বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি বিশ্বকাপটাই শুধু জিততে পারেননি। পর্তুগালকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করার ‘শেষ সুযোগ’ তার সামনে। এটা পর্তুগালের নবম ও রোনালদোর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ আসর। ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার এবার কি পারবেন সোনালি ট্রফিটা হাতে তুলে নিতে?

ইউরোপ ছেড়ে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসেরে নাম লেখানোর পর এটি রোনালদোর প্রথম বিশ্বকাপ। ২০২২ সালে চমক জাগানো ট্রান্সফারে ইংল্যান্ড থেকে সৌদিতে পাড়ি জমানোর পর অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেন, আগের মতো ফর্ম আর ফিটনেস ধরে রাখতে পারবেন তো রোনালদো। তবে সংশয়বাদীদের মিথ্যা প্রমাণ করে এখনো তারুণ্যের গতিতে ছুটে চলেছেন সিআর সেভেন। সৌদিতে যাওয়ার পর জাতীয় দলের জার্সিতে ৩০ ম্যাচে করেছেন ২৫ গোল!

সদ্যই আল নাসেরের হয়ে প্রথমবার লিগ শিরোপা জিতেছেন, দলটির হয়ে করেছেন ১০০ গোল। আল নাসের ও পর্তুগাল জাতীয় দলের সতীর্থ হোয়াও ফেলিক্স রোনালদোকে নিয়ে বলেন, ‘আমাদের সবার সম্মিলিত অভিজ্ঞতার চেয়েও তার অভিজ্ঞতা বেশি। তিনি প্রতিদিন, প্রতি ম্যাচে যা করেন, তা অনন্য। ৪১ বছর বয়সে তিনি যা করেন, তা আমাদের জন্য বিরাট উদ্দীপনার।’

বিশ্বকাপ শিরোপাই যদি ফুটবলের মুকুট হয় তবে রোনালদো হলেন ‘মুকুটহীন রাজা’। তার অর্জন ও রেকর্ড গুনে শেষ করা কঠিন। বিশ্বকাপে রেকর্ড গড়েছেন। টানা পাঁচ আসরে গোল করা একমাত্র খেলোয়াড় তিনি। কৃতী এ ফরওয়ার্ড ক্যারিয়ারে শুধু বিশ্বকাপ মুকুট ছাড়া আর সবই পেয়েছেন। তার ‘শেষ মিশন’-এ আশায় বুক বেঁধে আছে পর্তুগিজ সমর্থকরা।

ইউরোপের অন্য বড় দলগুলোর তুলনায় পর্তুগালের বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা কমই। আগের ২২ আসরের মধ্যে তারা খেলেছে আটটিতে। এটা তাদের মাত্র নবম বিশ্বকাপ। ১৯৩০ সালে প্রথম আসরে খেলেনি ‘সেলেসাও দাস কুইনাস’খ্যাত পর্তুগাল। পরের ছয় আসরে কোয়ালিফাই করেনি তারা। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কোয়ালিফাই করে এবং মূল আসরে তৃতীয় স্থান অর্জন করে পর্তুগাল, যে দলটিতে ছিলেন ব্যালন ডি’অরজয়ী কিংবদন্তি ফুটবলার ইউসেবিও।

এরপর আবার ‘অন্ধকার যুগ’। ১৯৯৮ পর্যন্ত আট আসরের মধ্যে সাতবারই কোয়ালিফাই করেনি পর্তুগাল! ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো আসরে খেলে ১৭তম স্থান লাভ করে ইউসেবিওর দেশ। তিন আসরের বিরতি দিয়ে ২০০২ সালে জাপান ও কোরিয়া আসরে ফিরে আসে ফিগো-ডেকোদের পর্তুগাল। সেবার ১৭তম হয় দলটি।

এরপর ‘রোনালদো যুগ’ শুরু। বিস্ময়কর এ ফুটবলার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলার পর সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। তার সময়ে পর্তুগাল কোনো বিশ্বকাপে দর্শক হয়ে থাকেনি। এ নিয়ে টানা সাত বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছে ইউরোপের জায়ান্টরা। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ দিয়ে উত্থান পর্তুগালের। সেবার সেমিফাইনাল খেলেন রোনালদোরা। সর্বশেষ কাতার আসরে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে যায় ইতিহাস গড়া আফ্রিকান-আরব দেশ মরক্কোর কাছে।

রোনালদোর সময়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও একটি শক্তি হিসেবে উত্থান ঘটে পর্তুগালের। ২০০৪ সালের ইউরোয় রানার্সআপ ট্রফি, ২০০৮-এ কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১২-তে সেমিফাইনাল ও ২০১৬ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আসরে শিরোপা জিতে নেন রোনালদোরা।

লুই ফিগো, রুই কস্তা, রিকার্ডো কারভালহো ও রোনালদোরা নতুন শতাব্দীতে পর্তুগালকে ইউরোপ ও বিশ্ব ফুটবলের একটি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তারই ধারাবাহিকতায় আসতে থাকে সাফল্য। ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোর শিরোপা জয় করে পর্তুগাল।

নতুন চালু হওয়া নেশন্স লিগে দুবার শিরোপার স্বাদ পেয়েছে পর্তুগাল। নতুন শতাব্দীতে পর্তুগালের প্রতিটি সাফল্যের কারিগর রোনালদো। ৪১ বছর বয়সেও তিনি দলের আক্রমণভাগের সবচেয়ে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে আছেন। গত মাসে পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্টিনেজ বলেছেন, ‘বয়স ৪১ হয়ে গেলেও রোনালদো যেন তরুণের মতোই ক্ষুধার্ত। রোনালদো পারফর্ম করে যাচ্ছে এবং নিয়মিত প্রমাণ করে যাচ্ছে, সে জাতীয় দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি সবকিছু জয় করার পরও এমন ক্ষুধা সত্যিই অবাক করার মতো।’

রোনালদো ও পর্তুগিজদের দীর্ঘ আক্ষেপের নাম বিশ্বকাপ। বার্নার্দো সিলভা, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, পেদ্রো নেতো, ত্রিনকাও, হোয়াও ফেলিক্স, গনসালো রামোসসহ একঝাঁক তারকা নিয়ে আরেকটা বিশ্বকাপ মিশনে নামছেন রোনালদো। এবার অপূর্ণতা ঘুচবে কি তার?

রোনালদো ২২৬ ম্যাচে করেছেন ১৪৩ গোল। দুটোই রেকর্ড। এছাড়া জাতীয় দলের হয়ে ইউরো, নেশন্স কাপ এবং ক্লাবের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, ইতালির সিরি-এ লিগ, সৌদি প্রো-লিগ জিতেছেন। ব্যক্তিগত পুরস্কারেও শোকেসটা ঠাসা। জিতেছেন ব্যালন ডি’অর (৫ বার), ফিফার বর্ষসেরা (১ বার), চ্যাম্পিয়ন্স লিগের টপ স্কোরার (৬ বার), উয়েফা বর্ষসেরা (৩ বার), ইউরোপিয়ান গোল্ডেন সু (৪ বার), স্পেনের সর্বোচ্চ গোলদাতানহ (৩ বার) অসংখ্য পুরস্কার জিতেছেন দীর্ঘ ক্যারিয়ারে।

রোনালদোর শোকেসে নেই শুধু বিশ্বকাপ শিরোপা। ইতালি, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেনের ইউরোপের ষষ্ঠ দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ জিততে চায় পর্তুগাল। ব্রুনো, সিলভা ও গনসালোরা পারবেন কি ফুটবলের এ মহাতারকাকে বিদায়ী অর্ঘ্য উপহার দিতে?