চেলসির মালিকানায় টড বোহেলি ও ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটাল আসার পর স্কোয়াড কিংবা কোচিং স্টাফে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং তা চলছেই। কিন্তু নতুন মালিকের সময় চেলসির অর্জন কী? এই হিসাব মেলানো দুষ্করই বটে। আজ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে প্যারিস সেন্ট জার্মেই ও চেলসির ফাইনাল সামনে রেখে লন্ডন জায়ান্টদের নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে ইএসপিএন।

টড বোহেলির চেলসি অধ্যায়কে তারা তিনটি পর্বে ভাগ করেছে। প্রথম পর্বটা ২০২২ সালের গ্রীষ্ম ও ২০২৩ সালের প্রথম ভাগ। এ সময় মূলত বোহেলিই ছিলেন চেলসির অঘোষিত ক্রীড়া পরিচালক। দলবদল তিনিই তদারক করেছেন। এ সময় ব্লুজরা কিনেছে ইংলিশ ফরওয়ার্ড রহিম স্টার্লিং, সেনেগালিজ ডিফেন্ডার কালিদু কুলিবালি, ইউক্রেনের মিখাইলো মুদ্রিক ও গ্যাবনিজ পিয়েরে-এমেরিক অবামেয়াংকে। সৌদি আরবের আল নাসের ক্লাবে নাম লেখানোর আগে ৩৭ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে সই করানোর কাছাকাছি চলে গিয়েছিল চেলসি। সেবার দুই উইন্ডোতে ৬৩ কোটি ইউরোরও বেশি খরচ করার পরও প্রিমিয়ার লিগে নিচের অর্ধেই জায়গা হয় চেলসির!

পরের পর্বের পরিধি ২০২৩ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদল। এই উইন্ডোতে চেলসির খরচ ৪০ কোটি ইউরো। এবার অনেক ব্যর্থ প্রকল্পের মধ্যে দুটি সফল প্রকল্প হলো ২১ বছর বয়সী দুই তরুণ তুর্কি কোল পালমার ও ময়েজেস কাইসেদো, যারা এখন দলের সুপারস্টার, নির্ভরতার প্রতীক। পরের মৌসুমে ক্লাবটি প্রিমিয়ার লিগে ষষ্ঠ হয়।

তৃতীয় পর্বটি ছিল ২০২৪ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদল ঘিরে। এ সময় বেশকিছু তরুণকে কিনে নেয় চেলসি, যাদের শীর্ষ লিগের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হোয়াও ফেলিক্স আর কিয়েরান ডিউজবুরি-হল।

এত এত বেশি খেলোয়াড় কেনার সুফল যে একেবারেই পায়নি চেলসি, তা নয়। গত মৌসুমে উয়েফা কনফারেন্স লিগ ও প্রিমিয়ার লিগে তো দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দল খেলায় তারা। চেলসি সেবার কনফারেন্স লিগ জিতে নেয়, আর প্রিমিয়ার লিগে চতুর্থ হয়। তরুণ একটি স্কোয়াড নিয়ে আগামী উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলতে যাচ্ছে ব্লুজরা। তাদের দলটিও বেশ ঈর্ষণীয়। পালমার ও কাইসেদো এ দলের উদীয়মান নেতা। তারা এরই মধ্যে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে আলো কেড়েছেন। ৩২ দলের আসরে ফাইনালে উঠে ভবিষ্যতের বার্তাই দিচ্ছে চেলসির তারুণ্যনির্ভর দলটি।

গত তিন বছর ‘ট্রান্সফার ভ্যালু’ রয়েছে এমন খেলোয়াড় পেলেই কিনেছে চেলসি। তারা ক্লাব ফিট হবেন কিনা, সেটা যাচাই করার তাগিদও অনুভব করেনি দলটি। ফলে লন্ডন জায়ান্টরা শিরোপাহীন সময় কাটাতে থাকে। গত তিন বছরে চেলসির দলবদলে পালমার ও কাইসেদোর মতো কিছু ‘রত্ন’ ছাড়া বাকিটা ছিল হতাশাজনকই গল্প।

বর্তমান মালিক আর আগের মালিকের দর্শনের মধ্যেই তফাৎ। রাশিয়ান অলিগার্ক রোমান আব্রামোভিচ অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে চেলসির জয়কেই সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিতেন। ২০০৩ সালে লন্ডনের ক্লাবটি কিনে নেয়ার পর তিনি বিবিসিকে সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, ‘টাকা আয় আয়ের এর চেয়ে অনেক কম ঝুঁকিপূর্ণ পথ আমার জানা আছে। কিন্তু এটা স্রেফ মজা করার জন্যই, তার মানে সাফল্য পেতে চাই, ট্রফি জিততে চাই।’

সমর্থকরাও এটাই চান। রোমান আব্রামোভিচ নিজের বিলিয়ন ডলার খরচ করেছেন চেলসির জন্য। প্রতিদানে প্রচুর ট্রফি তিনি ‘উপহার’ হিসেবে পেয়েছেন।

টড বোহেলি ও ক্লিয়ারলেক এখন পর্যন্ত চেলসিতে ট্রান্সফার ফি হিসেবে ১৬২ কোটি ইউরো খরচ করেছেন। তারা তো ‘সুপার-ড্যাডি’ মালিক নয়, আবার ‘স্পোর্টসওয়াশ’ও তাদের লক্ষ্য নয়। কোনো ধনী মানুষ যখন নতুনভাবে কোনো ক্ষমতা পান ঠিক তেমনই মনে হচ্ছিল চেলসিতে বোহেলিকে। তিনি চেলসির দায়িত্ব নেয়ার পরই দলবদলে দেদার খরচ শুরু করেন। তিনি হয়তো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও প্রচুর পয়সা খরচ করে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এজন্য তো তিনি মালিকানায় আসেননি। ক্লাবের বৃহদংশ শেয়ারের মালিক ক্লিয়ারলেক প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, যাদের অধীনে রয়েছে ৭৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ। একটি প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি তো মুনাফা করবে না, এমন উদ্দেশ্যে কোনো ফুটবল দল কিনতে পারে না।

কিন্তু টড বোহেলি ও ক্লিয়ারলেক কোম্পানির অধীনে ফুটবলারদের সঙ্গে চুক্তিগুলোর কৌশল বারবার মার খেয়ে যাচ্ছিল। স্রেফ হিসাবের ভুলে। তারা উয়েফা ও প্রিমিয়ার লিগের নিয়মও ভাঙছে বারবার। সম্প্রতি তারা উয়েফার ফাইন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে নিয়ম ভাঙায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলার জরিমানা গুনেছে।

২০২২ সালের গ্রীষ্মে দায়িত্ব নেয়ার পর কেবল খেলোয়াড় কেনার পেছনেই ১৬২ কোটি ইউরো খরচ করেছেন বোহেলিরা। ওই একই সময় যেসব খেলোয়াড় বিদায় নিয়েছে তাদের দলবদল ফি ১০০ কোটি ইউরোর কাছাকাছি হবে।

আধুনিক ফুটবলে প্রতিটি ক্লাব মালিকই টিকিটের দাম বাড়িয়ে, স্টেডিয়ামে নতুন স্ট্যান্ড বানিয়ে কিংবা অল-স্টার ম্যাচের আয়োজন করে বাড়তি মুনাফার চেষ্টা করে। যদিও চেলসির নতুন মালিকের এই চেষ্টায় ঘাটতি আছে। ফুটবলে ক্লাবের আয়ের বৃহদংশই চলে যায় খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের বেতনের পেছনে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে বেতন খাতে আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ চলে যায়। অথচ আমেরিকান খেলাধুলায় এটা অনেক কম—প্রায় ৫০ শতাংশ। কাজেই দুটির হিসাব ভিন্ন। এখানেই হয়তো হিসাবে ভুল করে ফেলেছেন বোহেলি ও ক্লিয়ারলেক ম্যানেজমেন্ট।

চেলসির এই মালিক ক্লাবটি কিনে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার খরচ করেছে। যদিও এখান থেকে ফল পেতে চাইলে যতটা উন্নতির প্রয়োজন ততটা ‘ভিশন’ তাদের নেই। এবারো গৎবাঁধা কাজ—কিছু মাল্টিমিলিয়ন দামের খেলোয়াড় আছেন নজরে। প্রতিটি সম্ভাব্য দলবদল জেতাই যেন তাদের লক্ষ্য। এর পরের কাজটিই যেন ভুলে যায় তারা—যত বেশি ম্যাচ জয় করো, আর শিরোপা নিয়ে আসো।

কনফারেন্স লিগ ইউরোপের ক্লাব পর্যায়ে তৃতীয় সেরা ট্রফি। ৫০০ কোটি ডলার খরচ করে এই ট্রফিটি জিতে গৌরবের কিছু আছে কি? এবার বরং একটি বড় শিরোপা জয়ের সুযোগ এসেছে। আজ ক্লাব বিশ্বকাপ ট্রফি জেতার সুযোগ চেলসির সামনে। যদিও এজন্য তাদের টপকাতে হবে যেন ‘হিমালয়’। সামনে যে লুই এনরিকের ‘রোলারকোস্টার’ পিএসজি, যারা সেমিফাইনালে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদকে ৪-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ইএসপিএন