ইউরোপের ফুটবল ক্লাবগুলো মাতানো নামিদামি সব খেলোয়াড়ের বেশির ভাগই উঠে আসেন কোনো না কোনো একাডেমি থেকে। বড় ক্লাবগুলোর অধিকাংশেরই আছে নিজস্ব একাডেমি। কিছু একাডেমি আবার তরুণ খেলোয়াড়দের দলে ভিড়িয়ে তাদের ট্রেনিং করিয়ে বেশি দামে বড় বড় ক্লাবের কাছে বিক্রি করে মুনাফা করে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, একাডেমি থেকে আয় করা ক্লাবের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে পর্তুগালের বেনফিকা। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে না পড়লেও বেনফিকা, পোর্তোর কল্যাণে এক্ষেত্রে অন্তত নাম্বার ওয়ান পর্তুগাল প্রিমেরা লিগ। 

সম্প্রতি বিশ্বের ১০০ লাভজনক ফুটবল একাডেমির তালিকা প্রকাশ করেছে সুইজারল্যান্ডের ফুটবল পরিসংখ্যানভিত্তিক স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্পোর্টস স্টাডিজ (সিআইইএস)। গত ১০ বছরে ক্লাবগুলো যেসব খেলোয়াড় বিক্রি করেছে শুধু সেই হিসাব বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। ওই খেলোয়াড়রা ১৫ থেকে ২১ বছরের মধ্যে ন্যূনতম তিন বছর নির্দিষ্ট কোনো ক্লাবে ছিল কিনা, সেটিও দেখা হয়েছে।

৫১ কোটি ৬০ লাখ রাজস্ব আয় করে তালিকার ১ নম্বরে বেনফিকা। গত পাঁচ বছরে সব মিলিয়ে যত রাজস্ব এসেছে তার দুই-তৃতীয়াংশই পেয়েছে বেনফিকা।

পোডিয়াম পূর্ণ করেছে ডাচ্‌ ক্লাব আয়াক্স (৩৭ কোটি ৬০ লাখ ইউরো) ও ফরাসি ক্লাব অলিম্পিক লিওঁ (৩৭ কোটি ইউরো)। বেনফিকার মতোই আয়াক্সের রাজস্বের ৬৬ শতাংশ এসেছে গত পাঁচ বছরে। অলিম্পিক লিওঁর ক্ষেত্রে এটি ৫০ শতাংশ।

তালিকার শীর্ষ দশে আছে তিন ইংলিশ ক্লাব—চেলসি, টটেনহাম ও ম্যানচেস্টার সিটি। এছাড়া পর্তুগালের স্পোর্টিং লিসবন, স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদ (চতুর্থ), ফরাসি লিগের মোনাকো (ষষ্ঠ, ১ বিলিয়ন এমবাপ্পেকে বিক্রি করেই ১৮ কোটি ইউরো আয় করে ক্লাবটি) এবং ইতালির আটালান্টা (দশম)। ইউরোপের বাইরে সবচেয়ে লাভজনক ফুটবল একাডেমি হলো ব্রাজিলের ফ্লামেঙ্গো (১৩তম) ও আর্জেন্টিনার রিভার প্লেট (১৪তম)।

বেনফিকা এখন পর্যন্ত ইউরোপে যত বড় বড় খেলোয়াড় সরবরাহ করেছে সেই তালিকাটি ঈর্ষণীয়। বর্তমান ম্যানচেস্টার সিটির আক্রমণভাগের নিউক্লিয়াস বার্নার্দো সিলভা, একই দলের সেন্টার ব্যাক রুবেন দিয়াজ, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ থেকে ধারে বার্সেলোনায় খেলা অ্যাটাকিং ফরোয়ার্ড হোয়াও ফেলিক্স, ম্যানসিটি থেকে ধারে বার্সেলোনায় খেলা ফুল-ব্যাক হোয়াও ক্যানসেলো, ম্যানসিটির ব্রাজিলিয়ান গোলকিপার এদেরসন, চেলসিতে খেলা আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ উল্লেখযোগ্য নাম। 

তরুণ এনজো ফার্নান্দো ২০২২ সালে কাতারে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম সদস্য। বিশ্বকাপে তার ঝলমলে পারফরম্যান্স দেখেই রিলিজ ক্লজের ১২ কোটি ১০ লাখ ইউরো ফি দিয়ে তাকে দলভুক্ত করে ইংলিশ ক্লাব চেলসি। হোয়াও ফেলিক্সের পর তিনিই বেনফিকার ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফিতে বিক্রি করা খেলোয়াড়। 

ফেলিক্স পোর্তোর যুব দল থেকে ২০১৫ সালে যোগ দেন বেনফিকায়। তাদের একাডেমিতে দক্ষতা অর্জনের পর ২০১৮-১৯ মৌসুমে দুর্দান্ত পারফর্ম করে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে পড়েন। ২০১৯ সালের গ্রীষ্মে তাকে ১২ কোটি ৬০ লাখ ইউরোর ক্লাব রেকর্ড ফিতে অ্যাটলেটিকোর কাছে বিক্রি করে দেয় বেনফিকা। যদিও এতটা বেশি ফিতে কেনায় তার ওপর প্রত্যাশার চাপও ছিল বেশি। তিনি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় সুসময় শেষ হয়ে যায়। দলে নিয়মিত জায়গা না পেয়ে তিনি ধারে খেলতে যান চেলসিতে। বর্তমানে তিনি অ্যাটলেটিকোরই লা লিগা প্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার জার্সিতে ধারে খেলছেন পর্তুগিজ স্টার।

ম্যানসিটির ২৯ বছর বয়সী অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ও উইঙ্গার সিলভা বেনফিকার একাডেমি থেকে বেড়ে ওঠার পর ২০১৪-১৫ মৌসুমে ধারে খেলেন মোনাকোতে। পরে ১ কোটি ৫৭ লাখ ইউরোয় তাকে কিনে নেয় ফরাসি লিগের দলটি। ২০১৭ সালের ২৬ মে তাকে ৭ কোটি ইউরোয় দলভুক্ত করে ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানসিটি। সেই থেকে তিনি ক্লাবটির আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসা। এখন পর্যন্ত তিনশরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন। সিটির হয়ে পাঁচটি লিগ শিরোপা, একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ মোট ১৬টি শিরোপা জিতেছেন তিনি। 

বার্নার্দো সিলভার মতো গোলকিপার এদেরসনও ম্যানসিটির হয়ে ১৬টি শিরোপা জিতেছেন। তিনিও এসেছেন বেনফিকা থেকে। ব্রাজিলের সাও পাওলোর একাডেমিতে শুরু। ২০০৯ সালে তিনি যোগ দেন বেনফিকার একাডেমিতে। সেখান থেকে ২০১১ সালে রিবেইরাও, রিও আভে, বেনফিফা ‘বি’, বেনফিফা সিনিয়র টিম হয়ে ম্যানচেস্টার সিটি। 

মেধাবী ডিফেন্ডার ক্যানসেলো ২০১৫ সালে বেনফিকা ছাড়ার পর একাধিকবার উচ্চ দামে বিক্রি হয়েছেন। ১ কোটি ৫০ লাখ ইউরোয় ভ্যালেন্সিয়া, ৪ কোটি ইউরোয় জুভেন্টাসে ও ৬ কোটি ইউরোয় ম্যানসিটি তাকে কিনে নেয়। তিনিই ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল রাইট-ব্যাক। বর্তমানে তিনি ধারে খেলেন স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনায়। 

২৬ বছর বয়সী সেন্টার-ব্যাক রুবেন দিয়াজ ২০২০ সালে সিটিতে নাম লেখান। তাকে কিনতে ৬ কোটি ৮০ লাখ ইউরো খরচ পড়ে সিটিজেনদের, যা বেড়ে ৭ কোটি ১৬ লাখ ইউরোয় পৌঁছবে। তিনি এখন সিটির রক্ষণের অন্যতম ভরসার নাম। শক্তিশালী, নির্ভরতার প্রতীক আর টেকনিক্যালি খুবই দক্ষতাসম্পন্ন তরুণ সেন্টার ব্যাক।

এছাড়া উরুগুইয়ান স্ট্রাইকার ডারউইন নুনেজকে ২০২২ সালের জুনে ৭ কোটি ৫০ লাখ ইউরোয় কিনে নেয় ইংলিশ ক্লাব লিভারপুল। সেই থেকে অল রেডদের হয়ে ৪৮ ম্যাচ খেলে ১৪টি গোল করেছেন তিনি। 

২২ বছর বয়সী পর্তুগিজ স্ট্রাইকার গনসালো রামোস আরেক ভবিষ্যৎ সুপারস্টার। কাতার বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা এ তরুণ তুর্কি ২০২৩ সালে বেনফিকা থেকে যোগ দেন পিএসজিতে। তাকে বিক্রি করে ৬ কোটি ৫০ লাখ ইউরো আয় করেছে পিএসজি। 

পর্তুগালে মোট পাঁচটি ট্যালেন্ট সেন্টার রয়েছে বেনফিকার। তাদের একাডেমির আওতায় অনেক বড় এবং ক্লাবটি অন্যদের তুলনায় একাডেমিতে বেশি বিনিয়োগ করে থাকে। ইংল্যান্ডের ক্লাব একাডেমিতে আড়াইশর বেশি খেলোয়াড় রাখার অনুমতি নেই, যদিও বেনফিকার একাডেমিতে আছে ৫০০ ফুটবলার! এখানেই বিশ্বের শীর্ষ লাভজনক একাডেমিতে পরিণত হয়েছে ক্লাবটি। জবস ইন ফুটবল