মার্কিন বিজনেস সাময়িকী ফোর্বসের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইস টেনিস গ্রেট রজার ফেদেরার এখন একজন বিলিয়নেয়ার এবং সপ্তম খেলোয়াড় হিসেবে তিনি অভিজাত এ ক্লাবের সদস্য হলেন। ফেদেরারের মোট সম্পদ এখন ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এর পেছনে অবদান রেখেছে তার নিজের প্রতিষ্ঠিত জুতার কোম্পানি, আর পোশাকের ব্র্যান্ড ‘অন’-এর একটি বড় অংশের মালিকানাও রয়েছে তার।

ফোর্বসের হিসাবে বিশ্বব্যাপী মোট বিলিয়নেয়ার এখন ৩ হাজার ২৮ জন। এ তালিকায় এতদিন খেলোয়াড়ের সংখ্যা ছিল মোটে ছয়জন, সপ্তম ক্রীড়া তারকা হিসেবে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ৪৪ বছর বয়সী ফেদেরার।

৪৪ বছর বয়সী ফেদেরার ২০২২ সালে র‍্যাকেট তুলে রেখেছেন। ২৪ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে জিতেছেন ১০৩টি শিরোপা, যার ২০টি গ্র্যান্ডস্লাম মুকুট। ক্যারিয়ারে মোট ১৩১ মিলিয়ন ডলার প্রাইজমানি জিতেছেন, যা টেনিস ইতিহাসে এখন পর্যন্ত তৃতীয় সর্বোচ্চ। তার সামনে শুধু সার্বিয়ার নোভাক জোকোভিচ (১৮৯ মিলিয়ন ডলার) ও স্পেনের রাফায়েল নাদাল (১৩৫ মিলিয়ন ডলার)। টানা ১৬ বছর ছিলেন টেনিসের সর্বোচ্চ আয়কারী খেলোয়াড়। এছাড়া ২০২০ সালে তিনি ১০৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার আয় করে সব অ্যাথলিটের মধ্যে সেরা হন।

কোর্টের বাইরে তার সাফল্য ছিল আরো বেশি। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, ফেদেরার তার টেনিস ক্যারিয়ারে এনডোর্সমেন্ট, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার (কর ও এজেন্টের ফি বাদ দিয়ে) আয় করেছেন। এ আয় জোকোভিচ বা নাদালের আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। ফেদেরারের স্পন্সর তালিকায় ছিল লিন্ড, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, রোলেক্স ও মোয়েট অ্যান্ড চ্যান্ডনের মতো নামি ব্র্যান্ড। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তাকে বিলাসবহুল পণ্যের প্রতীক করে তুলেছে।

এ নিয়ে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের পরিচালক লিসা ডেলপি নেইরোত্তি বলেন, ‘তার চরিত্র আর গ্রহণযোগ্যতাই বড় বিষয়। আপনি মাঠে বড় খেলোয়াড় হতে পারেন, তবে সবাই আপনাকে পছন্দ নাও করতে পারে। তিনি ছিলেন সবার পছন্দের। তার চেহারাও আকর্ষণীয়। তিনি ভদ্র আর পরিশীলিত, যা তার ব্র্যান্ডেও প্রতিফলিত হয়েছে।’

ফেদেরারকে দুই দশকে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে নাইকি। অথচ ২০১৮ সালে সেই নাইকি ছেড়ে জাপানি ব্র্যান্ড ইউনিকলোর সঙ্গে ১০ বছরের জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেন ‘ফেড এক্সপ্রেস’। ২০১৯ সালে তিনি জুরিখভিত্তিক ব্র্যান্ড ‘অন’-এর শেয়ার কেনেন। তিনি শুধু একজন বিনিয়োগকারী হিসেবেই সন্তুষ্ট ছিলেন না, ব্র্যান্ডটির জন্য একটি টেনিস জুতা এবং লাইফস্টাইল পোশাক তৈরি করতেও সহায়তা করেন।

এ বিনিয়োগের ফল মেলে মাত্র দুই বছরেই। ২০২১ সালে ‘অন’ নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। তখন ফেদেরারের শেয়ার অংশীদারত্ব ছিল প্রায় ৩%। বর্তমানে কোম্পানির বাজারমূল্য প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার এবং শেয়ারের দাম আইপিও মূল্যের চেয়ে ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। ফলে ফেদেরারের শেয়ারের মূল্য এখন ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অন-এর সাবেক সিইও মার্ক মুরার বলেন, ‘ফেদেরার ছিল একটা তরঙ্গের মতো। আমরা মূলত দরজা খুলে দিতে চেয়েছিলাম, আমরা ভালোভাবেই জানতাম, টেনিসই পরবর্তী প্রজন্মের খেলা। আমরা খুবই ভাগ্যবান যে ফেদেরারকে আমাদের এ মিশনে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলাম।’

ফেদেরার তার বিনিয়োগ থেকে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ভালো লাভ পেয়েছেন। ২০১৩ সালে তার দীর্ঘদিনের এজেন্ট টনি গডসিকের সঙ্গে তিনি ‘টিমএইট’ নামে একটি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। চার বছর পর তারা ‘লেভার কাপ’ নামে একটি বার্ষিক টেনিস টুর্নামেন্ট চালু করেন। এই টুর্নামেন্ট ধারাবাহিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠেছে।

কোর্ট ও কোর্টের বাইরের আয় এবং খেলোয়াড়ি জীবন শেষে নানা উদ্যোগ আর বিনিয়োগের সুফল হিসেবে ইতিহাসের সপ্তম হাই-লেভেল অ্যাথলিট হিসেবে ‘থ্রি-কমা’র (বিলিয়ন) অভিজাত ক্লাবে নাম লেখালেন ফেদেরার। প্রথমজনও সাবেক টেনিস খেলোয়াড়। রোমানিয়ার হয়ে ১৯৬৪ সালের অলিম্পিক গেমসে হকি খেলা আইওন টিরিয়াক পরে টেনিসেও সফল। ১৯৭০ সালের ফ্রেঞ্চ ওপেনে দ্বৈতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব দেখান তিনি। কমিউনিস্ট শাসনের অবসানের পর তিনি ব্যবসায় বিনিয়োগ শুরু করেন এবং ২০০৭ সালে বিলিয়নেয়ার ক্লাবে নাম লেখান। রিয়েল এস্টেট ব্যবসা, গাড়ির ডিলারশিপসহ নানা কিছুতে যুক্ত এ ব্যবসায়ীর মোট সম্পদ এখন প্রায় ২৩০ কোটি ডলার।

এরপর এ ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন কিংবদন্তি বাস্কেটবল খেলোয়াড় মাইকেল জর্ডান (৩৮০ কোটি ডলার), ম্যাজিক জনসন (১৫০ কোটি ডলার), জুনিয়র ব্রিজম্যান (১৪০ কোটি ডলার), লেব্রন জেমস (১২০ কোটি ডলার) ও গলফার টাইগার উডস (১৩০ কোটি ডলার)। এ সাতজনের মধ্যে এখন সক্রিয় খেলোয়াড় হিসেবে আছেন শুধু লেব্রন জেমস ও টাইগার উডস। ফোর্বস