গত বুধবার বাংলাদেশে ভোরের আলো ফোটার আগেই দারুণ এক কীর্তি গড়েন সৌম্য সরকার। বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং নিউজিল্যান্ডের মাঠে উপমহাদেশের কোনো ব্যাটার হিসেবে সর্বোচ্চ ওয়ানডে ইনিংস খেলার গৌরবের অধিকারী হন এ বামহাতি ব্যাটার। ১৫১ বলে খেলেন ১৬৯ রানের রাজসিক ইনিংস। যদিও তার এ সেঞ্চুরি বিফল করে দিয়ে ম্যাচটি জিতে নেয় নিউজিল্যান্ড। ২৯২ রানের টার্গেটটা তিন উইকেট হারিয়ে ছুঁয়ে ফেলে কিউইরা। গতকাল তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৯ উইকেটে হারায় বাংলাদেশ। এটা নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কিউইদের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে জয়। এ ম্যাচে বল হাতে ৩ উইকেট নেন সৌম্য।
বাংলাদেশের হয়ে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ওয়ানডে স্কোর। সর্বোচ্চ ১৭৬ রান করার কীর্তিটা লিটন দাসের গড়া। ২০২০ সালে সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৪৩ বলে ১৬টি চার ও ৮টি ছক্কায় এ রান করেছিলেন ডানহাতি ব্যাটার। এরপরই সৌম্য সরকারের ১৬৯ রান। এছাড়া তামিম ইকবালের ১৫৮, ১৫৪, ১৩২, ১৩০ ও ১২৯ রানের স্কোর রয়েছে। মুশফিকুর রহিমের ১৪৪, ইমরুল কায়েসের ১৪৪, লিটন দাসের ১৩৬, সাকিব আল হাসানের ১৩৪ রানের ইনিংস রয়েছে।
আবার বুধবারের কাব্যিক এ ইনিংস খেলে ভারতীয় কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারকে টপকে গেলেন সৌম্য সরকার। নিউজিল্যান্ডের মাঠে উপমহাদেশের কোনো ব্যাটার হিসেবে সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটা এতদিন ধরে ছিল টেন্ডুলকারের দখলে। ২০০৯ সালে ক্রাইস্টচার্চে ১৬৩ রানের হার না মানা ইনিংস খেলেছিলেন ভারতীয় সুপারস্টার। বুধবার তাকে টপকে যান সৌম্য।
যদিও বিদেশী হিসেবে এটাই নিউজিল্যান্ডের মাঠে সর্বোচ্চ স্কোর নয়। ২০০৭ সালে হ্যামিল্টনে ১৮১ রানের ইনিংস খেলেন অস্ট্রেলিয়ার ম্যাথু হেইডেন। সেটাই নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কোনো বিদেশীর সর্বোচ্চ ওয়ানডে ইনিংস। এছাড়া ২০১৪ সালে নিউজিল্যান্ডের মাঠে কানাডার বিপক্ষে ১৭৫ রানের ইনিংস খেলেছেন স্কটল্যান্ডের ক্যালাম ম্যাকলাউড।
আর সব মিলিয়ে সৌম্য খেলেছেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সপ্তম সর্বোচ্চ ওয়ানডে ইনিংস। ভারতের শুভমান গিল ২০০৩ সালে ২০৮ রান, শচীন টেন্ডুলকার ১৯৯৯ সালে ১৮৬ রান, ইংল্যান্ডের বেন স্টোকস ২০২৩ সালে ১৮২ রান, হেইডেন ২০০৭ সালে ১৮১ রান, পাকিস্তানের ফখর জামান ২০২৩ সালে ১৮০ ও দক্ষিণ আফ্রিকার ডেভ কালাহান ১৯৯৪ সালে ১৬৯ রানের ইনিংস খেলেছেন কিউইদের বিপক্ষে।
বাংলাদেশের ২৯১ রানের মধ্যে ১৬৯ রানই সৌম্যর। অর্থাৎ তার ব্যাট থেকে এসেছে ৫৮.০৭ শতাংশ রান। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ইনিংসে শতকরা হিসেবে সর্বোচ্চ অবদানের রেকর্ড গড়লেন তিনি। ২০১৮ সালের এশিয়া কাপে শ্রীলংকার বিপক্ষে ১৪৪ রানের ইনিংস খেলেছিলেন মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশ তুলেছিল ২৬১ রান। মুশফিক করেছিলেন ৫৫.১৭ শতাংশ রান।
এদিন ২২টি চার ও দুটি ছক্কায় ইনিংস সাজান সৌম্য। ওয়ানডেতে এক ম্যাচে তার চেয়ে বেশি চার আগে কেউ মারেনি। ২০২০ সালে সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৭৬ রানের ইনিংস খেলার পথে লিটন মেরেছিলেন রেকর্ড ২০টি চার। তার সেই রেকর্ড ভেঙেছেন সৌম্য। আবার চার-ছক্কা মিলে সর্বোচ্চ ২৪টি বাউন্ডারির রেকর্ডও ছুঁয়েছেন সৌম্য। ২০২০ সালে লিটনও মেরেছিলেন ২৪টি বাউন্ডারি।
সৌম্যর ১৬৯ রানের মধ্যে বাউন্ডারি থেকে পেয়েছেন ১০০ রান। এটি ওয়ানডেতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০২০ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে লিটন দাস বাউন্ডারি থেকে করেছিলেন ১১২ রান।
এটি ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ৬৮তম ও সৌম্যর তৃতীয় সেঞ্চুরি। এর আগে ২০১৫ সালে মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১২৭ ও ২০১৮ সালে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১১৭ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। নেলসনে রাজসিক ব্যাটিংয়ে তুলে নিলেন নিজের তৃতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরিটা। এ সেঞ্চুরি এসেছে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর। সব মিলিয়ে শনিবারের আগ পর্যন্ত ৬৫ ম্যাচে ৩৩.৩৯ গড়ে তিনি ১ হাজার ৯৩৭ রান করেন। তিন সেঞ্চুরির পাশাপাশি ফিফটি করেছেন ১১টি।
চলতি বছর তৃতীয় ম্যাচে এসে রান পেলেন তিনি। প্রথম দুই ম্যাচেই শূন্য! বিশ্বকাপের আগে মিরপুরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ‘ডাক’। ১৭ ডিসেম্বর ডানেডিনেও ‘ডাক’। প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়া এ বামহাতি ব্যাটার অবশেষে ব্যাটে রান পেলেন। এক ম্যাচেই করলেন ১৬৯ রান।
সৌম্যর এ বীরোচিত ইনিংসের আগে বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডে সেঞ্চুরি আছে ৬৭টি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪টি সেঞ্চুরি করেছেন তামিম ইকবাল। এছাড়া সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম ৯টি করে, লিটন দাস ৫টি, শাহরিয়ার নাফিস, ইমরুল কায়েস ও মাহমুদউল্লাহ ৪টি করে, এনামুল হক, সৌম্য সরকার ও মোহাম্মদ আশরাফুলের ৩টি করে, নাজমুল হোসেন শান্ত, মেহেদী হাসান মিরাজ ২টি করে এবং মেহরাব হোসেন অপি, রাজিন সালেহ, নাসির হোসেন, জুনায়েদ সিদ্দিক, সাব্বির রহমান ও অলোক কাপালী করেছেন ১টি করে সেঞ্চুরি।
ওয়ানডে ছাড়া ১৬টি টেস্ট ও ৭২টি টি২০ ম্যাচ খেলেছেন সৌম্য। টেস্টে সেঞ্চুরি একটি, ফিফটি করেছেন চারটি। আর টি২০-তে পাঁচটি ফিফটি তার। ২০১৯ সালে হ্যামিল্টন টেস্টে ১৭১ বলে ১৪৯ রানের ঝলমলে ইনিংস খেলেছিলেন তিনি।










