রুশ ধনকুবের রোমান আব্রামোভিচের অধ্যায়টাই ছিল চেলসির স্বর্ণযুগ। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ সব ধরনের ট্রফি জিতেছে লন্ডন জায়ান্টরা। ২০২২ সালের মে মাসে মালিকানা হস্তান্তর করে তাকে বিদায় নিতে হয়। চেলসির মালিকানা চলে যায় আমেরিকান ধনকুবের টড বোহেলির নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের হাতে। নতুন ম্যানেজমেন্ট আসার পরই বদলে যায় স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালতে থাকেন তারা। নতুন মালিকানা আসার পর খেলোয়াড় কিনতে খরচ ১২০ কোটি পাউন্ড (প্রায় ১৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা)। যদিও সেই তুলনায় মাঠের সাফল্য নেই। ক্লাবটির পারফরম্যান্স দিন দিন তলানিতে। এখন তাই কোটি কোটি ইউরো খরচ করে খেলোয়াড় কেনাকে ‘অর্থ অপচয়’ হিসেবেই দেখছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
চেলসির স্কোয়াডে ফুটবলারের সংখ্যা এখন একচল্লিশ! আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ, একুয়েডরের উঠতি তারকা ময়েজেস কাইসেদোর মতো ‘দামি’ খেলোয়াড় আছে চেলসির তাঁবুতে। দুজনের জন্যই ১০ কোটি ইউরোর বেশি লেগেছিল ব্লুজদের। সবশেষ পেদ্রো নেতোকে ৫৪ মিলিয়ন ইউরোয় কিনেছে ক্লাবটি।
টড বোহেলি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এত এত খরচ করেও লাভের লাভ আদৌ কিছু হয়েছে? গত মৌসুমে লজ্জাজনক পজিশনে থেকে লিগ শেষ করেছে চেলসি, চলতি মৌসুমের উদ্বোধনী ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে হেরেছে ২-০ গোলে। এখন তাই চেলসির ‘অহেতুক’ খেলোয়াড় কেনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চেলসির ওয়েবসাইটে ফার্স্ট টিমের জন্য নিবন্ধন করা ৪২ জন খেলোয়াড়ের নাম রয়েছে। যদিও তাদের সবাইকে অনুশীলনে দেখা যাচ্ছে না। নতুন কোচ এনজো মারেসকার অধীনে তাদের অনেকের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। কারণ গ্রীষ্মকালীন দলবদল শেষ হলে প্রিমিয়ার লিগের কাছে ২৫ জন খেলোয়াড়ের তালিকা জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনকে নতুন ক্লাব খুঁজে নিতে বলেছেন ইতালিয়ান কোচ। মারেসকা বলেন, ‘আমি এখানে ৪০-৪২ জনের সঙ্গে কাজ করছি না। আমি ২১ জন ফুটবলারের সঙ্গে কাজ করছি। বাকি ২০ জন অন্য জায়গায় ট্রেনিং করে, আমি তাদের দেখিও না। আপনার মনে হতে পারে এটা বোধ হয় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, কিন্তু বাস্তবে তেমন নয়। পরিকল্পনার বাইরে থাকা ফুটবলারদের বিশ বছরের চুক্তি থাকতে পারে, সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। আমি এসব পাত্তা দিই না।’ কোচের কথায় স্পষ্ট, কোচিং প্যানেলের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই খেলোয়াড় সাইনিংয়ের উৎসব আয়োজন করেছে চেলসি।
এভারটন, ফুলহ্যাম, লেস্টার সিটির মতো ক্লাব নিজেদের ইতিহাসে ট্রান্সফার খাতে যত অর্থ ব্যয় করেছে চেলসি গত দুই বছরেই এর চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে! তবে ৪০-৫০ জন খেলোয়াড় কেনার পরও সমর্থকরা খুশি নয়। দিনশেষে তারা চান ট্রফি। গত মৌসুমে তারা লিগে ষষ্ঠ হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ইউরোপা লিগ কোনোটিরই টিকিট পায়নি।
দল খারাপ করায় সংগত কারণেই বেশ চাপে থাকবেন নতুন কোচ। তিনি তাই শুরু থেকেই বেশ হার্ডলাইনে। তাই তো ইংলিশ তারকা রহিম স্টার্লিংকে পর্যন্ত জানিয়ে দিলেন, তিনি এ কোচের পরিকল্পনায় নেই। লিভারপুল ও ম্যানসিটির সাবেক এই কৃতী খেলোয়াড় জানতে পারলেন, চেলসিতে তিনি একেবারেই ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন। নতুন কোচ তার ব্যাপারে সিদ্ধান্তটা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে স্টার্লিংয়ের প্রতি কোচ ‘নিষ্ঠুর’ আচরণ করছেন কিনা তা জানতে চান এক সাংবাদিক। জবাবে মারেসকা বলেন, ‘আমার একদমই তা মনে হয় না। আমি সবসময় সৎ থাকার চেষ্টা করি। সিটি ম্যাচের আগেই আমি রহিমের সঙ্গে কথা বলেছি, এটা স্পষ্ট না হলে আমি আবারো বলতে পারি। আমি তাকে পরিষ্কার বলেছি যে এ মৌসুমে তাকে দলে সুযোগ পেতে ভুগতে হবে। আর সে কারণেই সে (সিটির বিপক্ষে) স্কোয়াডে নেই।’
৩০ আগস্ট প্রিমিয়ার লিগের গ্রীষ্মকালীন দলবদল মৌসুম শেষ হচ্ছে। তার আগেই চেলসিতে বড় পরিবর্তন দেখার সম্ভাবনা রয়েছে। স্টার্লিং ছাড়াও ডিফেন্ডার বেন চিলওয়েল, অ্যালেক্স দিসাসি, ট্রেভর চালোবা, মিডফিল্ডার কার্নি চুকবুয়েমেকাসহ আরো বেশকিছু খেলোয়াড়কে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মারেসকা। ইংলিশ মিডফিল্ডার কনোর গালাঘার চলে গেছেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদে। আরেক ইংলিশ খেলোয়াড় আরমান্দো ব্রোহা ইপ্সউইচে ধার চুক্তিতে নাম লিখিয়েছেন।
বৃহস্পতিবারের জয়ে একটি গোল করেছেন ননি মাদেকে। তারও নিউক্যাসলে নাম লেখানোর গুঞ্জন রয়েছে। এ নিয়ে বৃহস্পতিবার কনফারেন্স লিগের জয় শেষে মারেসকা বলেন, ‘বাস্তবতা হলো ট্রান্সফার উইন্ডো শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু এটা নিশ্চিত, ননির মতো খেলোয়াড়কে আমি পছন্দ করি।’
গতকাল পর্যন্ত চলতি দলবদল উইন্ডোতে সবার চেয়ে সক্রিয় ছিল চেলসি। তারা ১১ খেলোয়াড়কে সই করিয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম পর্তুগিজ তারকা হোয়াও ফেলিক্স। ৪৫ মিলিয়ন পাউন্ডে তাকে দলে ভেড়ায় ব্লুজরা। ২০১৯ সালে ১১৩ মিলিয়ন পাউন্ডের সাড়া জাগানো দলবদলে বেনফিকা থেকে ফেলিক্সকে সই করায় অ্যাটলেটিকো। মাঝে চেলসি ও বার্সেলোনায় ধারে খেলা এ ফরোয়ার্ড এবার মাদ্রিদ থেকে বিদায় নিলেন।
তবে এসব তারকাকে কেনার পরও ম্যানেজমেন্টের ওপর নাখোশ চেলসি সমর্থকরা। বিশেষ করে বোহেলির ওপর। একাডেমি থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়কে সঠিকভাবে ব্যবহার না করে তারকাদের পেছনে অর্থ ব্যয় করা নিয়ে আপত্তি সমর্থকদের। বিবিসি ও স্কাই স্পোর্টস










