বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ঘরের মাঠে কখনই হারেনি ব্রাজিল। এবার সেই দর্প চূর্ণ হলো আর্জেন্টিনার কাছে হেরে। গত বুধবার ভোরে মারাকানায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। এ জয়ে আর্জেন্টিনা টেবিলের শীর্ষস্থান সংহত করেছে, আর ব্রাজিল পড়েছে শঙ্কায়। টানা তিন হারে ১০ দলের এ বাছাইপর্বে টেবিলের ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে সেলেসাওরা। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে লাতিন মহাদেশ থেকে সরাসরি ছয়টি দেশ খেলার সুযোগ পাবে।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার এ ম্যাচটি কলঙ্কিত হয়ে থাকল সমর্থকদের ওপর পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে। ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এর পরপরই হাতাহাতি শুরু হয় দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে। একটি পর্যায়ে পুলিশ বেদম লাঠিচার্জ করেন আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ওপর। পরিস্থিতি শান্ত করতে এগিয়ে যায় গোটা আর্জেন্টিনা দল, তাদের সঙ্গে যোগ দেন ব্রাজিলের অধিনায়ক মার্কিনোসও।

আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসি এ ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এটা খুবই খারাপ কিছু হলো। আমরা দেখলাম, তারা (পুলিশ) কীভাবে মানুষগুলোকে মারছে। লিবার্তাদোরেস ফাইনালের পর আরেকবার সমর্থকদের নাইট স্টিক দিয়ে মারল। এদিন কোনো ট্র্যাজেডিও হতে পারত। আমরা সেখানে যে মানুষগুলো ছিল তাদের কথা, তাদের পরিবারের কথা ভাবছিলাম। ঘটনা নিয়ে আমরা যারপরনাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি, এমনকি ম্যাচ খেলার চেয়েও সেটি বেশি গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে।’

পিএসজিতে খেলা মার্কিনোস বলেন, ‘আমরা পরিবার, নারী ও শিশুদের কথা ভাবছিলাম, যারা এ ভয়ানক ঘটনা দেখছিল। এটি ছিল খুবই ভয়াবহ পরিস্থিতি।’

পরিস্থিতি শান্ত হলে প্রায় ৩০ মিনিট বিলম্বে শুরু হয় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার এ সুপার ক্ল্যাসিকো। এরপর মাঠের লড়াইয়েও চরম হট্টগোল ঘটে। ম্যাচে মোট ৪২টি ফাউল করেন দুই দলের খেলোয়াড়রা। এর মধ্যে ব্রাজিল ২৬টি ও আর্জেন্টিনা ১৬টি ফাউল করে। তিনটি ছিল হলুদ কার্ড (তিনটিই ব্রাজিল)। লাল কার্ড দেখেন নিউক্যাসলে খেলা ব্রাজিলের জোয়েলিনটন।

ব্রাজিল বাছাইপর্বে ঘরের মাঠে অপরাজিত থাকার আশা নিয়ে নামলেও উজ্জীবিত বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা তা হতে দিল না। ৬৩ মিনিটে নিকোলাস ওতামেন্দির এক বুলেট হেড উত্তেজনাপূর্ণ এ ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দেয়। কর্নারের বলে শূন্যে লাফিয়ে তিনি গোলটি করেন। তাতে ১-০ গোলের জয় পায় আর্জেন্টিনা।

আর্জেন্টিনাকে জেতানোর পর ওতামেন্দি বলেন, ‘এই স্টেডিয়ামে অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকল আমার। আমি উচ্ছ্বসিত। খুবই সুন্দর অনুভূতি। আমি ফিদেওকে (অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া, ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালের নায়ক) বলেছি যে মারাকানায় গুরুত্বপূর্ণ গোল শুধু সে-ই করেনি, আমিও করেছি।’

২০২১ সালে মারাকানায় কোপা আমেরিকা ফাইনালে ব্রাজিলকে হারায় আর্জেন্টিনা। এবার সেই একই মাঠে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলকে আরেক হুল ফোটালো আর্জেন্টাইনরা। এবার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে সেলেসাওদের মাঠে জয়ের কৃতিত্ব দেখালেন মেসিরা।

এবারের ষষ্ঠ রাউন্ডের আগ পর্যন্ত ঘরের মাঠে বাছাইপর্বে ম্যাচে ৫১টি ম্যাচ জিতেছে ব্রাজিল, ড্র করে ১৩টি। এবার হারের তেতো স্বাদও পেল পাঁচবারের বিশ্বজয়ীরা। সেসঙ্গে প্রথমবারের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে টানা চার ম্যাচে গোলহীন থাকল সেলেসাওরা।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচ শুরুর আগে সমর্থকদের মধ্যে যে হাঙ্গামা শুরু হয়, তার সূচনা দিন পনের আগে। একই মাঠে কোপা লিবার্তাদোরেস ফাইনালে (দক্ষিণ আমেরিকার মহাদেশীয় ক্লাব ফাইনাল) সংঘর্ষে জড়ান স্বাগতিক ফ্লুমিনেন্স ও বোকা জুনিয়র্সের সমর্থকরা। তারই রেশ থেকে এবার ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচেও দুই দলের সমর্থকরা সংঘর্ষে লিপ্ত হলেন। সংঘর্ষে কলঙ্কিত ব্রাজিলের ‘ফুটবল মন্দির’ মারাকানা।

সংঘর্ষের পর মাঠের লড়াইয়ে জিতেছে আর্জেন্টিনা। এখন পর্যন্ত ১১১টি অফিশিয়াল ম্যাচের দ্বৈরথে ব্রাজিল ৪৩টি ও আর্জেন্টিনা ৪২টি জিতেছে, ড্র হয় ২৬টি ম্যাচ। বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা হয়েছে মোট চারবার, যার মধ্যে ব্রাজিল দুটিতে ও আর্জেন্টিনা একটিতে জিতেছে। ১৯৭০ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১৩ ম্যাচে অপরাজিত ছিল ব্রাজিল। ওই সময় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে টানা পাঁচ ম্যাচ জিতেছে সেলেসাওরা। এটিও দ্বৈরথের অন্যতম একটি রেকর্ড।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথে সর্বোচ্চ গোল করার কৃতিত্ব দেখান প্রয়াত কিংবদন্তি পেলে। তিনি ১০ ম্যাচে আট গোল করেন। এ দ্বৈরথে মোট আটটি হ্যাটট্রিক হয়েছে। পেলে, রোনালদো, লিওনেল মেসি ছাড়াও হ্যাটট্রিক করেছেন রিভালদো, হোসে সানফিলিপো, নরবার্তো মেন্দেস, কার্লোস পিউসেল্লে ও ম্যানুয়েল সিওয়ান।

বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ে আর্জেন্টিনার চেয়ে এগিয়ে ব্রাজিল। সেলেসাওরা পাঁচবার (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২) ও আলবিসেলেস্তেরা তিনবার (১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২) পেয়েছে বিশ্ব শিরোপা। সর্বশেষ ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত আসরে ফ্রান্সকে ফাইনালে হারিয়ে তৃতীয় মুকুট পায় লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলের চেয়ে অনেক এগিয়ে আর্জেন্টিনা। তাদের ১৫ শিরোপার তুলনায় ব্রাজিল জিতেছে নয়টি।