ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) ১৭তম আসর শুরুর আগেই একের পর এক ইতিহাস। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠেয় এ আসরের জন্য সম্প্রতি দুবাইয়ে নিলাম পরিচালনা করেন ৪৫ বছর বয়সী মল্লিকা সাগর। এই প্রথম আইপিএল নিলাম পরিচালনা করলেন কোনো নারী, প্রথমবার নিলাম হলো ভারতের বাইরে। পরে হলো আরো বড় ইতিহাস। আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে ২৪ কোটি ৭৫ লাখ রুপির ঈর্ষণীয় দামে অস্ট্রেলিয়ার ফাস্ট বোলার মিচেল স্টার্ককে কিনে নেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স! 

দুবাইয়ের কোকা-কোলা অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত এ নিলামে একই দিনে দুবার সবচেয়ে ব্যয়বহুল খেলোয়াড়ের রেকর্ড হলো। বিশ্বকাপজয়ী দলনায়ক প্যাট কামিন্সকে ২০ কোটি ৫০ লাখ রুপিতে কিনে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ইতিহাস গড়ার কিছু সময় পর স্টার্ককে কিনে সেই রেকর্ডটা ভেঙে দেয় কলকাতা। স্টার্ককে নিয়ে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে নামে গুজরাট টাইটানস ও কলকাতা নাইট রাইডার্স। অবশেষে জয়ী হয় শাহরুখ খান, জুহি চাওলার কেকেআর। 

স্টার্কের ভিত্তিমূল্য ছিল ২ কোটি রুপি। প্রথমে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ও দিল্লি ক্যাপিটালস তাকে পেতে লড়াই শুরু করে। সেই লড়াই ১০ কোটি অতিক্রম করার পর থামে দুই দল। এরপর লড়াইয়ে নাম লেখায় কলকাতা ও গুজরাট। এ দুই দলের মধ্যে তুমুল লড়াই শেষে জয় হয় দুইবারের সাবেক চ্যাম্পিয়ন কলকাতার।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে নিলামের সময় অনেক উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা ঘটে। কিন্তু মঙ্গলবার যা ঘটেছে তা সত্যিই ঐতিহাসিক। অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার মিচেল স্টার্ককে ২৪.৭৫ কোটি রুপিতে কিনেছে কলকাতা নাইট রাইডার্স। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে দেয়া হয়েছে ২০.২৫ কোটি রুপি। স্টার্ককে কিনেছে কলকাতা নাইট রাইডার্স এবং কামিন্সকে কিনেছে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। গুজরাট টাইটানসকে পেছনে ফেলে কলকাতা নাইট রাইডার্স তাদের দলে এ বাঁহাতি পেসারকে যুক্ত করেছে।

আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় স্টার্ক যদি ধরে নেয়া হয় লিগ পর্বের ১৪টি ম্যাচের সবক’টিতেই খেললেন এবং পুরো চার ওভার অর্থাৎ একটি ম্যাচে ২৪ বল করেন, তাহলে তিনি প্রায় ৩৩৬ বল করবেন। সেই হিসেবে, এক বলের জন্য ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৭ ভারতীয় রুপি পাবেন ৩৩ বছর বয়সী এ বামহাতি ফাস্ট বোলার। কলকাতা যদি প্লে অফে পৌঁছে ১৬টি ম্যাচ খেলে, তাহলে দাম দাঁড়াবে ৬ লাখ ৪৪ হাজার রুপি। আর কলকাতা যদি প্রথম কোয়ালিফায়ার হেরে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার খেলে জয়লাভ করে ফাইনালে ওঠে তবে তাদের খেলতে হবে ১৭টি ম্যাচ, গত আসরে গুজরাট যেমনটি করেছে। তাহলে স্টার্ক ৪০৮টি বল করার সুযোগ পাবেন। স্টার্ক যদি ১৭ ম্যাচে পুরো ৪০৮টি বল করেন, তবে তার প্রতি বলের দাম পড়বে ৬ লাখ রুপির একটু বেশি। 

স্টার্কের অস্ট্রেলিয়া সতীর্থ কামিন্সের কথা যদি বলা হয়, তাহলে তার একটি বলের (১৪ ম্যাচ) জন্য সানরাইজার্স হায়দরাবাদ দলকে ৬ লাখ রুপির ওপরে দিতে হবে। তিনিও যদি ১৬টি ম্যাচ খেলেন, তাহলে এ দাম পড়বে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৩৪৩ রুপি। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন চেন্নাইয়ের সঙ্গে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর কামিন্স পান সানরাইজার্স। দলটির কর্ণধার ৩১ বছর বয়সী কাব্য মরাণ কিছুতেই যেন হাল ছাড়ছিলেন না। অবশেষে ইতিহাস গড়ে তাকে দলে পায় সানরাইজার্স। যদিও ঘণ্টাখানেক পর সেই রেকর্ডটি ভেঙে যায় স্টার্ক কলকাতায় যোগ দিলে। 

আইপিএলে এবারের আগে সবচেয়ে ব্যয়বহুল খেলোয়াড় ছিলেন ইংল্যান্ডের স্যাম কারান। ২০২২ সালের টি২০ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়টিকে ১৮ কোটি ৫০ লাখ রুপিতে কিনে ইতিহাস গড়ে পাঞ্জাব কিংস। গত আসরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৭ কোটি ৫০ লাখ রুপিতে অস্ট্রেলিয়ার ক্যামেরন গ্রিনকে নেয় মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স আর ১৬ কোটি ২৫ লাখ রুপিতে বেন স্টোকসকে নেয় চেন্নাই। 

এবার নিউজিল্যান্ডের ড্যারিল মিচেলকে ১৪ কোটি রুপিতে চেন্নাই, হার্শাল প্যাটেলকে ১১.৭৫ কোটিতে পাঞ্জাব, আলজারি জোসেফকে ১১.৫০ কোটিতে রাজস্থান, স্পেন্সার জনসনকে ১০ কোটিতে গুজরাট, রভম্যান পাওয়েলকে ৭.৪০ কোটিতে রাজস্থান, শাহরুখ খানকে ৭.৪০ কোটিতে গুজরাট, কুমার কুশাগ্রাকে ৭.২০ কোটিতে দিল্লি ক্যাপিটালস, ট্রাভিস হেডকে ৬.৮০ কোটিতে সানরাইজার্স কিনে নেয়। 

তবে সব ছাপিয়ে আলোচনায় স্টার্কের ভুবন কাঁপানো দর। কলকাতার এমন মরিয়া হয়ে তাকে কেনার কারণই-বা কী? ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এ কারণ খুঁজতে গিয়ে বলেছে, আসলে ছোট নিলামে ফি বছর নতুন নতুন দামের রেকর্ড হয়। পূর্ণাঙ্গ নিলামে যা হয় না। ছোট নিলামে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের হাতে রুপি বেশি থাকে, অথচ নামী খেলোয়াড় কম। এবারো তাই হয়েছে। চার-চারটে ফ্র্যাঞ্চাইজির হাতে তিরিশ কোটি প্লাস রুপি পড়ে ছিল। অথচ স্টার্ক, কামিন্স, কোয়েৎজে, মধুশঙ্কার মতো হাতে গোনা কয়েকজন ভালো পেসার ছিলেন। 

এবার হলুদ জার্সিতে খেলবেন মুস্তাফিজ : আগামী বছর ১৭তম ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) নিলামে থাকা একমাত্র বাংলাদেশী খেলোয়াড় মুস্তাফিজুর রহমানকে ভিত্তিমূল্য ২ কোটি রুপিতে দলভুক্ত করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন চেন্নাই সুপার কিংস। সাকিব আল হাসান ও লিটন কুমার দাস এবার আইপিএল থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন আগেই। নিলামের মূল তালিকায় জায়গা পান মুস্তাফিজ ছাড়াও পেস বোলার তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম। যদিও আইপিএলের সময় বাংলাদেশ জাতীয় দলের খেলা থাকবে বলে তাসকিন ও শরিফুল নিলাম থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন। বাকি থাকেন শুধু মুস্তাফিজ। দল পেলে ২২ মার্চ থেকে ১১ মে পর্যন্ত তাকে খেলার অনুমতি দেবে বলে জানায় বিসিবি। নিলামের শেষ দিকে দল পান এ বামহাতি পেসার। 

আইপিএল অবশ্য মুস্তাফিজের জন্য নতুন কিছু নয়। ২০১৬ সালে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে শিরোপা জিতেছেন এবং নিজের প্রথম মৌসুমেই সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় হন। এরপর রাজস্থান রয়্যালস, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ও দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে খেলেছেন। গত মৌসুমে দিল্লির হয়ে খেলেছেন মাত্র দুই ম্যাচ। প্রথমে সুযোগ পাননি। পরে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলতে চলে যান। এবার মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বাধীন হলুদ শিবিরে যোগ দিলেন তিনি। এখন সতীর্থদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার অপেক্ষা।

২১ ডিসেম্বর মুস্তাফিজকে স্বাগত জানিয়ে চেন্নাই সুপার কিংস তাদের অফিশিয়াল টুইটার (এক্স) অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেছে, ‘ফিয়ারি ফিজ ইন চিপক লোডি’। এর আগে ১৯ ডিসেম্বর নিলামের দিন তাকে কেনার পর বাংলায় পোস্ট করেছে চেন্নাই, ‘চেন্নাইয়ে স্বাগতিক মুস্তাফিজুর!’

বাংলাদেশের সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে রান নেয়ার সময় বোলার মুস্তাফিজের সঙ্গে ধাক্কা লাগে চেন্নাই অধিনায়ক এমএস ধোনির। সেই ভিডিও আপলোড করে চেন্নাই লিখেছে, ‘ফ্রম কলিসন টু কোয়ালিশন! ইট’স অল#ইয়েলাভ!’

মোৎসার্টের সঙ্গে মিল রেখে একই দিন আরেক পোস্টে চ্যাম্পিয়নরা লিখেছে ‘মুজ-আর্ট অব মাদ্রাজ! ওয়েলকাম টু দ্য প্রাইড, রহমান!’