লিওনেল মেসি ফুটবল ছাড়ার পর কোচিংয়ে নিজেকে দেখছেন না, অন্তত প্রযুক্তিগত কোচিং নয়। প্রধান কোচ হওয়া সম্ভব হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার সবচেয়ে বড় আগ্রহ ক্লাবের মালিকানায়। আদর্শগতভাবে তিনি শূন্য থেকে কিছু গড়ে তুলতে চান—যেখানে তরুণরা সুযোগ পাবে, বেড়ে উঠবে ও বিকশিত হবে।

এ কথাগুলোই উঠে এসেছে সম্প্রতি স্প্যানিশ ভাষায় প্রচারিত এক প্রাণবন্ত পডকাস্টে, যা প্রকাশ করেছে লুজু টিভি। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মেসি যেন ধীরে ধীরে ফুটবলের মহাতারকার পরিচয়ের বাইরে নিজের নতুন এক পরিচয়ে গড়ে তুলছেন—একজন বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও ভবিষ্যৎ ক্লাব মালিক হিসেবে।

মেসি বর্তমানে মেজর লিগ সকার ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন। তার আগের চুক্তির মেয়াদ ২০২৫ সাল পর্যন্ত থাকলেও সম্প্রতি তা ২০২৮ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ওয়ানফুটবল ডটকমের তথ্যমতে, তার প্রাথমিক চুক্তির মূল্য ছিল প্রায় ১৫ কোটি ডলার। ২০২৮ সাল নাগাদ তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে, আর মেসির বয়স তখন হবে ৪০ বছর। তবে এ চুক্তির বিশেষত্ব কেবল বেতনে নয়—এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মালিকানার স্বাদ। খবর অনুযায়ী, মেসির চুক্তিতে ইন্টার মায়ামির মাইনরিটি শেয়ার ও অ্যাপলের সঙ্গে এমএলএসের ১০ বছর মেয়াদি মিডিয়া রাইটস চুক্তির লভ্যাংশও পাচ্ছেন তিনি। অর্থাৎ মাঠের বাইরে থেকেও লিগের সাফল্যে সরাসরি যুক্ত মেসি।

২০২২ সালের অক্টোবরে মেসি প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্লে টাইম স্পোর্টস-টেক হোল্ডকো’, যার সদর দপ্তর সানফ্রান্সিসকোতে। এ বিনিয়োগ প্লাটফর্মের মাধ্যমে তিনি খেলাধুলা, মিডিয়া ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করছেন। সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রাজমিগ হোভাহিমিয়ান। প্লে টাইমের কয়েকটি বিনিয়োগ সরাসরি খেলাধুলাসংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে অন্যতম ম্যাচডে ডটকম। এটি একটি ফ্যান্টাসি ফুটবল প্লাটফর্ম, যার লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় ফুটবলারদের বৈশ্বিক ইউনিয়ন ফিফপ্রোর মাধ্যমে। আরেকটি হলো মেমেন্টো, যা সমর্থকদের জন্য ডিজিটাল স্ক্র্যাপবুক তৈরির একটি অ্যাপ।

ব্যবসা বা টেকনোলজিতে যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, ফুটবল সবসময়ই মেসির সত্তায় মিশে থাকবে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন প্রোডাকশন কোম্পানি ‘৫২৫ রোজারিও’। এ উদ্যোগ অনেকটাই মেসির স্বপ্নের প্রতিফলন—নিজের শিকড় রোজারিও থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নতুন প্রজন্মকে সুযোগ করে দেয়া। এ সংস্থার অধীনেই গত ডিসেম্বরে মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৬ বছরের কম বয়সী ফুটবলারদের নিয়ে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ‘দ্য মেসি কাপ’।

মাঠের মেসি যেমন নিখুঁত পাসে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেন, মাঠের বাইরের মেসিও তেমনি ধীরস্থিরভাবে গড়ে তুলছেন তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। খেলোয়াড় থেকে বিনিয়োগকারী, তারকা থেকে সিদ্ধান্ত নির্ধারক—মেসির বিবর্তন এখানে কেবলই শুরু। আর ফুটবলপ্রেমীদের জন্য স্বস্তির খবর এটাই যে বুট তুলে রাখলেও ফুটবলকে কেন্দ্র করেই থাকবে মেসির আগামীর পৃথিবী।

তবে মেসির বিনিয়োগ কেবল খেলাধুলায় সীমাবদ্ধ নয়। প্লে টাইমের মাধ্যমে তিনি ঢুকে পড়েছেন ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে। প্লে টাইমে আরো কিছু প্রধান বিনিয়োগ খাত হচ্ছে সুপারঅ্যানোটেট, পারসেপট্রন ও ফিল্ড এআই। এর মধ্যে সুপারঅ্যানোটেট এআই ডাটা ও মূল্যায়ন পাইপলাইনে কাজ করে এবং অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস, এনভিডিয়া ও আইবিএমের মতো জায়ান্টদের সঙ্গেও অংশীদারত্ব রয়েছে। এছাড়া বাস্তব জগৎ বুঝতে সক্ষম শারীরিক আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (এজিআই) তৈরির চেষ্টা করছে পারসেপট্রন। অন্যদিকে জিপিএস ছাড়াই জটিল পরিবেশে কাজ করতে সক্ষম রোবটের জন্য এআই তৈরি করছে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিষ্ঠান ফিল্ডএআই। এখানে ডিপমাইন্ড, নাসা জেপিএল, টেসলা ও এনভিডিয়ার অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা কাজ করছেন।

স্পোর্টিংকো জানিয়েছে, ইন্টার মায়ামিতে ২০২৩ সালে সই করা আড়াই বছরের চুক্তি থেকে অন্তত ১৫ কোটি ডলার আয় করবেন মেসি। গত বছরের শেষ দিকে তিনি ইন্টারের সঙ্গে চুক্তিটা নবায়ন করেছেন, যা শেষ হবে ২০২৮ সালে।

মেসির আগমনের পর ইন্টার মায়ামির ভ্যালুয়েশন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৯ কোটি ডলারে। এছাড়া লিগের আবেদনও বেড়ে গেছে। অন্তত পাঁচটি ক্লাব তাদের হোম ম্যাচে দর্শক উপস্থিতিতে রেকর্ড গড়েছে। এ কারণেই মেসিকে রেখে দিতে মরিয়া ইন্টার মায়ামি আর মেজর লিগ সকার উভয়ই।