ওল্ড ট্রাফোর্ডের গ্যালারিতে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের দীর্ঘ ছায়া এখনো বিদ্যমান। যে স্টেডিয়াম একসময় প্রতিপক্ষের কাছে ছিল দুর্ভেদ্য দুর্গ, আজ সেখানে কেবল দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তার সুর। কোনো স্থায়ী কোচ নেই, নেই ইউরোপীয় ফুটবলের স্বাদ, আর ঘরোয়া দুই কাপ থেকেও প্রথম ধাক্কায়ই বিদায়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কি তবে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? পরিসংখ্যান বলছে, ১৯১৪-১৫ মৌসুমের পর এই প্রথম কোনো মৌসুমে মাত্র ৪০টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলবে ক্লাবটি। রেড ডেভিলদের আধুনিক ইতিহাসে এমন ব্যর্থতা সত্যিই আর আসেনি।
স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের প্রস্থানের ১৩ বছর হতে চলল। এই দীর্ঘ সময়ে কোচ পাল্টেছে ১০ বারের বেশি, খরচ হয়েছে কোটি কোটি পাউন্ড, কিন্তু স্থিতিশীলতা ফেরেনি। গতকাল ম্যানচেস্টার ডার্বিতে ম্যানচেস্টার সিটির মুখোমুখি হয় ইউনাইটেড। যেখানে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী সিটি গত এক দশকে পেপ গার্দিওলার অধীনে ১৮টি বড় শিরোপা জিতেছে, সেখানে ইউনাইটেড কেবলই পথ খুঁজছে। অন্তর্বর্তী কোচ হিসেবে মাইকেল ক্যারিক দায়িত্ব নিচ্ছেন এক বিধ্বস্ত দলের, যাদের কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই।
ইউনাইটেড সমর্থকদের কাছে ব্যর্থতার সংজ্ঞা ভিন্ন ভিন্ন। কেউ মনে করেন লিভারপুলের কাছে ৭-০ গোলে হার ছিল সবচেয়ে বড় লজ্জার, আবার কেউ গত মৌসুমে লিগে ১৫তম হওয়া ও টটেনহ্যামের কাছে ইউরোপীয় ফাইনালের হারকে পতনের শেষ বিন্দু মনে করেন। দীর্ঘদিনের সিজন-টিকিটধারী রিক রেডম্যানের মতে, ‘গত কয়েক বছরে আমরা এত বেশি রেকর্ড ভেঙেছি, যা মনে রাখা কঠিন। তবে এটিই কি ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময়? এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কারণ ব্যর্থতার তালিকাটা বড্ড দীর্ঘ।’
ফার্গুসনের পর কোনো কোচই তিন বছরের বেশি টিকতে পারেননি। ডেভিড ময়েস থেকে শুরু করে লুই ফন গাল, হোসে মরিনিয়ো কিংবা এরিক টেন হাগ—স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন সবাই, কিন্তু বিদায় নিয়েছেন ব্যর্থতার বোঝা কাঁধে নিয়ে। ওলে গুনার সুলশার সবচেয়ে বেশি ১৬৮টি ম্যাচে দায়িত্ব সামলেছেন, কিন্তু শিরোপা জেতাতে পারেননি। সম্প্রতি রুবেন আমোরিমকে নিয়ে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তা-ও কয়েক মাসেই শেষ হয়ে গেছে। এখন আবার মাইকেল ক্যারিকের কাঁধে দায়িত্ব দিয়ে ‘ইউনাইটেড ডিএনএ’ খোঁজার চেষ্টা চলছে। অতীত ফিরিয়ে আনার এ চেষ্টা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে হয়তো সমর্থকরাও খুব একটা আশাবাদী নন।
স্যার জিম র্যাটক্লিফের বিনিয়োগ ভক্তদের মনে আশার প্রদীপ জ্বেলেছিল। কিন্তু গ্লেজার পরিবার এখনো নেপথ্যে থাকায় সেই মোহভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। সিইও ওমর বেরাদা ও ফুটবল ডিরেক্টর জেসন উইলকক্সের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। সমর্থক জেমস স্টারের মতে, ‘হায়ারার্কির ওপর ভরসা রাখা কঠিন। টেন হাগকে এফএ কাপ জেতার পর রেখে দিয়ে আবার কয়েক মাস পরেই ছাঁটাই করা, ড্যান অ্যাশওয়ার্থকে নিয়ে নাটক—সব মিলিয়ে কোনো প্ল্যান বি তাদের হাতে নেই।’
দলবদলের বাজারে ইউনাইটেডের ইতিহাস এখন হাস্যকর। পল পগবাকে ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনা কিংবা অ্যান্টনি, জাডোন সাঞ্চো ও রোমেলু লুকাকুর পেছনে ৭০ মিলিয়নের বেশি খরচ করেও ফলাফল মেলেনি। অথচ ঘরের মাঠের একাডেমি থেকে উঠে আসা স্কট ম্যাকটমিনে বা অ্যান্থনি এলাঙ্গারা অন্য ক্লাবে গিয়ে আলো ছড়াচ্ছেন। বর্তমান দলটিতে ব্রায়ান এমবেউমো কিংবা ম্যাথিয়াস কুনহাদের মতো প্রতিভা থাকলেও তাতে ক্লাবে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসেনি। সাবেক কোচ রালফ রাংনিক একবার বলেছিলেন, এই ক্লাবের ‘ওপেন হার্ট সার্জারি’ প্রয়োজন। চার বছর পর সমর্থকদের মনে হচ্ছে, বড়জোর একটি ‘পেসমেকার’ বসানো হয়েছে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এখন বিশ্ব ফুটবলের সেই রাজা, যার মুকুট ধুলোয় মিশে গেছে। ওল্ড ট্রাফোর্ড এখন আর থিয়েটার অব ড্রিমস নয়, বরং আরেক ধাপ পতনের শঙ্কায় ম্রিয়মাণ এক দারুণ জনপ্রিয় ক্লাব। সাফল্য নেই, স্থিতিশীলতা নেই; কেবল পতনটাই ধ্রুবক হয়ে আছে। ডার্বিতে জয় পেলে পতনের সে গতি হয়তো কমবে, তবে থামবে না। থামানোর জন্য কী করতে হবে সেটা হয়তো ইউনাইটেড-সংশ্লিষ্ট কেউই জানে না। আর হেরে গেলে সেটাও আর বড় কোনো শিরোনাম হবে না। যা প্রত্যাশিত, তা ঘটলে বিস্ময়ের জন্ম দেয় না—সেটাই তো বাস্তবতার নির্মম চরিত্র।









