ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী ফিফা বিশ্বকাপের পরবর্তী আসর দরজায় কড়া নাড়ছে। আগামী বছর জুন-জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় বসছে ৪৮ দলের এ আসর। এরই মধ্যে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্সের মতো ফেভারিট দলগুলো জেনে গেছে, তাদের গ্রুপ প্রতিপক্ষ কারা। আবার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপ খুব দূরে নয়। আগামী ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ভারত ও শ্রীলংকায় বসছে ছেলেদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আসর। মেয়েদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আগামী বছর জুন-জুলাইয়ে ইংল্যান্ড আর ওয়েলসে। টেনিসের চারটি গ্র্যান্ড স্লাম আসরসহ বহু ক্রীড়া আসর রয়েছে ২০২৬ সালে। সেই রোমাঞ্চের অপেক্ষায় থাকার সময়ই একটু পেছন ফিরে দেখা যাক, ক্রীড়াঙ্গনে ২০২৫ সালের আলোচিত ঘটনাগুলো কী ছিল। লিখেছেন: রকিবুল ইসলাম ও মঞ্জুরুল ইকরাম

হামজা চৌধুরীর আগমনে দেশের ফুটবলে নবজাগরণ

ইংলিশ ফুটবলের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন ‘হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা’ হামজা চৌধুরী। তার আগমনে এ দেশের মৃতপ্রায় ফুটবল আবার জেগে উঠেছে। প্রাণ ফিরেছে ঢাকার ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে। গত বছর ১৭ মার্চ সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে নামার পর হামজা চৌধুরীকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনা ছিল নজিরবিহীন, অভূতপূর্ব। তাকে একনজর দেখতে হড়োহুড়ি পড়ে যায়। সিলেট থেকে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার স্নানঘাট গ্রামে নিজ বাড়িতে গেলে স্থানীয়দের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন ইংল্যান্ডের লেস্টার সিটির এ খেলোয়াড়। এরপর ঢাকা হয়ে চলে যান শিলংয়ে। ২৫ মার্চ স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে অভিষেক ঘটে হামজার। প্রথম ম্যাচেই নজর কাড়েন। ওই ম্যাচে ড্র করে ফেরে হাভিয়ের কাবরেরার দল।

34

৪ জুন ঢাকায় ভুটানের বিপক্ষে দেশের মাটিতে অভিষেক ঘটে হামজার। ওই ম্যাচে বাংলাদেশ ২-০ গোলের জয় পায়। এরপর তিনি যতবার বাংলাদেশের জার্সি গায়ে খেলেছেন ততবারই আলোড়ন তৈরি করেছেন। হামজা মাঠে থাকা মানেই গ্যালারি দর্শকে ঠাসা। মাঠে ও মাঠের বাইরে হামজা সমর্থকদের থাকে বর্ণিল উপস্থিতি। হামজার নামে ব্যানার-ফেস্টুন আর জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে মাঠে আসেন সমর্থকরা।

গত ৯ অক্টোবর ঢাকার ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে বাছাইপর্বে যোগ করা সময়ের ১১তম মিনিটে গোল খেয়ে হংকংয়ের কাছে হেরে বসে বাংলাদেশ। ওই ম্যাচে বাংলাদেশের প্রথম গোলটি করেন হামজা, এছাড়া পুরো ম্যাচেই ছিল তার আধিপত্য। যদিও আরেকবার লাল-সবুজদের তীরে এসে তরী ডুবল। পরে ১৪ অক্টোবর হংকংয়ের মাঠে ১-১ গোলে ড্র করার কৃতিত্ব দেখায় হামজার দল। ওই ম্যাচের পারফরম্যান্স সবার প্রশংসা কুড়ায়।

গত ১৩ নভেম্বর ঢাকায় প্রীতি ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে আগে গোল খেয়েও হামজার জাদুতে ম্যাচে ফেরে বাংলাদেশ। অল্প সময়ের ব্যবধানে জোড়া গোলে দলকে ২-১-এ এগিয়ে নেন তিনি। সমর্থকরা যখন জয়ের প্রহর গুনছিলেন তখনই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া এক গোল হজম করে স্বাগতিকরা। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে কর্নার থেকে আসা বলে ফ্লিক করে কাছ থেকে গোল করেন নেপালের অনন্ত তামাং। এতে জেতা ম্যাচটা ড্র করে ফেলেন হামজা-রাকিবরা। নেপাল ম্যাচের পারফরম্যান্সে উজ্জীবিত হয়েই হামজারা ১৮ নভেম্বর ঢাকায় এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে হারিয়ে দেন ভারতকে।

সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের কাছে হেরে যাওয়ায় এশিয়া কাপের মূল পর্বে ওঠা হয়নি ঠিকই, তবে দেশের ফুটবলে ঠিকই উন্মাদনা তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন হামজা, আর কানাডাপ্রবাসী ফুটবলার শমিত সোমরা। এই উন্মাদনা ধরে রাখতে পারলে দেশের ফুটবলে যে উন্নতি অবধারিত, সেটি দিবালোকের মতোই পরিষ্কার।

ইতিহাস গড়ে এশিয়া কাপে বাংলাদেশের মেয়েরা

নারী ফুটবলে ২০২৫ সালটি বাংলাদেশের জন্য অবিস্মরণীয় একটি বছর। এ বছরই প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশের মেয়েরা। গত ২ জুলাই ইয়াঙ্গুনে বাছাই পর্বের ম্যাচে স্বাগতিক মিয়ানমারকে ২-১ গোলে হারিয়ে মূল পর্বে খেলার টিকিট পায় লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। নারী ফুটবলে রচিত হয় নতুন ইতিহাস। এই প্রথম নারীদের এশিয়া কাপের মূল পর্বে খেলবে বাংলাদেশ। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল দল প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপ খেলে। এরপর বাংলাদেশের আর কোনো জাতীয় দল এশিয়া কাপে খেলতে পারেনি।

অনূর্ধ্ব-২০ নারী এশিয়ান কাপের মূল পর্বে বাংলাদেশ: জাতীয় দল ইতিহাস গড়ার পরের মাসেই প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের টিকিট পেয়েছে অনূর্ধ্ব-২০ নারীরাও। লাওসে অনুষ্ঠিত বাছাইপর্বে ‘এইচ’ গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৬-১ গোলে হেরে যায় বাংলাদেশ। বড় এ হারের পরও সেরা তিন রানার্সআপ দলের একটি হয়ে মূল পর্বের টিকিট পায় লাল-সবুজ জার্সিধারীরা।

জাতীয় দল ও অনূর্ধ্ব-২০ দলের বাইরে ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ এশিয়া কাপে খেলেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। ২০১৭ ও ২০১৯ সালের আসরেও খেলেছেন তারা। এবার বাংলাদেশ জাতীয় নারী দল ও অনূর্ধ্ব-২০ দলও এশিয়ার মঞ্চে লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে যাচ্ছে। আগামী মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় বসছে মেয়েদের সিনিয়র এশিয়া কাপ ফুটবল আসর। পরের মাসে থাইল্যান্ডে বসবে অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ ফুটবল।

নারী ফুটবল দলের একুশে পদক জয়

২০২৪ সালে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয় করে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। এ অর্জনে ২০২৫ সালের একুশে পদকের জন্য নারী ফুটবল দলকে মনোনীত করে সরকার। দলের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার গ্রহণ করেন বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন।

ঋতুপর্ণার রোকেয়া পদক জয়

ঋতুপর্ণা চাকমার জোড়া গোলে ভর করে বাংলাদেশ শক্তিশালী মিয়ানমারকে হারিয়ে প্রথমবারে মতো এশিয়া কাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। তার গোলেই গত বছর সাফের ফাইনালে নেপালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। সেই থেকে তিনি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সুপারস্টার। ক্রীড়ায় নারী জাগরণ সৃষ্টিতে ভূমিকার জন্য ঋতুপর্ণাকে বেগম রোকেয়া পদক দেয়া হয়েছে।

কৃতী ফুটবলার ঋতুপর্ণা অল্প সময়েই নারী ফুটবলে সাড়া ফেলেছেন। দু-দুবার সাফ জয়ের পর এ বছর বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপে তুলতে বাছাইপর্বে রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। তিনি এ মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম আলোচিত ও জনপ্রিয় মুখ। কিশোরী ও তরুণীদের কাছেও তিনি ‘আইডল’। তার মুকুটে এবার যোগ হলো আরেকটি পালক।

সম্প্রতি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাত থেকে রোকেয়া পদক নেন ঋতুপর্ণা। পুরস্কার পেয়ে আনন্দিত ঋতুপর্ণা বলেছেন, ‘আমি খুবই রোমাঞ্চিত। এটি একটি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। তাই এটি আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই পুরস্কার শুধু আমার একার নয়—এটি বাংলাদেশের সব নারীর জন্য অনুপ্রেরণা। এটি আগামী প্রজন্মের ওপর ভালো প্রভাব ফেলবে।’ রাঙ্গামাটির প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা ঋতুপর্ণা চান সব বাধা পেরিয়ে আরো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছেন, ‘জীবনের প্রতিটা পুরস্কার আমার জন্য অনুপ্রেরণা এবং সম্মানের। কিন্তু আজকের এই পুরস্কারটি আমার জন্য স্পেশাল হয়ে থাকবে। আমার জীবনে এগিয়ে চলার পথে যারা অনুপ্রেরণা এবং উৎসাহ দিয়েছেন সবাইকে আমি ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাই।’

বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি সাফল্য

গত বছর ডিসেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাঠে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের পর সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাকিস্তান সফরে সিরিজ হেরেছে বাংলাদেশ। এরপর শ্রীলংকার মাঠে এবং ঘরের মাঠে পাকিস্তান ও নেদারল্যান্ডসকে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হারায় টাইগাররা। এশিয়া কাপের পর তিনটি সিরিজ খেলে দুটি জিতেছে লিটন দাসের দল। আরব আমিরাতে আফগানদের ৩-০তে সিরিজে হারানোর পর ঘরের মাঠে ক্যারিবীয়দের কাছে হেরেছে লিটন দাসের দল। সর্বশেষ ঘরের মাঠে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে জিতেছে তারা।

২০২৫ সালে ওয়ানডে সিরিজ কম খেলেছে বাংলাদেশ। তিনটি সিরিজ খেলে তার দুটিতে হেরেছে লাল-সবুজরা। শ্রীলংকার মাঠে সিরিজ হারের পর আরব আমিরাতের মাঠে আফগানিস্তানের কাছেও হেরেছে মেহেদী হাসান মিরাজের দল। অক্টোবরে ঘরের মাঠে আয়ারল্যান্ডকে ২-১-এ হারায় টাইগাররা। ২০২৫ সালে টেস্টও কম খেলেছে বাংলাদেশ। ছয়টি টেস্ট খেলে তিনটি জিতেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

মুস্তাফিজের বাজিমাত, আইপিএলে পাচ্ছেন ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি

বাংলাদেশের তারকা পেস বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নিয়েছে কলকাতা নাইট রাইডার্স। ১৬ ডিসেম্বর আবুধাবিতে আইপিএল নিলামে মুস্তাফিজকে এ দামে দলভুক্ত করে শাহরুখ খান, জুহি চাওলার দল কলকাতা।

35

৩০ বছর বয়সী মুস্তাফিজ এর আগে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস, চেন্নাই সুপার কিংস ও দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে খেলেন। এবার তিনি নাম লেখাচ্ছেন কলকাতা নাইট রাইডার্সে। আইপিএলে আট মৌসুমে ৬০ ম্যাচে ৬৫ উইকেট পেয়েছেন মুস্তাফিজ।

বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা পাচ্ছেন মুস্তাফিজ। নিলামে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ মূল্য এটিই। এর আগে ২০০৯ সালে মাশরাফি বিন মর্তুজাকে ৬ লাখ ডলারে কিনেছিল এই কলকাতা। বর্তমান বিনিময় মূল্যে যা যেটি ৫ কোটি ৪৫ লাখ রুপি।

ক্রিকেট বোর্ডে ক্রিকেট নয়, আলোচনায় ‘রাজনীতি’

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ২০২৫ সালে খুব বেশি আলোচনায় ছিল। তা নেতিবাচক কারণেই। এ সময় রাজনীতিতেই সরব ছিল বোর্ড। বিশেষ করে বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদ আর সভাপতি নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক ছিল তুঙ্গে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আগের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের জায়গায় নতুন সভাপতি করা হয় সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদকে, আসেন বেশকিছু নতুন পরিচালক। তাদের নিয়ে ফারুকের পথচলাটা মসৃণ ছিল না। একাদশ বিপিএল আয়োজন করতে গিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তার দায়ভার বর্তায় ফারুকের কাঁধে। এছাড়া বিসিবির ফান্ড এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে স্থানান্তর নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন তিনি।

সব মিলিয়ে ফারুকের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন তখনকার যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আলোচনায় আসেন সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল। ফারুককে সরিয়ে তাকে সভাপতি করা হয়। এরই মধ্যে গত অক্টোবরে চলে আসে বিসিবির নির্বাচন। তখন বুলবুল প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে ফারুক আর সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালও আগ্রহ প্রকাশ করেন। যদিও অভিযোগ ওঠে, বুলবুলকে সাপোর্ট দিচ্ছে সরকার। সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগে ঢাকার শীর্ষ ক্লাবগুলো নির্বাচন থেকে সরে যায়। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার সময় তামিম বিসিবি নির্বাচনকে ‘ফিক্সিং’ বা পাতানো নির্বাচন আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এ নির্বাচন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের জন্য একটা কালো দাগ হয়ে রইল। যারা বোর্ডে আছেন, তারা চাইলে এভাবে নির্বাচন করতে পারেন, জিততেও পারেন। তবে ক্রিকেট আজ শতভাগ হেরে গেল।’

নির্বাচনে সরকারি হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে বিভিন্ন পদে ১৬ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন অনেকে। এরপর নির্বাচন ছিল কেবলই ‘আনুষ্ঠানিকতা’। বিনা বাধায় নির্বাচিত হন বুলবুলের প্যানেলের বেশির ভাগ পরিচালক। পরে তাদের ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হন বুলবুল।

ঢাকার ৪৮টি ক্লাব বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন বর্জন করে। সে সময় ক্লাবগুলো নির্বাচন পেছানোর দাবি জানালেও সেটা মানা হয়নি। পরে সংবাদ সম্মেলনে সব ধরনের ক্রিকেট বর্জনের হুমকি দেয় ক্লাবগুলো। একই সঙ্গে বিসিবি সভাপতি বুলবুলকেও অবৈধ আখ্যা দেয় তারা। এরপর ঢাকার ৪৮ ক্লাবের মধ্যে ৪৩টি বিসিবির বর্তমান বোর্ডের অধীনে কোনো টুর্নামেন্টে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। লিগ বর্জনের চিঠি পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিসিবি হুমকি দেয় ক্লাবগুলোকে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি জানিয়ে দেয়, আসন্ন মৌসুমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগে কোনো দল অংশ না নিলে বা লিগ চলাকালে মাঝপথে সরে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে দলটিকে লিগে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। সেই সঙ্গে অবনমন হবে ওই দলের। লিগে তাদের আর ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না।

বিপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানা নিয়ে আবারো নাটকীয়তা

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দ্বাদশ আসর গত শুক্রবার শুরু হয়। অথচ বিপিএল শুরুর মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে মালিকানা ছেড়ে দেন চট্টগ্রাম রয়্যালস ফ্র্যাঞ্চাইজির স্বত্বাধিকারী আবদুল কাইয়ুম। এক চিঠিতে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) বিষয়টি জানান। তখন ত্বরিত সিদ্ধান্তে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির দায়িত্ব নেয় বিসিবি। চট্টগ্রাম রয়্যালসের ডিরেক্টর করা হয় হাবিবুল বাশারকে, আর কোচ করা হয় মিজানুর রহমান বাবুলকে।

ট্রায়াঙ্গল স্পোর্টসকে চট্টগ্রাম রয়্যালসের দায়িত্ব দেয় বিসিবি। কিন্তু তারা শুরু থেকেই ছিল টালমাটাল। টাকা পরিশোধ না করায় চট্টগ্রামে নাম লেখানো বিদেশী ক্রিকেটাররাও আসতে চাইছিলেন না। আবার বিসিবিকেও ব্যাংক গ্যারান্টির পুরো টাকা পরিশোধ করেনি তারা। নিয়ম অনুযায়ী টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ক্রিকেটারদের ২৫ শতাংশ পারিশ্রমিক দেয়ার কথা, যদিও চট্টগ্রামের মালিক তা দেননি। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলকে পাঠানো চিঠিতে চট্টগ্রাম রয়্যালসের মালিক আবদুল কাইয়ুম জানান, প্রত্যাশা অনুযায়ী পৃষ্ঠপোষক পাননি তারা। এছাড়া খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকও দিতে পারছেন না। পরে বিসিবির অধীনেই এবারের বিপিএলে অংশ নেয় চট্টগ্রাম রয়্যালস এবং শুক্রবার উদ্বোধনী দিনে তারা ৬৫ রানের জয় তুলে নেয় নবাগত দল নোয়াখালী এক্সপ্রেসের বিপক্ষে।

প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় পিএসজির

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জয় করে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। মিউনিখ ফাইনালে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে ৫-০ গোলে জয়ে ইতিহাস গড়ে পিএসজি। এই শিরোপা শুধু একটি ট্রফি নয়—এটি ছিল ১৩ বছরের অপেক্ষা, ব্যর্থতার দগদগে ক্ষত এবং মালিকদের দীর্ঘকালের স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত। স্প্যানিশ কোচ লুই এনরিকের দল শুরু থেকেই ইন্টারের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছে। ম্যাচের একেকটা পর্ব যেন ছিল এনরিকের কৌশলের নিখুঁত অনুবাদ। জয় শেষে তিনি বলেন, ‘প্রথম দিন থেকেই আমি বলেছিলাম, গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি জিততে চাই। প্যারিস কখনো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতেনি। এবার সেই স্বপ্ন সত্যি হলো। অসাধারণ অনুভূতি, যখন আপনি জানেন আপনি অসংখ্য মানুষকে আনন্দ দিতে পেরেছেন।’

ব্যালন ডি’অর ও ফিফা দ্য বেস্টে দেম্বেলে ও বোনমাতির ‘ডাবল’

পিএসজির চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের অন্যতম বড় কাণ্ডারি ওসমান দেম্বেলে জিতেছেন ব্যক্তি পর্যায়ে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পুরস্কার—ব্যালন ডিঅ’র। বার্সেলোনার লামিনে ইয়ামাল ও পিএসজি সতীর্থ ভিতিনিয়াকে হারিয়ে তিনি এ পুরস্কার পান। প্রথমবারের মতো মর্যাদাপূর্ণ ব্যালন ডি’অর জয়ের পর এ বছর ফিফার বর্ষসেরা পুরস্কার ‘ফিফা দ্য বেস্ট’ও জিতলেন দেম্বেলে। ২৮ বছর বয়সী ফরওয়ার্ড বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ও বার্সেলোনায় খেলার পর নাম লেখান পিএসজিতে। গত মৌসুমে পিএসজির জার্সিতে মোট ৫৩ ম্যাচ খেলে ৫১ গোলে অবদান রাখেন। পিএসজিকে প্রথমবারের মতো ইউরোপসেরার মুকুট জিততে সাহায্য করার পর নিজেও ব্যালন ডি’অর ও ফিফা দ্য বেস্ট জিতলেন।

36

দেম্বেলের মতোই নারী ফুটবলে ‘ডাবল’ জয়ের কীর্তি গড়লেন বার্সেলোনার স্প্যানিশ মিডফিল্ডার আইতানা বোনমাতি। তিনি ২০২৫ সালে ব্যালন ডি’অর ও ‘ফিফা দ্য বেস্ট’ পুরস্কার জিতেছেন। টানা তৃতীয়বার ‘ফিফা দ্য বেস্ট’ হলেন স্প্যানিশ তারকা।

মেসির মহিমায় বছরটি ইন্টার মায়ামিরও

মায়ামির চেস স্টেডিয়ামের রেকর্ড গরম, রেকর্ড ভিড়, আর সর্বত্র একটাই শব্দ—‘মেসি! মেসি! মেসি!’ ফাইনালটি ছিল দুই কিংবদন্তি—জর্দি আলবা ও সার্জিও বুসকেটসের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। মেসির ভাষায়, ‘আজ তাদের জন্য একটা অধ্যায় শেষ হলো। কী অসাধারণ ক্যারিয়ার কাটিয়েছে! আমি খুশি তারা এভাবে বিদায় নিতে পারল।’ ফাইনালের মঞ্চ যেন অপেক্ষা করছিল এক জাদুকরের জন্য—লিওনেল মেসি। তার দুটি মহার্ঘ অ্যাসিস্ট, এক অবিশ্বাস্য ডিফেন্সিভ স্টিল ও সামনে থেকে দেয়া নেতৃত্বে ইন্টার মায়ামি প্রথমবারের মতো জিতল এমএলএস কাপ। ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে লিখল ক্লাবের নতুন ইতিহাস। মেসি, দে পল ও বুসকেটস হলেন প্রথম খেলোয়াড় যারা বিশ্বকাপ ও এমএলএস কাপ—দুটোই জিতলেন।

37

১৯ বছরের স্বপ্নের পূর্ণতা পেল। তাই ডেভিড বেকহ্যামের চোখে ছিল জল। ইন্টার মায়ামির অন্যতম মালিক বললেন, ‘১৯ বছর আগে যে পথচলা শুরু করেছিলাম, আজ তা পূর্ণ হলো। আমার স্বপ্ন ছিল ক্লাব গড়া, সেরা খেলোয়াড়কে আনা এবং শিরোপা জেতা। আজ সবই সত্যি হলো।‘

একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ লিওনেল মেসি

প্রতিটি খেলারই নিজস্ব নক্ষত্র থাকে, থাকে কিংবদন্তি। কেউ মাঠ মাতাচ্ছেন, কেউবা তুলে রেখেছেন বুট কিংবা র‍্যাকেট। ফুটবল মাঠে লিওনেল মেসি-ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা বাস্কেটবল কোর্টে কোবি ব্রায়ান্ট-লেব্রন জেমসের উত্তরাধিকার নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু প্রশ্ন যখন ওঠে—সব খেলা মিলিয়ে এই শতাব্দীর সেরা কে, তখনই শুরু হয় ভক্তদের তুমুল লড়াই।

শতাব্দীর প্রথম ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার মুখে সেই বিতর্কের একটি মানদণ্ড দাঁড় করিয়েছে কানাডার মর্যাদাপূর্ণ সংবাদমাধ্যম ‘লে জার্নাল ডি কুইবেক’। বিশ্বের সব ধরনের খেলার সেরা ২৫ জন অ্যাথলেটের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে তারা। আর সব কিংবদন্তিকে ছাড়িয়ে তালিকার শীর্ষে, সব খেলার রাজা নির্বাচিত হয়েছেন আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের অধিনায়ক মেসির শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল পালকটি যুক্ত হয়েছে ২০২২ সালে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে। তবে তার সাফল্যের জয়রথ সেখানেই থেমে থাকেনি। গত ৬ ডিসেম্বর, ইন্টার মায়ামিকে তাদের ইতিহাসের প্রথম মেজর লিগ সকার শিরোপা জিতিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—বয়স কেবলই একটি সংখ্যা। গোল্ডেন বুট ও টানা দ্বিতীয়বারের মতো এমভিপি অ্যাওয়ার্ড জিতে মায়ামির সঙ্গে ২০২৮ সাল পর্যন্ত চুক্তি বাড়িয়েছেন এই মহাতারকা। বার্সেলোনা থেকে প্যারিস হয়ে মায়ামি—তার ট্রফি ক্যাবিনেটে এখন শোভা পাচ্ছে রেকর্ড ৪৭টি শিরোপা।

মেসির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর অবস্থান নিয়ে ভক্তদের মনে কৌতূহল থাকাটাই স্বাভাবিক। এই তালিকায় পর্তুগিজ সুপারস্টারও জায়গা পেয়েছেন সেরা দশে, আর সেটা দশম স্থানে। তার সামনে রয়েছেন নোভাক জোকোভিচ, সিমোন বাইলস এবং প্রয়াত কোবি ব্রায়ান্টের মতো তারকা।

তালিকায় মেসির ঠিক পরেই দ্বিতীয় স্থানে আছেন এনএফএল কিংবদন্তি টম ব্র্যাডি, যার ঝুলিতে রয়েছে সাতটি সুপার বোল শিরোপা। তৃতীয় অলিম্পিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পদকজয়ী সাঁতারু মাইকেল ফেলপস। এরপরে সেরেনা উইলিয়ামস (টেনিস, যুক্তরাষ্ট্র), উসাইন বোল্ট (অ্যাথলেটিকস, জ্যামাইকা), লেব্রন জেমস (বাস্কেটবল, যুক্তরাষ্ট্র), নোভাক জোকোভিচ (টেনিস-সার্বিয়া), সিমোন বাইলস (জিমন্যাস্টিকস, যুক্তরাষ্ট্র), কোবি ব্রায়ান্ট (বাস্কেটবল-যুক্তরাষ্ট্র), ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (ফুটবল, পর্তুগাল)।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর এশিয়া কাপও ভারতের

আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পর এসিসি এশিয়া কাপেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত এবং দুটি আসরই বসেছিল আরব আমিরাতে। ৯ মার্চ দুবাই ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ৪ উইকেটে হারিয়ে মর্যাদাপূর্ণ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতে নেয় ভারত। সেই দুবাইয়ে এশিয়া কাপ ফাইনালে তারা হারিয়ে দেয় পাকিস্তানকে।

ছেলেদের সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে মেয়েরাও ভারতকে বড় এক শিরোপা এনে দেন। গত ২ নভেম্বর নাভি মুম্বাইতে নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৫২ রানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়েন হারমানপ্রিত কাউর ও স্মৃতি মান্ধানারা।

টেস্টের রাজা দক্ষিণ আফ্রিকা

গত জুনে লর্ডস ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে হারিয়ে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৯৯৮ সালের পর এটিই তাদের প্রথম আইসিসি ট্রফি। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত উইলস ইন্টারন্যাশনাল কাপের শিরোপা জিতেছিল প্রোটিয়ারা। এর ৯ হাজার ৭২২ দিন পর আবার আইসিসির কোনো ট্রফি হাতে তুলেছে প্রোটিয়ারা। ২০২৪ সালে অবশ্য কাছাকাছি গিয়েও ব্যর্থ হয় দলটি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে এইডেন মার্করামরা হেরে যান ভারতের কাছে।