বিশ্বে নারী অ্যাথলিটদের মধ্যে আয়ে টেনিস খেলোয়াড়রাই এগিয়ে। শীর্ষ ১৫ জনের মধ্যে নয়জনই টেনিস খেলোয়াড়। গত দুই দশকেই শীর্ষ নারী অ্যাথলিটের মুকুট উঠেছে সেরেনা উইলিয়ামস, মারিয়া শারাপোভা কিংবা নাওমি ওসাকার মাথায়। কিন্তু এ তিনজনই তো এখন টেনিসের বাইরে। গত বছর অবসর নেন সেরেনা। ২০২০ সালে টেনিসকে না বলেন রুশ গ্ল্যামারগার্ল শারাপোভা। কন্যা শাই জন্মগ্রহণ করায় পুরো বছরটি টেনিস থেকে দূরে ওসাকা। এতে তার চুক্তিগুলোর বেশির ভাগই সক্রিয় নেই।
এ তিন তারকার অনুপস্থিতিতে দুয়ার খুলে যায় নতুনদের। এতে লড়াইয়ে নামেন আমেরিকান টেনিসের নতুন সুপারস্টার কোকো গাফ, পোলিশ সেনসেশন ইগা সিয়ানতেক ও আলপাইন স্কিয়ার এইলিন গু। ২০২৩ সালে প্রাইজমানি ও এনডোর্সমেন্ট মিলিয়ে ২ কোটি ২৭ লাখ ডলার আয় করে শীর্ষস্থান দখল করেছেন ১৯ বছর বয়সী কোকো। এ বছরই ইউএস ওপেন জিতেছেন তিনি, যা তার ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা। এ জয়ের পর পৃষ্ঠপোষক কোম্পানি নিউ ব্যালান্স ও হেডের কাছ থেকে আকর্ষণীয় বোনাসও পেয়েছেন তিনি।
শীর্ষ আয়কারী ১৫ জনের মধ্যে টেনিস খেলোয়াড়রাই কর্তৃত্ব করছেন। এছাড়া ফুটবল ও স্কি খেলা থেকে আছেন দুজন করে। এছাড়া গলথ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে নেলি কোরদা ও জিমন্যাস্টিকস থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে সিমোন বাইলস আছেন আয়কারীদের শীর্ষ ১৫ জনের মধ্যে।
শীর্ষ আয়কারী ১৫ জন মিলে এ বছর মোট ১৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করছেন, যা আগের বছরের চেয়ে ১৯ শতাংশ কম। আয় কমে যাওয়ার কারণ শীর্ষ দুই খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি। ২০২২ সালে সেরেনা একাই আয় করেন ৩৫ মিলিয়ন ডলার। ওসাকার আয়ও ৭২ শতাংশ কমে এখন মাত্র ১৫ মিলিয়ন ডলার। এ দুজনের আয় চার্টে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
প্রাইজমানি, বেতন, এনডোর্সমেন্ট ও বোনাস অন্তর্ভুক্ত খেলোয়াড়দের মোট আয়ে। এছাড়া আছে রয়্যালটি, স্মারক, অংশগ্রহণ ফিও যোগ হয় আয়ে। তবে তাদের যে আয় দেখানো হয়েছে তা করপূর্ব। এখান থেকে খেলোয়াড়রা কর পরিশোধ করবেন, কেউ কেউ এজেন্ট ফিও দেবেন।
১৯ বছর বয়সী কোকো অর্ধ দশক ধরেই আছেন স্পন্সর কোম্পানিগুলোর রাডারে। বয়স ১৫ হওয়ার আগেই তাকে লুফে নেয় র্যাকেট প্রস্তুতকারক হেড, ইতালির পাস্তা জায়ান্ট বারিয়া ও নিউ ব্যালান্স। ওই স্পন্সর তো আছেই, এ বছর নতুন করে তিনি নামের পাশে যুক্ত করেছেন বোস, ইউপিএস, নিরীক্ষা ফার্ম বেকার টিলি। তার আরেকটি সহযোগী রোলেক্স। এবার ইউএস ওপেন জয়ের পর তার সঙ্গে চুক্তি করেছে সানগ্লাসের ব্র্যান্ড রে-ব্যান ও দ্য মারভেল মুভি।
নিউ ব্যালান্স ২০২২ সালে কোকোর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করে, যা নারীদের খেলায় অন্যতম আকর্ষণীয়। এ চুক্তির মেয়াদ পাঁচ বছরেরও বেশি। নিউ ব্যালান্স গত বছর তার জন্য বিশেষ স্মারক জুতা তৈরি করেছে। তিনি একমাত্র সক্রিয় খেলোয়াড় হিসেবে স্মারক স্নিকার পরছেন।
অলিম্পিক তারকাদের এ তালিকায় থাকার ঘটনা খুবই কম ঘটে। যদিও এ তালিকায় তিনে জায়গা করে নিয়েছেন স্ট্যানফোর্ডের ছাত্রী গু। প্যারিস অলিম্পিক এখনো দুই বছর বাকি থাকলেও তিনি স্পন্সর কোম্পানিগুলোর কাছে আকর্ষণীয় এক নামে পরিণত হয়েছেন। সানফ্রান্সিসকোতে বেড়ে উঠলেও মায়ের দেশ চীনের হয়ে খেলা শুরু করেন ২০১৯ সালে। চীনে অনুষ্ঠিত ২০২২ সালের শীতকালীন অলিম্পিক সামনে রেখে তিনি অন্তত ২০টি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেন। চীনের রাস্তায় রাস্তায় বিলবোর্ডে ভাসছে তার ছবি। এছাড়া ইনস্টাইল, ম্যারি ক্লেয়ার আর ভোগের মতো বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে ওঠে তার ছবি। সংগত কারণেই তিনি বাণিজ্যিক দুনিয়ায় আরাধ্য এক নাম হয়ে ওঠেন।
হয়তো ভবিষ্যতে আরো কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হবেন। কিন্তু এরই মধ্যে যেসব কোম্পানির সঙ্গে তার নাম সেগুলোও ঈর্ষণীয় আনতা, রেড বুল, লুইস ভুটন, ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট, টিফানি ইত্যাদি। গত বছর জ্যাকেট ব্র্যান্ড বোসিডেংয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন এবং মিলান ফ্যাশন উইকে র্যাম্পে হাঁটেন তিনি। স্পোর্টিকো দেখতে পেয়েছে, ২০২৩ সালে শুধু স্পন্সর কোম্পানি থেকেই ২ কোটি ডলারেরও বেশি আয় করেছেন গু, যা অন্য যেকোনো নারী অ্যাথলিটের চেয়ে বেশি।
জিমন্যাস্টিকসের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বাইলস ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিক সামনে রেখে তৈরি হচ্ছেন। তিনি আয়েও অন্যতম সেরা, আছেন শীর্ষ দশের মধ্যে। তার পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে আছে অ্যাথলেটা, স্পিয়েথ আমেরিকা, পাওয়ারেড, হুইটিস, জিকে এলিট, অ্যাক্সোনিয়াস, নুলো, মাস্টারক্লাস। এক বছরে তিনি স্পন্সর খাত থেকে আয় করেন ৮৫ লাখ ডলার।
শীর্ষ আয়কারীদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হলেন কোকো ও গু। যদিও এ তালিকায় অ্যালেক্স মরগান ও মেগান রাপিনো ছাড়া বাকিরা সবাই বয়সে তরুণ।
কোকো গাফ: কোকো গাফ নারী ও পুরুষ মিলিয়ে বিরল খেলোয়াড়দের একজন, যে কিনা ডাবলসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও আয়ের তালিকায় ১ নম্বরে। তিনি ডাবলস খেলেন জেসিকা পেগুলার সঙ্গে এবং ২০২২ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেন ফাইনালও খেলেন দুজন। ডাবলসের পারফরম্যান্স দিয়ে এ বছর তারা আয় করেন ৭ লাখ ১৫ হাজার ডলার করে।
ইগা সিয়ানতেক: ২ কোটি ১৯ লাখ ডলার আয় করে তালিকার দুইয়ে ২২ বছর বয়সী ইগা সিয়ানতেক। তিনি এ বছর প্রাইজমানি হিসেবে ৯৯ লাখ ও এনডোর্সমেন্ট খাত থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার আয় করেছেন। নারীদের র্যাংকিংয়ে ১ নম্বরে থেকে চলতি বছর শেষ করতে যাচ্ছেন বলে তিনি স্পন্সর কোম্পানির কাছ থেকে পেয়েছেন বাড়তি বোনাস। এ বছর তিনি ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতেছেন, যা তার ক্যারিয়ারের চতুর্থ গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা। আর বছর শেষের মর্যাদাপূর্ণ ডব্লিউটিএ ফাইনাল শিরোপা জিতে পেয়েছেন ৩১ লাখ ডলার। তার চুক্তি রয়েছে ইনফোসিস, ভিসা, টেকনিফাইবার, পোলিশ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি পিজেডইউ, রোলেক্স ও পোরশে পোল্যান্ড।
এইলিন গু: ২ কোটি ডলার আয় করে তিনে এইলিন গু। প্রাইজমানির প্রায় সবটাই এসেছে এনডোর্সমেন্ট খাত থেকে। প্রাইজমানি জিতেছেন মাত্র ২৭ হাজার ডলার। গত বছর বিশ্বকাপের জয়গুলো থেকে তিনি ওই প্রাইজমানি পান। চোটের কারণে এ বছর ‘এক্স’ গেমস খেলতে না পারলেও স্পন্সর কোম্পানিগুলোর পছন্দের শীর্ষে তিনি।
এমা রাদুকানু: চোটজর্জর বছর কাটলেও আয়টা ঈর্ষণীয় ব্রিটিশ খেলোয়াড় এমা রাদুকানুর। এ সময় তিনি ১ কোটি ৬২ লাখ ডলার ঘরে তুলেছেন। এর মধ্যে ১ কোটি ৬০ লাখই এসেছে এনডোর্সমেন্ট খাত থেকে। ২০২১ সালে একজন কোয়ালিফায়ার হিসেবে ইউএস ওপেন জিতে তাক লাগিয়ে দেয়া রাদুকানুর পেছনে বিশ্বখ্যাত সব ব্র্যান্ড ছুটতে থাকে। ফলে তিনি কোটি কোটি ডলার আয় করতে থাকেন। এইচএসবিসি, টিফানি, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ক্রিস্টিয়ান ডিওর, ভোডাফোন, পোরশে ও এভিয়ান তার স্পন্সর।
নাওমি ওসাকা: রাদুকানুর মতোই নাওমি ওসাকাও কোর্টের বাইরে থেকেও অন্যতম শীর্ষ আয়কারী। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর তিনি কোর্টে নামেননি। অথচ আয় এখনো ঈর্ষণীয়। তার আয় ৭২ শতাংশ কমলেও ১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড ব্যাংক হিসাবে জমা করেছেন তিনি। এ বছর কিছু স্পন্সরের সঙ্গে চুক্তি স্থগিত রাখলেও সম্প্রতি নতুন স্পন্সর পেয়েছেন। তামিকা নামে তার নিজস্ব চ্যাটবট এআই ক্যারেক্টার বানিয়েছে মেটা।
আয়ে এরপর বেলারুশের আরিনা সাবালেঙ্কা (১ কোটি ২২ লাখ ডলার), কাজাখস্তানের ইলেনা রিবাকিনা (৯৫ লাখ ডলার), যুক্তরাষ্ট্রের জেসিকা পেগুলা (৯০ লাখ ডলার), সিমোন বাইলস (৮৫ লাখ ডলার) ও নেলি কোরদা (৭৯ লাখ ডলার)।
সূত্র: স্পোর্টিকো










