গত ১৬ জুন শুরু হয়ে আগামীকাল শেষ হচ্ছে ইউরোপের ফুটবলের গ্রীষ্মকালীন দলবদল। প্রতিবারের মতো এবারো দলবদলে শক্তি প্রদর্শন করছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো। আগস্টের শেষ সপ্তাহ শুরুর সময় প্রায় ২৬০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি ব্যয় করেছে প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৯ কোটি ১৯ লাখ পাউন্ড (৩৩ কোটি ৬৬ লাখ ইউরো) খরচ করে দল গুছিয়েছে বর্তমান লিগ চ্যাম্পিয়ন লিভারপুল। এছাড়া আর্সেনাল ২৫ কোটি ৪৯ লাখ, চেলসি ২৪ কোটি ৬১ লাখ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ২০ কোটি ৮০ লাখ, নটিংহ্যাম ফরেস্ট ১৫ কোটি ১২ লাখ পাউন্ড খরচ করেছে। স্পেনের অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ ১৫ কোটি ১০ লাখ ও রিয়াল মাদ্রিদ ১৪ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ড খরচ করেছে এবারের দলবদলে।
দলবদলে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগেই ছিল বেশি ব্যস্ততা। ম্যাথিউস কুনহা, ব্রায়ান এমবুমো, ফ্লোরিয়ার ভির্টজ ও ভিক্টর ইয়োকেরেসের মতো ব্যয়বহুল খেলোয়াড়ের দলবদল হয়েছে ইংল্যান্ডে। শুক্রবার রাতে আরবি লিপজিগ থেকে ৬ কোটি ইউরোয় ডাচ ফরওয়ার্ড জাভি সিমন্সকে দলভুক্ত করেছে টটেনহ্যাম। এবারের জমজমাট গ্রীষ্মকালীন দলবদল আগামীকাল শেষ হচ্ছে। শেষ দুদিন শেষ মুহূর্তে বেশ কয়েকটি দলবদল সম্পন্ন হতে পারে।
এদিকে বুন্দেসলিগার ক্লাব স্টুটগার্ট থেকে রেকর্ড ৬৯ মিলিয়ন পাউন্ডে জার্মান স্ট্রাইকার নিক ভোল্টমেডকে কিনেছে নিউক্যাসল। ২৩ বছর বয়সী খেলোয়াড়টির সঙ্গে ম্যাগপাইদের ছয় বছরের চুক্তি হয়েছে।
তিন বছর আগে আলেক্সান্ডার ইসাককে ৬৩ মিলিয়ন পাউন্ডে কিনে রেকর্ড গড়েছিল নিউক্যাসল। এবার সে রেকর্ড ভাঙল ভোল্টমেডকে কেনার মধ্য দিয়ে। ২৭ নম্বর জার্সি পরবেন ভোল্টমেড। তিনি সঠিক সময়ে নিবন্ধন করতে পারেননি বলে গতকাল লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচটি খেলতে পারেননি। এ ম্যাচে না খেললেও নিউক্যাসলে স্বস্তি আনতে চলেছেন তিনি। বিশেষ করে ইসাককে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর একজন ভালো মানের স্ট্রাইকার খুঁজছিল ম্যাগপাইরা। ইসাকের লিভারপুলে যোগ দেয়ার গুঞ্জন রয়েছে। সুইডিশ খেলোয়াড়টি লিভারপুলে যোগ দিতে মরিয়া। যদিও এখানে বাধা নিউক্যাসলের চাওয়া বিশাল ফি। তার জন্য ১৫ কোটি পাউন্ড চায় ম্যাগপাইরা।
দলবদলের শেষ দিনেও ব্যস্ততা থাকবে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে। যদিও এখানে যুক্ত থাকবে স্প্যানিশ লা লিগা। সচরাচর দেখা যায়, অন্য ক্লাব থেকে খেলোয়াড় ছিনিয়ে আনে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা। মূলত স্প্যানিশ এ দুই ক্লাবের প্রতি মুগ্ধতা থেকেই তাদের জার্সি পরতে চান অনেক তরুণ খেলোয়াড়। উদাহরণ হিসেবে কিলিয়ান এমবাপ্পের কথাই বলা যায়। তিনি প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক হয়েছেন। অথচ তার মনটা পড়ে ছিল মাদ্রিদে। অনেক নাটকীয়তার পর ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে তিনি রিয়াল মাদ্রিদে নাম লেখান।
দলবদলের শুরু থেকে আলোচনায় রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান ফরওয়ার্ড রদ্রিগো। রিয়ালের একাধিক চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জয়ের নায়ক তিনি। স্যান্টিয়াগো বার্নাব্যুতে কি সময় ফুরিয়ে এল তার? জানা গেছে ভালো প্রস্তাব পেলে তাকে ছেড়ে দেবে লস ব্লাঙ্কোসরা। শেষ মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম এ ফরওয়ার্ডকে দলে টানতে আগ্রহী ম্যানচেস্টার সিটি। আর্সেনালও আগ্রহ দেখাচ্ছে।
বার্সেলোনা ছেড়ে যেতে পারেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার ফারমিন লোপেজ। তাকে দলে ভেড়াতে চায় লন্ডন জায়ান্ট চেলসি। এর বাইরে মার্ক কাসাদোকে বিক্রি করে তহবিল বাড়াতে চায় বার্সেলোনা। যদিও কাতালানদের কোচ হ্যান্সি ফ্লিক বলেছেন, তিনি উভয় খেলোয়াড়কেই রেখে দিতে চান। এর কারণও রয়েছে। নিয়মিত একাদশের সদস্য সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ইনিগো মার্টিনেজকে সৌদি আরবে যেতে দিয়েছে কাতালানরা। এখন ফারমিনও গেলে বড় এক শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
এক সপ্তাহ আগে ২২ বছর বয়সী তারকার ব্যাপারে বার্সার অবস্থান ছিল—কিনতে হলে গুনতে হবে ৭ কোটি ইউরো। কাতালান জায়ান্টরা দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছে, ফারমিন লোপেজ নিজে থেকে চাইলে আর ইংলিশ ক্লাবটি ৭ কোটি ইউরো ফি দিতে রাজি থাকলেই কেবল এ দলবদল সম্পন্ন হতে পারে। ব্লুজরা তার জন্য দিতে চায় ৫ কোটি ইউরো। সর্বশেষ জানা যায়, লোপেজ বার্সায়ই থেকে যেতে চান। এ অবস্থায় বার্সাও ট্রান্সফার ফি বাড়িয়ে দিয়েছে। কাতালান জায়ান্টরা বলেছেন, লোপেজকে নিতে হলে ৯ কোটি ইউরো গুনতে হবে চেলসিকে। ফারমিনকে বিক্রি করতে বার্সার কোনো তাড়া নেই। যদিও তাড়া আছে চেলসির। দলবদলে ইউরোপের অন্যতম আগ্রাসী ক্লাব এখন ব্লুজরা। এরই মধ্যে ১৮ জন খেলোয়াড়কে কিনতে তারা প্রায় ২৮ কোটি ইউরো খরচ করেছে।
এদিকে চলতি দলবদলে এরই মধ্যে ২৯ কোটি ৩৫ লাখ ইউরো খরচ করেছে আর্সেনাল। কাজেই বড় অংক খরচ করে রদ্রিগোকে কেনার পরিস্থিতি নেই গানারদের। এ কারণে তারা খেলোয়াড়টিকে ধার চুক্তিতে নিতে আগ্রহী। সেখানেও বাধা আছে। বার্নাব্যুতে তিনি সপ্তাহে বেতন পান ৪ লাখ ইউরোরও বেশি। এটাও আর্সেনালের জন্য চাপ হয়ে যাবে। এ অবস্থায় তারা লস ব্লাঙ্কোসদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারে।
ব্রাজিলের গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি ও বেলজিয়ামের লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ড কয়েক বছর ধরে আর্সেনালের লেফট উইংয়ে খেলেছেন। যদিও ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়টি গানারদের প্রত্যাশা পূরণ করত পারেননি। এ জায়গায় কার্যকর হতে পারেন রদ্রিগো। কিন্তু তাকে কিনে আনা গানারদের জন্য কঠিন, এক্ষেত্রে ধার চুক্তি হতে পারে তাদের জন্য সহজ সমাধান।
সম্প্রতি বাছাইপর্বের শেষ দুটি ম্যাচের জন্য দল ঘোষণা করেছেন ব্রাজিল কোচ কার্লো অ্যানচেলত্তি। এ দলে নেই রদ্রিগো। ২৪ বছর বয়সী ফরওয়ার্ড এখন ব্রাজিল দলে ফিরতে মরিয়া। বিশেষ করে আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠেয় ফিফা বিশ্বকাপের দলে জায়গা করে নিতে চান। এজন্য তাকে খেলার মধ্যে থাকতে হবে। রিয়াল মাদ্রিদে বদলি হিসেবেই খেলার সুযোগ মেলে তার। নতুন কোচ জাভি আলোনসোর সময় এখন তা-ও অনিশ্চিত। কাজেই তিনি এমন ক্লাব বেছে নিতে চান যেখানে নিয়মিত খেলার সুযোগ মিলবে। এমন পরিস্থিতিতে ম্যানসিটি কিংবা আর্সেনাল যেটিই সামনে আসুক, তিনি লুফে নিতে পারেন। যদিও রিয়াল মাদ্রিদ তাকে রেখে দিতে চায়।
ম্যানসিটি ছেড়ে টটেনহ্যামে নাম লেখাতে পারেন ২১ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ান ফরওয়ার্ড সাভিনিয়ো। তিনি চলে গেলে রদ্রিগোকে দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করতে চান পেপ গার্দিওলা। রদ্রিগো কতটা ভয়ংকর স্ট্রাইকার, সেটি ভালো করেই জানা আছে গার্দিওলার। ২০২২ সালের ৪ মে বার্নাব্যুতে ম্যানসিটির হৃদয় চুরমার করেন এ রদ্রিগো। সেমিফাইনালের প্রথম লেগে ৪-৩ গোলে জয়ের পর দ্বিতীয় লেগে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে ফাইনালের পথেই ছিল ম্যানসিটি। কিন্তু ৯০ ও ৯১ মিনিটে পরপর দুই গোল করে লড়াইয়ে সমতা নিয়ে আসেন রদ্রিগো। এরপর ৯৫ মিনিটে করিম বেনজেমার পেনাল্টি থেকে করা গোল রিয়ালকে নিয়ে যায় ফাইনালে! ২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ার্টার ফাইনালে উভয় লেগেই ম্যানসিটির বিপক্ষে গোল করেছেন রদ্রিগো। এ দুবারই রিয়াল মাদ্রিদ শিরোপা জিতে নেয়। ফরওয়ার্ড পজিশনে এ ‘রত্ন’কে পেলে নিশ্চিতভাবেই লুফে নেবেন গার্দিওলা।










