শত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বাংলাদেশের অদম্য মেয়েরা দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের পতাকা উড়িয়েছেন এশিয়ার মঞ্চে। বাংলাদেশ জাতীয় দল ও অনূর্ধ্ব-২০ দলের মেয়েরা ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। এছাড়া সাফ শিরোপাও জিতেছে অনূর্ধ্ব-২০ দল। নারী ফুটবলে ২০২৫ সালটি উদযাপনের, গৌরবের একটি বছর। যদিও শেষটা রাঙানো গেল না। ভুটানে চলমান সাফ অনূর্ধ্ব-১৭ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে এক ম্যাচ হাতে রেখেই শিরোপা জিতে নিয়েছে ভারত। এ শিরোপা জিতলে সাফল্যের ষোলোকলা পূর্ণ হতো অপরাজিতাদের।
ভুটানে সাফ অনূর্ধ্ব-১৭ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে লড়ছে চারটি দল। স্বাগতিক ভুটান, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল অংশ নেয় এবারের সাফে। রাউন্ড রবিন লিগ ফরম্যাটে চারটি দল একে অন্যের বিপক্ষে দুবার করে খেলবে। সবচেয়ে বেশি পয়েন্টজয়ী দলটিই শিরোপা জিতে নেবে। ভারতীয় মেয়েরা পঞ্চম রাউন্ডেই শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলেছে। সুরভী আকন্দ প্রীতিরা ২২ আগস্ট ২-০ গোলে হেরে যান ভারতের কাছে। শুক্রবার তারা ১-১ গোলে ড্র করে বসেন স্বাগতিক ভুটানের সঙ্গে। এ দুটি ম্যাচই ফল নির্ধারণ করে দেয়। শুক্রবার নেপালকে ৫-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলে ভারতীয় কিশোরীরা।
৫ রাউন্ড শেষে ভারতের মেয়েদের পয়েন্ট পূর্ণ ১৫, সমান ম্যাচ থেকে বাংলাদেশ পেয়েছে ১০ পয়েন্ট। অর্থাৎ আজ শেষ রাউন্ডে ভারতকে হারালেও কোনো লাভ হবে না বাংলাদেশের মেয়েদের। আর কোনোভাবেই ভারতকে তারা ধরতে পারবে না। আজ বিকালে থিম্পুর চাংলিমিথান স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচটি তাই রূপ নিয়েছে শুধুই আনুষ্ঠানিকতায়।
এটা কিশোরীদের (সাফ অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৭) সপ্তম সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। সাত আসরের মধ্যে সর্বোচ্চ তিনবার শিরোপা জিতে নিল ভারত। এছাড়া বাংলাদেশ দুবার, নেপাল একবার শিরোপা জিতেছে। বাকি একবার শিরোপা জিতেছে রাশিয়া। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৭ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জিতে নেয় অতিথি দল রাশিয়ার মেয়েরা।
কিশোরীরা শিরোপা উদযাপন করতে পারলে বছরটি হতো বাংলাদেশের মেয়েদের। গত ২ জুলাই মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে বাছাইপর্বের ম্যাচে স্বাগতিক মিয়ানমারকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নারীদের এশিয়া কাপ ফুটবলে মূল পর্বে খেলার টিকিট পায় বাংলাদেশ জাতীয় দলের মেয়েরা। ১৯৮০ সালে কুয়েতের মাটিতে বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল দল প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপ খেলেছে। এরপর আর কখনো বাংলাদেশের কোনো জাতীয় দল এশিয়া কাপে খেলার টিকিট পায়নি। বর্তমানে ছেলেরা এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব খেলছে। ছেলেরা যখন ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়ান কাপে খেলার স্বপ্ন দেখতেও ভয় পাচ্ছেন তখনই ইতিহাস গড়লেন ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, আফঈদা খন্দকার, তহুরা খাতুনরা।
২০২৪ সালে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সাফ শিরোপা জিতে নেয় বাংলাদেশের মেয়েরা। তখনই সাবিনা, ঋতুপর্ণারা দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ায় নিজেদের নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এ স্বপ্নপূরণে বেশিদিন লাগেনি। গত জুলাইয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে আসে সুখবর। বাছাইপর্বের সাফল্যের পর লাল-সবুজ পতাকা নিয়েই আগামী বছর মার্চে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ১২ জাতির এশিয়া কাপে লড়তে যাচ্ছেন ঋতুপর্ণা ও তার সহযোদ্ধারা।
এশিয়া কাপে মেয়েদের সামনে অবশ্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। মূল পর্বে চীন, উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলতে হবে তাদের। বাংলাদেশের আরেক গ্রুপ প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তান। তিনটি দলই ফিফা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ‘এ’ গ্রুপে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান ও ফিলিপাইন; ‘বি’ গ্রুপে চীন, উত্তর কোরিয়া, উজবেকিস্তান ও বাংলাদেশ এবং ‘সি’ গ্রুপে জাপান, ভিয়েতনাম, ভারত ও চাইনিজ তাইপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। ১২ দলের মধ্যে সর্বনিম্ন র্যাংকিং বাংলাদেশের! এর পরও বাংলাদেশকে আশা দেখায়, প্রেরণা জোগায় বাছাইপর্বের সাফল্য।
বড়দের মতো বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ নারীরাও ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। লাওসে ‘এইচ’ গ্রুপে রানার্সআপ হয়েও শেষ পর্যন্ত মূল পর্বের টিকিট পেয়েছে আফঈদা, স্বপ্ন রানীদের দল। দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে বড় ব্যবধানে হারলেও লাওস ও পূর্ব তিমুরকে হারিয়ে মূল পর্বের টিকিট পেয়েছে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। আগামী বছর এপ্রিলে থাইল্যান্ডের মাটিতে বসবে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়া কাপ আসর। এ আসরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে স্বাগতিক থাইল্যান্ড, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, চীন, জাপান, উজবেকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, জর্ডান, বাংলাদেশ ও চাইনিজ তাইপে।
এশিয়া কাপ বাছাইপর্ব খেলতে যাওয়ার আগে জুলাইয়ে দেশের মাটিতে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতে নেয় বাংলাদেশের মেয়েরা। এ নিয়ে অনূর্ধ্ব-১৮, অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২০ পর্যায়ের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে পঞ্চমবারের মতো শিরোপা উৎসব করে লাল-সবুজ জার্সিধারী মেয়েরা। যদিও তাদের দেখানো পথে ভুটানের মাঠে শিরোপা উদযাপন করতে পারছে না কিশোরীরা। রানার্সআপ ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরছেন প্রীতি, অর্পিতা বিশ্বাসরা।










