প্রায় ২৪ বছর আগের গল্প। আর্জেন্টাইন ফুটবল বিস্ময় লিওনেল মেসিকে মাত্র ১৩ বছর বয়সে চুক্তিবদ্ধ করেছিল স্প্যানিশ ক্লাব এফসি বার্সেলোনা এবং সেই চুক্তিটি হয়েছিল একটি ন্যাপকিন পেপারে! ঐতিহাসিক দলিল এ ন্যাপকিন পেপারটি নিলামে উঠতে যাচ্ছে, যার ভিত্তিমূল্য ৩ লাখ পাউন্ড (প্রায় ৪ কোটি টাকা)। ইতিহাসের অন্যতম সেরা এ ফুটবলারের প্রথম চুক্তির দলিল বলেই ন্যাপকিন পেপারটি নিলামে আকর্ষণ ছড়াবে। ১৮ ও ২৭ মার্চ এ নিলাম অনুষ্ঠিত হবে।
ন্যাপকিন পেপারে সেই চুক্তির পর বার্সায় ইতিহাস গড়েন মেসি। ১৬ বছর বয়সে বার্সার সিনিয়র দলে অভিষেকের পর ৭৭৮ ম্যাচ খেলে ৬৭২ গোল করেছেন। বার্সাকে ৩৫টি শিরোপা জিততে সাহায্য করেন তিনি। হয়ে ওঠেন বার্সার আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা। ৩৬ বছর বয়সী মেসি ১০টি স্প্যানিশ লিগ, চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ অসংখ্য শিরোপা জয় করেন। বার্সায় খেলেই তিনি সাতটি ব্যালন ডি’অর জয় করেন। এখন তার ব্যালন ডি’অর আটটি। এছাড়া ফিফা দ্য বেস্টসহ অসংখ্য পুরস্কার জিতেছেন। ২০২১ সালে তিনি ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে ও ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মিয়ামিতে নাম লেখান।
যে ন্যাপকিন পেপারে লেখা চুক্তি মেসিকে বার্সায় পৌঁছে দেয়, এরপর তিনি একের পর এক রেকর্ড আর ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, সেই ন্যাপকিন পেপারের নিলামের আয়োজন করছে ব্রিটিশ অকশন হাউজ বোনহামস।
নিলাম নিয়ে বোনহামসের কর্মকর্তা ইয়ান এহলিং বলেছেন, ‘আমি নিলাম পরিচালনা করেছি, এমন জিনিসগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে রোমাঞ্চকর। হ্যাঁ, এটি ন্যাপকিন পেপার। কিন্তু এটা সেই ন্যাপকিন পেপার, যার মাধ্যমে লিওনেল মেসির ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল। এটা বার্সার ভবিষ্যৎ আর মেসির জীবন পরিবর্তন করে দিয়েছিল। ফুটবলে বিশ্বের কোটি সমর্থককে চমৎকার মুহূর্ত উপহার দিয়েছে।’
আর্জেন্টাইন এজেন্ট হোরাসিও গ্যাগিওলির মাধ্যমে বোনহামস এ নিলামের আয়োজন করতে যাচ্ছে। গ্যাগিওলিও বার্সার কাছে প্রথম মেসির নাম সুপারিশ করেছিলেন। তিনিই এতদিন ধরে এ ন্যাপকিন পেপারটি নিরাপদে সংরক্ষণ করেছিলেন।
মূলত একটি জটিল রোগই মেসি ও বার্সার মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে দেয়। ১১ বছর বয়সে চিকিৎসকরা দেখতে পান, শিশু মেসি গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি (জিএইচডি) রোগে আক্রান্ত, যা তার শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রোথ হরমোন উৎপন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করছিল। তার বয়সের অন্য শিশুদের চেয়ে তিনি অপেক্ষাকৃত খর্বাকৃতির ছিলেন। ফলে ১২ বছর বয়স থেকে প্রতি রাতে তাকে ইনজেকশন দিতে হতো। তবে মেসির পরিবার সেই ব্যয় বহন করতে পারছিল না। তখন মেসির পরিবার এমন একটি ক্লাব খুঁজছিল যারা তাদের ছেলের চিকিৎসার ব্যয় বহন করে। এভাবেই একদিন বার্সার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ঘটে যায়। পরে তিনি বার্সায় চুক্তিবদ্ধ হলে তার চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করে কাতালান ক্লাবটি। ২০০০ সালের সেই চুক্তিটি মেসির জীবন আর বার্সার গতিপথ পাল্টে দেয়। বার্সাকে ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাবের আসনে অধিষ্ঠিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন মেসি। সেসঙ্গে তিনি নিজেও ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের সম্মান পান। বিশ্বে তার এখন কোটি কোটি সমর্থক।
কিন্তু সেই চুক্তি সহজে হয়েছে কি? বার্সেলোনার অনূর্ধ্ব-১৪ দলে খেলার আশায় ট্রায়াল দিতে মেসিকে নিয়ে স্পেনে যায় তার পরিবার। ট্রায়াল শেষে তারা আর্জেন্টিনার রোজারিওতে ফিরে যায়। প্রাথমিক ট্রায়ালে বার্সার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মিলছিল না। মেসির বয়স, কম উচ্চতা আর অ-ইউরোপীয় বলে বার্সা কর্মকর্তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন।
হঠাৎ করেই একদিন বার্সার ক্রীড়া পরিচালক কার্লোস রেক্সাস মেসির পরিবারকে দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ করেন। সেখানেই হয় এ ঐতিহাসিক চুক্তি।
১৬.৫ সেন্টিমিটার বর্গাকৃতির ন্যাপকিন পেপারে সেদিন নীল কালিতে লেখা হয়েছিল চুক্তিটি। এতে সই করেছিলেন বার্সার তখনকার ক্রীড়া পরিচালক কার্লোস রেক্সাস, মেসির বাবা হোর্হে ও গ্যাগিওলি।
কী লেখা ছিল সেই ন্যাপকিন পেপারে? চুক্তিতে লেখা ছিল, ‘বার্সেলোনায় ১৪ ডিসেম্বর, ২০০০ সালে হোসেফ মিনগেলা, হোরাসিও আর বার্সার ক্রীড়া পরিচালক কার্লোস রেক্সাসের উপস্থিতিতে পূর্ণ দায়িত্বের সঙ্গে নির্দিষ্ট অঙ্কে লিওনেল মেসিকে সই করানোর ব্যাপারে একমত হওয়া গেল।’
মন্তজুইচের রিয়াল সোসিয়েতাত দে টেনিস পম্পেইয়া হোটেলে হওয়া সেই চুক্তিটি মূলত মেসিকে বার্সায় নিতে কার্লোস রেক্সাসের হস্তলিখিত অঙ্গীকারনামা।
মিনগেলা হলেন বার্সার দলবদল বিষয়ক পরামর্শক। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ ডিসেম্বরের চুক্তি সই পর্যন্ত বার্সেলোনায় মেসি ও তার পরিবারের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে মেসির আজকের এ অবস্থানে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মিনগেলা।










