টেস্ট অভিষেকের পর ২৫ বছরে ১৫৬টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে মুশফিকুর রহিমের নামের পাশেই জ্বলজ্বল করছে ১০০ টেস্ট খেলার কীর্তি। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে তার মাইলফলকের এ ম্যাচে আয়ারল্যান্ডকে ২১৭ রানে হারিয়ে ২-০-তে সিরিজ জিতে নিল বাংলাদেশ। গতকাল পঞ্চম ও শেষ দিন আইরিশরা ২৯১ রানে গুটিয়ে গেলে বড় জয় নিশ্চিত হয় স্বাগতিকদের। এটা টেস্টে টাইগারদের ২৫তম জয়। এ ২৫ জয়ের মধ্যে ২৩টির সঙ্গে ছিলেন মুশফিকুর।
সিলেটের পর ঢাকায়ও জয়ের মঞ্চটা চতুর্থ দিনই গড়ে নেয় বাংলাদেশ। যদিও হারের আগে দারুণ লড়েছে আইরিশরা। ৫৪ ওভারে ৬ উইকেটে ১৭৬ রান নিয়ে পঞ্চম দিন ব্যাটিং শুরু করে অতিথি দলটি আরো ৫৯.৩ ওভার টিকে থেকে বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে। কার্টিস ক্যাম্ফার ও গ্যাভিন হোয়ে জুটি সবচেয়ে পীড়া দেয় নাজমুল হোসেন শান্তর দলকে। ১৯১ বল লড়াই করে বোর্ডে ৫৪ রান যোগ করেন তারা দুজন। তার আগে ক্যাম্ফার ও জর্ডান নেইল জুটি ৮৫ বল এবং ক্যাম্ফার ও অ্যান্ডি ম্যাকব্রাইন জুটি ১০৫ বল মোকাবেলা করেন।
পঞ্চম দিন চা-বিরতির অল্প আগে হোয়েকে আউট করে জুটি ভাঙেন বামহাতি স্পিনার হাসান মুরাদ। তার বলে লেগ বিফোর হয়েছেন হোয়ে। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি। পরের বলেই নতুন ব্যাটার ম্যাথিউ হামফ্রেকে বোল্ড করে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন সিলেটে অভিষিক্ত স্পিনার মুরাদ।
মুরাদ ৪৪ রানে ৪টি ও দেশের হয়ে টেস্টে প্রথম বোলার হিসেবে আড়াইশ উইকেট শিকারের কীর্তি গড়া তাইজুল ইসলামের বোলিং ফিগার ৪/১০৪।
এর আগে ৪ উইকেটে ২৯৭ রান তুলে আইরিশদের ৫০৯ রানের টার্গেট ছুড়ে দেয় স্বাগতিক বাংলাদেশ। বিশাল এ রান তাড়া করতে নেমে ১১৩.৩ ওভার টিকে থেকে ২৯১ রান সংগ্রহ করতে সমর্থ হয় সফরকারী দলটি।
অবশ্য টেস্টে বাংলাদেশের জয়ের হার মাত্র ১৬। ২০০০ সালে টেস্ট যাত্রার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১১২টি টেস্টে হেরেছে বাংলাদেশ, ড্র হয়েছে ১৯টি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নয়টি, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পাঁচ, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তিন, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুই, পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই এবং আফগানিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও শ্রীলংকার বিপক্ষে একটি করে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।
শুধু ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে টেস্টে এখনো হারাতে পারেনি টাইগাররা। ভারতের সঙ্গে ১৫ টেস্টে ১৩টি ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ১৬ টেস্টে ১৪টি হেরেছে তারা। বাংলাদেশ দলের ২৫ জয়ের ১৬টি এসেছে ঘরের মাঠে। এ ১৬ জয়ের সাতটি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, দুটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে, তিনটি আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এবং অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে একটি করে।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ দলনায়ক নাজমুল হোসেনকে কথা বলতে হলো শততম টেস্ট খেলা ও সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতা মুশফিককে নিয়ে। ১০০ টেস্ট নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যি বলতে আগে কখনো এ বিষয়টা নিয়ে আলাপই করিনি বা ভাবিওনি যে আমরা ১০০ টেস্ট খেলতে পারি। যে মুহূর্তে মুশফিক ভাই এটা অর্জন করে ফেলছেন, তার পর থেকে কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে সবাই আমরা এ বিষয়টা নিয়ে কথা বলছি যে আমিও খেলতে চাই। কেউ হয়তো ১০ টেস্ট খেলেছে, সে-ও বলছে যে আমিও ১০০ টেস্ট খেলতে চাই। এটা একটা ইতিবাচক দিক।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা উপভোগ করেছি, সবাই পুরো ম্যাচ উপভোগ করেছে, মুশি ভাইও অনেক উপভোগ করেছেন। আমি শুনছিলাম ড্রেসিংরুমে একজন পেস বোলার বলছিল যে আমিও ১০০ টেস্ট খেলতে চাই। আমাদের মতো দেশে একটা পেস বোলারের পক্ষে ১০০ টেস্ট খেলা আসলে মুখ দিয়ে বলাটাও অনেক সাহসের ব্যাপার। অন্তত বলেছে তো! আমার মনে হয় ৩৯-৪০ টেস্ট হয়েছে, মিরাজের মনে হয় ৫০টার বেশি (৫৬টি)। অনেক দূর যাওয়া বাকি। এত লম্বা চিন্তা না করে একটা একটা টেস্ট যদি আমরা খেলতে পারি, পারফর্ম করতে পারি, যদি কপালে থাকে, আশা করি একদিন অর্জন করতে পারব।’
মুশফিক অবশ্য এখানেই থামছেন না। ম্যাচ শেষে তিনি বলছিলেন, ‘আমি আরো খেলতে চাই। ১০০ টেস্ট খেলতে পেরে আমি ভাগ্যবান এবং এর প্রতিটি মুহূর্ত আমি উপভোগ করেছি। সবার সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করতে পেরে আমি খুশি এবং আমি আশাবাদী যে শিগগিরই আমাদের টিমটা দুর্দান্ত হবে।’
তাইজুল ইসলাম ৫৭ টেস্টে আড়াইশ উইকেট শিকার করেছেন, যার সবচেয়ে কম টেস্টে আড়াইশ উইকেট নেয়ার রেকর্ড। শ্রীলংকার রঙ্গনা হেরাথ ৫৭ টেস্টে, ভারতের বিষেণ সিং বেদী ৬০ টেস্টে, রবীন্দ্র জাদেজা ৬২ টেস্টে ও ডেরেক আন্ডারউড ৬৯ টেস্টে আড়াইশ উইকেট নিয়েছেন। মিরপুর টেস্টে প্রথমে সাকিব আল হাসানের রেকর্ড (২৪৬) ছুঁয়েছেন, এরপর তাকে টপকেও গেছেন তাইজুল। এ টেস্টে তিনি নিয়েছেন ৮ উইকেট, আর সিরিজে ১৩ উইকেট নিয়ে হয়েছেন সেরা খেলোয়াড়।
রেকর্ডের ম্যাচে ১৩ উইকেট শিকার করে সিরিজসেরার পুরস্কার পাওয়া তাইজুল বলেন, ‘রেকর্ড গড়তে পেরে ভালো লাগছে। তবে আমি আশা করব ভবিষ্যতে দেশের কেউ এ রেকর্ড ভেঙে দেবে। কারণ রেকর্ড ভাঙলেই আমরা ক্রিকেটে এগিয়ে যাব।’
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ৪৭৬ ও ২৯৭/৪/ (ডিক্লেয়ার্ড)। আয়ারল্যান্ড: ২৬৫ ও ২৯১ (ক্যাম্ফার ৭১*, টেক্টর ৫০, হোয়ে ৩৭, নেইল ৩০; মুরাদ ৪/৪৪, তাইজুল ৪/১০৪)। ফল: বাংলাদেশ ২১৭ রানে জয়ী। প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: মুশফিকুর রহিম। প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ: তাইজুল ইসলাম। সিরিজ: বাংলাদেশ ২-০-তে জয়ী।










