বৃহস্পতিবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নতুন মৌসুমের ড্র অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। তবে গ্রুপ পর্বের সেই চিরাচরিত ড্র নয়, এবার একটু ভিন্ন ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত হলো ড্র। এবার অংশগ্রহণকারী দল বেশি, তারা ম্যাচও খেলবে বেশি, প্রাইজমানিও পাবে বেশি।
আরো বেশি ম্যাচ ও প্রাইজমানির জন্য ক্লাবগুলো প্রতিনিয়ত চাপের মুখে রেখেছিল গভর্নিং বডি উয়েফাকে। মাঝে তো রিয়াল মাদ্রিদসহ শীর্ষ দলগুলো উয়েফা সুপার লিগ গঠনের কাছাকাছিও পৌঁছে গিয়েছিল। যা-ই হোক, এখন তাদের দাবি মেনে নিতেই নতুন এক ফরম্যাটের সূচনা করল উয়েফা। এ ফরম্যাটে আগের মতো ঐতিহ্যবহুল গ্রুপ পর্ব নেই, আছে নতুন লিগ পর্ব। ২০০৩ সালের পর প্রথমবারের মতো চালু হওয়া নতুন ফরম্যাট ইউরোপের ক্লাবগুলোকে আরো ধনী হওয়ার সুযোগ করে দেবে।
আগে গ্রুপ পর্বে মোট ৩২টি দল অংশ নিত। এখন তার সঙ্গে আরো চারটি দল যুক্ত হয়েছে। আগে চার দলের গ্রুপে প্রতিটি দল হোম অ্যান্ড অ্যাওয়েতে ছয়টি করে ম্যাচ খেলার সুযোগ পেত, এখন খেলবে আটটি ম্যাচ। বর্ধিত ম্যাচের চাপ সামাল দিতেই এই প্রথমবারের মতো জানুয়ারিতেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।
প্রাইজমানি অন্তত ২৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াবে ২৫০ কোটি ইউরোয় (৩৩ হাজার ১৮৮ কোটি ইউরো)।
নতুন এ ফরম্যাটে নিকট অতীতের অনেক ফাইনালিস্ট লিগ পর্বে মুখোমুখি হয়ে যাবে। যেমন বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ, গতবারের ফাইনালিস্ট বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ও লিভারপুল। স্প্যানিশ জায়ান্টরা গত আসরের ফাইনালে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে হারায় এবং ২০২২ ও ২০১৮ আসরের ফাইনালে হারায় লিভারপুলকে। নতুন ফরম্যাটে ডর্টমুন্ডকে আতিথ্য দেবে আর লিভারপুলের মাঠে খেলতে যাবে কার্লো অ্যানচেলত্তির দল। যদিও ম্যাচের সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ইংলিশ চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার সিটিও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের পুনরাবৃত্তির সামনে পড়ছে—তারা আতিথ্য দেবে ইন্টার মিলানকে, ২০২৩ সালে যাদের হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান মুকুট জয় করে সিটিজেনরা। জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখ আতিথ্য দেবে ফরাসি জায়ান্ট প্যারিস সেন্ট জার্মেইকে, যাদের ২০২০ সালের ফাইনালে ১-০ গোলে হারিয়েছিল বাভারিয়ানরা।
কীভাবে কাজ করবে নতুন ফরম্যাটে
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ২০২৩ সাল থেকে শুরু করে টানা ২১ মৌসুম একই ফরম্যাটের গ্রুপ পর্ব দেখে এসেছেন দর্শকরা। ৩২টি দলকে আটটি গ্রুপে ভাগ করা হতো এবং দলগুলো সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রুপ পর্ব শেষ করত। প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল উঠত শেষ ষোলোয়। এরপর নকআউটে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ের লড়াই শেষে এক ম্যাচের ফাইনালে যেত সেরা দুটি দল।
সেই ঐতিহ্য ভেঙে এবার ৩৬ দলের লিগ পর্বে পা রাখছে ইউরোপের সেরা দলগুলো। প্রতি গ্রুপে ৯টি করে দল। প্রতি দল জানুয়ারি পর্যন্ত চলতে থাকা লিগ পর্বে আটটি করে ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবে। গ্রুপগুলো তৈরি করা হয়েছে বেশ ভারসাম্যপূর্ণভাবে। ৩৬টি দল রÅাংকিং অনুসারে চারটি ভিন্ন পটে রাখা হয়েছিল। এমনভাবে গ্রুপিং করা হয়েছে যেন প্রতিটি দল বাকি প্রতিটি পট থেকে দুটি করে দলকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পায়।
লিগ পর্ব শেষে প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি করে দল ওঠে শেষ ১৬ রাউন্ডে, যা মার্চে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তারা টেনিস স্টাইলের নকআউট ম্যাচে মুখোমুখি হবে এবং আলাদা করে কোনো ড্র অনুষ্ঠিত হবে না। ২০২৫ সালের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে বায়ার্ন মিউনিখের মাঠে।
শেষ ষোলোর বাকি আটটি দল কীভাবে নির্ধারণ হবে তা দেখে নেয়া যাক। নবম থেকে ২৪তম হওয়ায় দলগুলো ফেব্রুয়ারিতে নকআউটের প্লে-অফ ম্যাচে মুখোমুখি হবে এবং তলানির ১২টি দল বিদায় নেবে। প্লে-অফে নবম থেকে ১৬তম দলগুলো একটু সুবিধা পাবে। ড্র এমনভাবে করা হবে যেন এ দলগুলো দ্বিতীয় লেগের খেলা নিজেদের মাঠে খেলতে পারে। তাদের প্রতিপক্ষ হবে ১৭তম থেকে ২৪তম দলগুলো।
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন এমন ফরম্যাটে বেছে নিল উয়েফা। উত্তরটা সহজ—ক্লাবগুলো আরো বেশি অর্থ চেয়েছিল। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এমন একটি টুর্নামেন্ট যা বিশ্বের ক্লাব ফুটবলে সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন ও জনপ্রিয়। এই ফ্ল্যাগশিপ টুর্নামেন্টকে পুঁজি করেই উয়েফা সম্প্রচার ও স্পন্সর চুক্তি থেকে কোটি কোটি ইউরো আয় করে এবং তারা ক্লাবগুলোকেও আকর্ষণীয় প্রাইজমানি দেয়। তবে ক্লাবগুলোকে খেলোয়াড় কেনা ও তাদের বেতন বাবদ কোটি কোটি ইউরো খরচ করতে হয় বলে তারা উয়েফার কাছে আরো বেশি প্রাইজমানির দাবি তোলে। সেটি পূরণ করতেই নতুন ফরম্যাট নিয়ে এল উয়েফা, যাতে বেশি ম্যাচ ও বেশি প্রাইজমানি থাকবে।
এর পক্ষে যুক্তি আছে ক্লাবগুলোরও। চিরাচরিত গ্রুপ পর্বে একই ম্যাচের পুনরাবৃত্তি হতো এবং গ্রুপে দেখা যেত, বাকি তিনটি দলই দুর্বল। এখন তারা গ্রুপে একাধিক শক্তিশালী দল পাচ্ছে এবং তাতে বেশকিছু জমজমাট ম্যাচ থাকবে। ফলে আরো বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি হবে এবং সম্প্রচার কোম্পানি, দর্শক আর বিশ্বব্যাপী নতুন সমর্থকরা উপভোগ করবেন।
এতে খেলোয়াড়দের ওপর কাজের চাপও নিশ্চিতভাবে বেড়ে যাবে। আগের ফরম্যাটে ছিল ১২৫ ম্যাচ, যা চলতি মৌসুমে বেড়ে হবে ১৮৯ ম্যাচ। বাড়তি এ ম্যাচগুলো ফুটবলের সূচিকে অত্যন্ত ব্যস্ত করে তুলবে। বিশেষ করে, এ বছর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ খেলে ফুটবলাররা এমনিতেই ক্লান্ত। আগামী জুনে আবার মাসব্যাপী ক্লাব বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে ফিফা।
একটি দলকে শেষ ষোলোয় পৌঁছতে ১০টি করে ম্যাচ খেলতে হবে, যা আগের মৌসুমগুলোয় ছিল মাত্র ছয় ম্যাচ।
নতুন ফরম্যাটের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নিয়ে উয়েফার ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল গিওর্গি মারচেত্তি বলেছেন, ‘ইউরোপে নিয়মিত ম্যাচ খেলার চাহিদা ক্লাবগুলোরই, আমাদের নয়। সমর্থকদের এখন বলা হবে আরো বেশি সময় ও অর্থ খরচ করে দলগুলোকে সমর্থন দিতে। যদিও সময় ও অর্থ অনেকের থাকে না।’ ইউক্রেনিয়ান চ্যাম্পিয়ন শাখতার দোনেৎস্কের সিইও শেরহি পালকিন বলেন, ‘আমাদের সমর্থক, খেলোয়াড়কে চনমনে রাখতে ও ক্লাবকে আর্থিকভাবে লাভবান করতেই একটি সমাধান হিসেবে ইউরোপে যত বেশি ম্যাচ খেলা যায় সেই সুযোগ চেয়েছি।’










