ভুটান যেন হয়ে উঠেছে ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’। এ মুহূর্তে ভুটানের বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলতে দেশটিতে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের ১৫ সদস্য। সেই সঙ্গে সাফ অনূর্ধ্ব-১৭ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে ভুটান পৌঁছেছে বাংলাদেশের কিশোরীরা। গতকাল তারা প্রথমবারের মতো অনুশীলনও করেছে। ২০ থেকে ৩১ আগস্ট ভুটানে বসছে সপ্তম বয়সভিত্তিক নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। সব মিলিয়ে নারী ফুটবলার, কর্মকর্তা আর কোচিং স্টাফের সদস্য মিলিয়ে ভুটানে এখন বাংলাদেশীদের বিরাট এক কন্টিনজেন্টের অবস্থান।

বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল একের পর এক সাফল্য পাওয়ায় তারকাদের চাহিদা বাড়ছে বিদেশের লিগে। জাতীয় দলের প্রায় সবাই এখন ভুটানের বিভিন্ন ক্লাবে খেলছেন। দেশের বাইরের ক্লাবে খেলার তালিকায় সর্বশেষ নাম উঠেছে জাতীয় দলের অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার প্রান্তি ও স্বপ্না রানীর। সদ্যই বাংলাদেশ দলকে অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের মূল পর্বে নিয়ে যাওয়া এ দুই ফুটবলার যোগ দিয়েছেন ভুটানের রয়্যাল থিম্পু কলেজ উইমেনস ফুটবল ক্লাবে।

এ দলটির হয়ে আফঈদা ও স্বপ্না খেলবেন এএফসি ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে। ২৫ আগস্ট লাওসে শুরু হবে এ আসরের প্রিলিমিনারি রাউন্ডের খেলা। এ লাওসেই সম্প্রতি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব খেলে এসেছেন আফঈদা আর স্বপ্না। কাজেই এ মিশনটি তাদের দুজনের জন্য কঠিন হবে না। সহজেই কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন তারা।

শুক্রবার ভুটানের ক্লাবে যোগ দেয়ার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন আফঈদা ও স্বপ্না। আফঈদা পোস্টে লিখেছেন, ‘ভুটানের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছি। নতুন মিশন এএফসি উইমেনস ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ। আমাকে আপনাদের প্রার্থনায় রাখুন।’

আফঈদার মতো একই বার্তা দিয়ে বিমানবন্দরে নিজের ছবি পোস্ট করেছেন স্বপ্না রানী। তিনিও আফঈদার মতো অনূর্ধ্ব-২০ দলের পাশাপাশি জাতীয় দলেরও সদস্য। এ দুজনই সম্প্রতি মিয়ানমারে এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব উতরানো দলেও ছিলেন। একই সঙ্গে তারা অনূর্ধ্ব-২০ ও সিনিয়র পর্যায়ের এশিয়ান কাপে খেলবেন।

আফঈদা ও স্বপ্না যোগ দেয়ায় ভুটানের বিভিন্ন ক্লাবে বাংলাদেশের নারী ফুটবলারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এখন ১৫ জনে। এ বছর প্রথম দফায় সাবিনা খাতুন, ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা ও মাতসুশিমা সুমাইয়া ভুটানের লিগে খেলতে যান। তারা সবাই খেলছেন পারো এফসির হয়ে। এরপর তাদের সঙ্গে যোগ দেন মারিয়া মান্দা, সানজিদা খাতুন, মাসুরা পারভীন, রুপনা চাকমা ও শামসুন্নাহার সিনিয়র।

ময়মনসিংহের কলসিন্দুর থেকে উঠে আসা তিন বান্ধবী সানজিদা, মারিয়া ও শামসুন্নাহার সিনিয়র খেলছেন থিম্পু সিটির হয়ে এবং মাসুরা ও টানা দুই উইমেনস সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে সেরা গোলকিপারের পুরস্কার জেতা রুপনা ও কৃষ্ণা রানী সরকার খেলছেন ট্রান্সপোর্ট ইউনাইটেডের হয়ে।

এরপর স্ট্রাইকার তহুরা খাতুন, শামসুন্নাহার জুনিয়র ও শাহেদা আক্তার রিপাও ভুটানের ক্লাবে যোগ দেন। এ তিনজন ভুটানের উইমেনস লিগের দল রয়্যাল থিম্পু কলেজ এফসির হয়ে খেলছেন। ৮ আগস্ট দলটিতে যোগ দেন রিপা। তিনি আরটিসির জার্সিতে ঘরোয়া লিগের একটি ম্যাচও খেলেছেন। তাদের সঙ্গে এবার যোগ হলেন জাতীয় দলের অধিনায়ক ও ডিফেন্ডার আফঈদা ও মিডফিল্ডার স্বপ্না। শেষের দুজন এএফসি ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ শেষে দেশে ফিরে আসবেন।

ভুটানের ক্লাবে ১৫ জন মেয়ে খেলছে, এটা বাংলাদেশের ফুটবলকে কতটা উপকৃত করবে? এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নারী উইংয়ের চেয়ারপারসন মাহফুজা আক্তার কিরণ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভুটানে খেললে যেটা হবে, ওরা খেলার ভেতরেই থাকবে, সেটা আমাদের জন্যই ভালো হবে। সামনে এশিয়া কাপ আছে। অবশ্য আফঈদা আর স্বপ্না এএফসি ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ খেলে চলে আসবে। বাকিরা থাকবে। তাদের কেউ আসবে অক্টোবরে, কেউ আসবে ডিসেম্বরে।’

২০২২ ও ২০২৪ সালে পরপর দুবারের সাফ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের মেয়েরা। বয়সভিত্তিক সাফেও এ বছর এসেছে আরেকটি শিরোপা। এছাড়া অনূর্ধ্ব-২০ নারী দল ও সিনিয়র দল প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কিন্তু ফুটবলে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা খেলোয়াড়রা খেলতে পারছেন না নিজেদের লিগে। যে কারণে এএফসি নারী চ্যাম্পিয়নস লিগে নেই বাংলাদেশের কোনো ক্লাব।

স্বভাবতই কথা উঠছে নারীদের লিগ আয়োজন নিয়ে। দেশে লিগ থাকলে হয়তো ভুটানে এত খেলোয়াড় যেতেন না। লিগ আয়োজন নিয়ে কিরণ বলেন, ‘ডিসেম্বরেই আমরা মেয়েদের লিগ আয়োজন করব।’

ভুটানের ক্লাব প্রায় নিয়মিতই খেলে এ প্রতিযোগিতায়। গত বছর ভুটানের রয়্যাল থিম্পু কলেজ দলের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলে এসেছেন ঋতুপর্ণা, মারিয়া ও মনিকা।

এএফসি ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে ‘ডি’ গ্রুপে রয়্যাল থিম্পু কলেজ মুখোমুখি হবে চাইনিজ তাইপের কাওসিউং অ্যাটাকার্স এফসি (২৫ আগস্ট), দক্ষিণ কোরিয়ার নায়েগোইয়াং এফসি (২৮ আগস্ট) ও লাওসের মাস্টার এফসি (৩১ আগস্ট) ক্লাবের।

নারীরা ঝাঁকে ঝাঁকে যোগ দিলেও ভুটানের লিগের মান নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন তুলেছিলেন জাতীয় দলের হেড কোচ পিটার বাটলার। সাবিনা খাতুন, মাসুরা পারভীনদের দলে নেয়ার প্রসঙ্গে ভুটান লিগের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। ব্যাপারটা এমন যে ওই রকম লিগে ভালো খেললেই কী আর না খেললেই কী।