সৌদি আরবের আল নাসের ক্লাবে খেলে বছরে ২০ কোটি ডলার (প্রায় ২ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা) পান ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বিশাল অর্থবিত্তের মালিক রোনালদো স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ফিলিস্তিন জাতীয় দলের সাবেক ফরওয়ার্ড সুলেইমান আল-ওবেইদও রোনালদোর মতো পাঁচ সন্তানের জনক। দুজনের বয়সও কাছাকাছি—৪০ ও ৪১। যদিও সুলেইমান বড়ই ভাগ্যবিড়ম্বিত। রোনালদোর মতো স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অভিজাত ইয়টে চড়ে ছুটি কাটানো হয়নি তার। তিনি বরং অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা সন্তানদের জন্য খাদ্যের সংস্থান করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পড়লেন। এ ফুটবল তারকার আর স্ত্রী-সন্তানদের কাছে ফেরা হবে না। ত্রাণ আনতে গিয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর গুলিতে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি।
ঘটনাটি গত বুধবারের। গাজার দক্ষিণাঞ্চলে মানবিক সাহায্য পেতে অপেক্ষমাণ ফিলিস্তিনি জনতার ওপর ইসরায়েলি বাহিনী গুলিবর্ষণ করলে প্রাণ হারান ৪১ বছর বয়সী সুলেইমান। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএএফ) তাদের ওয়েবসাইটে সুলেইমানের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।
পিএএফের ওয়েবসাইটে বলা হয়, গাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলে মানবিক সাহায্যের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় শহীদ হয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় ও বিচ সার্ভিসেস দলের তারকা সুলেইমান আল-ওবেইদ। ফিলিস্তিন ফুটবলে সুলেইমান ‘দ্য গ্যাজেল (হরিণ)’, ‘দ্য ব্ল্যাক পার্ল (কালো মুক্তা)’, ‘হেনরি অব প্যালেস্টাইন’ এবং ‘পেলে অব প্যালেস্টাইন ফুটবল’ নামে পরিচিত ছিলেন।
সুলেইমান ২০০৭ সালে খাদামাত আল-শাতিয়া ক্লাবের হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন। এরপর ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েলি অধিকৃত পশ্চিম তীরের ক্লাব শাবাব আল-আমারিতে খেলেন ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। এছাড়া ২০১৩-১৪ মৌসুমে আল-শাতিয়ায়, ২০১৪-১৬ গাজা স্পোর্টে ও ২০১৬-২৩ আল-শাতিয়ায় খেলেন।
দুর্দান্ত গতি ও দক্ষতা দেখিয়ে ২০০৭ সালে ফিলিস্তিন জাতীয় দলে জায়গা করে নেন সুলেইমান। ২০১৩ সালে জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলেন। জাতীয় দলের জার্সিতে ২৪ ম্যাচে করেন ২ গোল। পিএএফের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সুলেইমান একশরও বেশি গোল করেছেন। নিজেকে তিনি ফিলিস্তিন দলের উজ্জ্বলতম এক তারকা হিসেবে তুলে ধরেছেন।’
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি ফরাসি খেলোয়াড় এরিক কাতোয়াঁ বলেছেন, ‘সাহায্য পাওয়ার আশায় রাফায় অবস্থান করার সময় ফিলিস্তিন জাতীয় দলের তারকা সুলেইমান আল-ওবেইদকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। আমরা তাদের আর কত গণহত্যা করতে দেব? ফিলিস্তিন মুক্ত হোক।’
২০১০ সালে ফিলিস্তিনের হয়ে প্রীতি ম্যাচ খেলতে মৌরিতানিয়ার উদ্দেশে রওনা দিলেও সুলেইমানসহ ছয় খেলোয়াড়কে ‘নিরাপত্তাজনিত কারণ’ দেখিয়ে জর্ডানের সীমান্ত থেকে ফেরত পাঠায় ইসরায়েলি বাহিনী। এ ফুটবলার তখন এএফপিকে বলছিলেন, ‘যখন শুনলাম আমাদের ভ্রমণ করতে দেয়া হবে না, তখন ভীষণ কষ্ট পাই। কারণ যেকোনো অ্যাথলেটের স্বপ্ন থাকে জাতীয় পর্যায়ে দেশের জার্সি গায়ে দেয়ার। বিশ্বের অন্য সব অ্যাথলেটের মতো আমরাও আমাদের পরিবারকে নিয়ে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে চাই।’
এবার সুলেইমান চিরমুক্তি লাভ করেছেন। ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে তিনি অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন। তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান।
হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬১ হাজার ২৫৮ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সুলেইমানসহ খেলাধুলা ও স্কাউটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ৬৬২ জন মারা গেলেন। এর মধ্যে ৩২১ জন ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যারা ছিলেন খেলোয়াড়, কোচ, প্রশাসক, সংগঠক, রেফারি কিংবা ক্লাবের বোর্ড সদস্য।










