মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট স্থায়ী হলো ১৭৮.১ ওভার। এটি বাংলাদেশের মাটিতে সংক্ষিপ্ততম টেস্ট ম্যাচ। ১ হাজার ৬৯ বলের নাটকীয় এ টেস্টে জয় পেয়েছে নিউজিল্যান্ড। গতকাল চতুর্থ দিন ৪ উইকেটের জয় নিশ্চিত করে সফরকারীরা।
এর আগে ২০১৮ সালে মিরপুরে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার ম্যাচ ১২৮৭ বল, ২০২১ সালে মিরপুরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ম্যাচ ১২৯১ বল, ২০১৮ সালে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট ১৩৬৭ বল ও ২০০২ সালে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের টেস্ট ১৩৮২ বল স্থায়ী হয়।
সব মিলিয়ে টেস্ট ইতিহাসের সপ্তম সংক্ষিপ্ততম ম্যাচ এটি। সবচেয়ে ছোট ম্যাচটি হয় ১৮৮৮ সালে লর্ডসে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে। এর চেয়েও সংক্ষিপ্ত ম্যাচের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিউজিল্যান্ডের নাম। ২০০২ সালে হ্যামিল্টনে নিউজিল্যান্ড ও ভারতের টেস্টটি স্থায়ী হয়েছিল ১০৬১ বল।
মিরপুরে প্রথম দিন ফ্লাডলাইটে খেলা হয়। এরপর দ্বিতীয় দিনের পুরোটা ভাসিয়ে নেয় বৃষ্টি। তৃতীয় দিন খেলা হয় মাত্র ৩৩ ওভার। গতকাল চতুর্থ দিন আকাশ পরিষ্কার থাকায় পুরোটা সময় খেলা হওয়ার সুযোগ ছিল। যদিও বাংলাদেশ দ্রুত অলআউট হয়ে যাওয়ায় ম্যাচটি চতুর্থ দিন শেষ পর্যন্ত গড়ায়নি, আর পঞ্চম দিনও পুরোটা বাকি ছিল।
বাংলাদেশের মাঠে সংক্ষিপ্ততম এ টেস্টে বাংলাদেশও দারুণভাবে ম্যাচে ছিল। পেন্ডুলামের সুতোর মতোই দুলছিল ম্যাচের ভাগ্য। বাংলাদেশের স্পিনাররা সংহার মূর্তিতে আবির্ভূত হন। যদিও দুই ইনিংসেই তাদের বাঁচিয়ে দেন গ্লেন ফিলিপস। নিউজিল্যান্ডের স্পিনাররাও কম যাননি। দুই ইনিংস মিলিয়ে বাংলাদেশের পতন হওয়া ২০ উইকেটের। ১৭টিই নেন তাদের স্পিনাররা। দুই ইনিংসে কিউইরা হারায় ১৬ উইকেট, যার মধ্যে বাংলাদেশের তিন স্পিনার নিয়েছেন ১৩ উইকেট।
১৩৭ রানের টার্গেটে ব্যাটিং করা কিউইদের ৬৯ রানে ৬ উইকেট তুলে নিয়ে জয়ের আশা জাগায় বাংলাদেশ। যদিও ফিলিপস ও স্যান্টনারে স্বপ্নভঙ্গ হয় টাইগারদের। এত কাছাকাছি গিয়েও জয় না পাওয়ায় হতাশ নাজমুল হোসেন শান্ত ম্যাচ শেষে বলেছেন, ‘বোলাররা দুর্দান্ত পারফর্ম করেছে। চার বোলারই ভালো বল করেছে। ফিল্ডিংয়েও সবাই চেষ্টা করেছে। প্রথম টেস্টে আমরা সত্যিই ভালো ক্রিকেট খেলেছি। এ ম্যাচে আমাদের দারুণ এক সুযোগ ছিল। যদিও হলো না। এ ম্যাচ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারব বলে আশা করি।’ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন ওয়ানডে সিরিজ সামনে রেখে তিনি বলেন, ‘খেলোয়াড়রা তৈরি। ওয়ানডের খেলোয়াড়রা অনুশীলন করছে, আশা করি তারা ভালো ক্রিকেট খেলবে।’
শান্ত মনে করেন ম্যাচ ব্যবধান গড়ে দিয়েছেন গ্লেন ফিলিপস। তার কথায়, ‘উইকেট যে রকম ছিল, আমাদের স্পিনাররা ভালো করছিল। ফিলিপস খুবই ভালো ব্যাট করেছে। এটা মানতেই হবে। হতাশা না। সুযোগ ছিল ভালো কিছু করার। আমাদের বোলাররা খুব খারাপ করেছে, এমনও না।’
মিরপুরের উইকেটে ব্যর্থ হওয়ার কারণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এ উইকেটে ব্যাটসম্যানরা ভালো করিনি। প্রথম ইনিংসে ২৩০-২৪০ রানের উইকেট ছিল। ওই জায়গায় রান কম করায় মনে হয়েছে উইকেট অনেক খারাপ। নতুন বল চ্যালেঞ্জ ছিল অবশ্যই। এটা প্রত্যেক জায়গায় থাকে। দেশের বাইরেও নতুন বলের চ্যালেঞ্জ থাকে। এখানেও ভিন্ন কিছু ছিল না। আমরা ব্যাটিং করলে এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না। ব্যাটারদের এ চ্যালেঞ্জ উপভোগ করা উচিত। আমরা এমন উইকেটই চেয়েছিলাম।’
প্রথম ইনিংসে ভরাডুবি থেকে দলকে টেনে তুলে শেষ পর্যন্ত লিড এনে দেন গ্লেন ফিলিপস। সেই কথাটি মনে করিয়ে দিয়ে ফিলিপস বলেছেন, ‘৮ রানের লিড অনেক বড় ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে পেরে আমরা গর্বিত এবং আমরা কাজটি সফলভাবে শেষ করতে পেরেছি। আমাদের স্পিনাররা অবিশ্বাস্য বোলিং করেছে, টিমিও (টিম সাউদি)। বাংলাদেশও দারুণভাবে ফিরে আসে এবং আমাদের পরীক্ষার মুখে ফেলে। ১৩৭ রান তাড়া করে জয় পাওয়া দারুণ আনন্দের।’
দুই ম্যাচে ১৫ উইকেট শিকার করার পাশাপাশি ব্যাট হাতে ২৮ রান করে সিরিজসেরা খেলোয়াড় হয়েছেন তাইজুল ইসলাম। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘সিরিজ জিততে পারলে খুব ভালো হতো। আমি মনে করি, আমরা তো নিজেদের শতভাগ দিয়ে খেলেছি। দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা আরেকটু ভালো বোলিং করতে পারলে ফল আমাদের পক্ষেই যেত। আমার নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে আমি খুশি। কিন্তু আমরা যদি জিততাম, তবেই আমার বেশি ভালো লাগত।’
টানা দুই হারের শঙ্কা উঁকি দিচ্ছিল। যদিও ফিলিপসের ব্যাটে মান বাঁচল কিউইদের। ঢাকায় জয় শেষে সফরকারী দলের অধিনায়ক টিম সাউদি বলেন, ‘খানিকটা এলোমেলো, বিপর্যস্ত অবস্থা। যদিও শেষ পর্যন্ত আমরা সঠিক জয়ী দলে। ছেলেরা নিজেদের ওপর বিশ্বাস রেখেছে। ফিলিপস ও স্যান্টনার কঠিন সময়ে অ্যাটাকিং ব্যাটিং করে দলকে জিতিয়েছে। প্রথম ইনিংসে এমনটি করেছে বাংলাদেশ। ফিলিপসের প্রথম ইনিংস আমাদের ম্যাচে রেখেছে।’ দ্বিতীয় ইনিংসে এজাজ প্যাটেল ও মিচেল স্যান্টনার মিলে নিয়েছেন ৯ উইেকট। জয়ে স্পিনারদের অবদান নিয়ে সাউদি বলেন, ‘এজাজ অসাধারণ ছিল। এমন পিচে জয় পাওয়া দারুণ ব্যাপার। এখন দেশে ফেরার যাত্রাটাও সহজ হবে।’










