলবার, ফ্যাব্রেগাসরা। বর্তমান স্কোয়াডেও একাডেমির ছাত্ররাই কর্তৃত্ব করছেন। কাতালানদের শক্তি এখন তারুণ্য। ব্যালন ডি’অরের বড় দাবিদার লামিনে ইয়ামাল ছাড়াও গাভি, ফেরান তোরেস, পেদ্রি, দানি ওলমো, মার্ক কাসাদো, এরিক গার্সিয়া, হোয়ান গার্সিয়া, ফারমিন লোপেজ, আলেহান্দ্রো বালদের মতো তরুণদের নিয়েই ছুটতে চায় লা লিগা চ্যাম্পিয়ন বার্সা। গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনাল খেলে বার্সা প্রমাণ করেছে, তরুণদের ওপর ভরসা করাই যায়।
রিয়াল মাদ্রিদে সবসময় তারকার সমাবেশ থাকলেও ব্যয়বহুল খেলোয়াড়দের তালিকায় শীর্ষ ১৩-তে নেই তাদের নাম! ২০২৩ সালে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড থেকে ৮৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনা জুড বেলিংহ্যামই তাদের সবচেয়ে ব্যয়বহুল খেলোয়াড়। জাভি আলোনসো কোচ হয়ে আসার পরও তাদের ট্রান্সফার নীতিতে বড় পরিবর্তন হয়নি। চলতি দলবদলে তারা বড় কোনো খেলোয়াড়ের পেছনে ছোটেনি। বোর্নমাউথ থেকে তারা ডিন হুইজেনকে কিনেছে ৬২ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ইউরোয়। এছাড়া লিভারপুল থেকে ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আর্নল্ডকে ১১ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন ইউরোয়, রিভার প্লেট থেকে ফ্রাঙ্কো মাস্তাতুয়োন্তোকে ৪৫ মিলিয়ন ইউরোয় ও বেনফিকা থেকে আলভারো ক্যারেরাকে ৫০ মিলিয়ন ইউরোয় কিনেছে লস ব্লাঙ্কোসরা।
ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, চেলসি, আর্সেনাল—সব বড় দলই এখন বড় নামের পেছনে নয়, দলের জন্য উপযুক্ত আর মেধাবী তরুণ খেলোয়াড়ের পেছনে ছুটছে।
এদিকে গ্রীষ্মকালীন দলবদল জুনে শুরু হয়ে এখনো চলমান, যা শেষ হবে আগামী ১ সেপ্টেম্বর। এরই মধ্যে লিগের নতুন মৌসুম (২০২৫-২৬) শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্লাবগুলো। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, স্প্যানিশ লা লিগা ও ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ান শুরু হবে ১৫ আগস্ট। জার্মান বুন্দেসলিগা ও ইতালিয়ান সিরি-এ শুরু হবে ২২ ও ২৩ আগস্ট। লিগ শুরুর প্রস্তুতি চলার মাঝেই ক্লাবগুলো নিজেদের স্কোয়াডও গুছিয়ে নিচ্ছে। গ্রীষ্মের দলবদলে সবচেয়ে বেশি সরব ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ।
এখন পর্যন্ত অন্তত ২১ জন খেলোয়াড়কে ন্যূনতম ৩৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে কিনেছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বিভিন্ন ক্লাব, যার মধ্যে ১২ জনই আবার এসেছেন প্রিমিয়ার লিগের বাইরের কোনো ক্লাব থেকে। চলতি গ্রীষ্মের দলবদলে এখন পর্যন্ত ব্যয়বহুল দুই খেলোয়াড় হলেন ফ্লোরিয়ান ভির্টজ ও হুগো একিতিকে, যারা উভয়ই লিভারপুলে এসেছেন জার্মান বুন্দেসলিগা থেকে। এছাড়া লিভারপুলের হয়ে চমক দেখাতে তৈরি ১৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ ফরওয়ার্ড রিও এনগুমোহা। আর্সেনালের দুই ব্যয়বহুল খেলোয়াড় মার্টিন জুবিমেন্দি ও ভিক্টর ইয়োকেরেস এসেছেন যথাক্রমে স্পেন ও পর্তুগিজ লিগ থেকে। ম্যানচেস্টার সিটির কেনা তিন খেলোয়াড়ের দুজন—তিজানি রেইন্ডার্স ও রায়ান চেরকি উভয়ই এসেছেন যথাক্রমে ইতালির সিরি-এ ও ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ান থেকে। এবারের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে স্প্যানিশ লা লিগা, ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ান আর ইতালিয়ান সিরি-এ মোটামুটি নীরবই বলা যায়।
ইএসপিএন, বিবিসি, গোল ডটকম










