গল্প, উপন্যাস এমনকি কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ নতুন নয়। ১৯০২ সালে নির্মিত জর্জ মেলির চলচ্চিত্র আ ট্রিপ টু দ্য মুন অনুপ্রাণিত ছিল ১৮৬৫ সালে জুল ভার্ন রচিত ফ্রম দি আর্থ টু দ্য মুন ও এর সিকুয়াল অ্যারাউন্ড দ্য মুন নামের উপন্যাস দুটো। ১৯১৩ সালে দাদাসাহেব ফালকের এবং ভারতের প্রথম ফিচার ফিল্ম রাজা হরিশচন্দ্র নির্মিত হয়েছিল মার্কণ্ডেয় পুরাণ থেকে। বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্গেশ নন্দিনীকে চলচ্চিত্রে রূপায়ণ করেছিলেন প্রিয় নাথ গাঙ্গুলি। ১৯২৫ সালের নির্বাক ছবি প্রেম সন্ন্যাস ছবিটি ছিল এডউইন অরনল্ডের দ্য লাইট অব এশিয়া কবিতা অবলম্বনে। সত্যজিৎ রায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে নির্মাণ করেছেন বিখ্যাত অপু ট্রিলজি। দেব আনন্দের গাইড, গুরু দত্তের সাহেব বিবি অউর গোলাম, শ্যান বেনেগালের জুনুন—ভারতীয় চলচ্চিত্র দুনিয়ায় সাহিতকর্ম থেকে সফল চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধই বলা চলে।

ম্যান বুকারজয়ী অরবিন্দ আদিগার উপন্যাস দ্য হোয়াইট টাইগার অবলম্বনে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে চলচ্চিত্র। এতে অভিনয় করেছেন প্রিয়াংকা চোপড়া, রাজকুমার রাও। পরিণীতি চোপড়া ডিজিটাল দুনিয়ায় কাজ শুরু করেছেন পলা হাকিন্সের দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন ছবির অফিসিয়াল রিমেকের মাধ্যমে। হূত্বিক রোশান প্রস্তুতি নিচ্ছেন জন লা ক্যারের থ্রিলার অবলম্বনে দ্য নাইট ম্যানেজার ছবিতে কাজ শুরু করার।

বই থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুধু সমালোচকদের পছন্দের টপিক হয়ে ওঠে না, বরং বক্স অফিসেও এর গুরুত্ব লক্ষ করা যায়। ভারতীয় ট্রেড অ্যানালিস্ট অতুল মোহন মনে করেন, কোনো বই থেকে ঠিকঠাকভাবে নির্মিত ছবি সবসময়ই বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছে। তার কথায়, ‘দিলীপ কুমার ও শাহরুখ খানের ‘দেবদাস’ বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছে। অন্যদিকে ফিতুর, সাত খুন মাফ ও সাওয়ারিয়ার মতো অসফল ছবিও আছে তালিকায়।’

চেতন ভগতের উপন্যাস হাফ গার্লফ্রেন্ড থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য চিত্রনাট্য লিখেছিলেন তুষার হীরানন্দানি, ছবিতে অভিনয় করেন অর্জুন কাপুর ও শ্রদ্ধা কাপুর। তার মতে, বই থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যাপারে একটু সুবিধা থাকে, বইটা পাঠক কীভাবে গ্রহণ করেছেন সেটা আগেই জানা যায়। ‘পাঠকের রায় আগেই জানা যায়, তাই আপনি নিশ্চিন্তে ছবি নির্মাণ করতে পারেন। কারণ কিছু দর্শক তো ছবি নিয়ে আগ্রহী হয়েই থাকবেন।’

মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ দীপেশ শাহ বলেন, ‘একটা ভালো গল্পের নিশ্চয়তা থাকলে ছবির বিপণন করাটাও সুবিধাজনক হয়। উপন্যাসটির ভক্তরা ছবির জন্য নিজের গরজে প্রচারণা চালাতে থাকেন। এটা মার্কেটিং ও প্রমোশন ক্যাম্পেইনের ক্ষেত্রে খুব কাজে লাগে।’


মুম্বাইয়ের বুক নার্ড সিদ্ধার্থ জৈন প্রতিষ্ঠা করেছেন স্টোরি ইংক নামে একটি এজেন্সি। তাদের কাজ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য গল্প-উপন্যাস খোঁজা, সেগুলোকে পরিচালক-প্রযোজকদের কাছে নিয়ে যাওয়া, চিত্রনাট্য তৈরি এবং সর্বোপরি লেখক-প্রকাশকদের সঙ্গে চুক্তি করিয়ে দেয়া। সিদ্ধার্থ বলেন, ‘চলচ্চিত্র দুনিয়ায় একটা প্যারাডাইম শিফট হয়েছে। আগের দিনে সবকিছু ছিল তারকাকেন্দ্রিক। এখন ছবির গল্প নিয়ে কথা হয়। আগের দিনে তারকা ফর্মুলার হিন্দি ছবিতে বইনির্ভর কাহিনী মেলানো যেত না।’

সিদ্ধার্থ কীভাবে লেখক ও প্রকাশককে কাছে আনেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সিদ্ধার্থ ব্যাখ্যা করেন, ‘যে নির্মাতা কাহিনীর সত্ত্ব কেনেন, চাইলে তিনি তাতে কিছু বদল আনতে পারেন। কিছু লেখক বাদে বেশির ভাগই তাদের বই নিয়ে সিনেমা হলে খুশি হন। অনেকেই পরিচালকের সঙ্গে সমন্বয় করার সুযোগ পান না।’

ভারতের জনপ্রিয় লেখক চেতন ভগতের দাবি, থ্রি ইডিয়টস ছবিটির ৭০ শতাংশ তার ফাইভ পয়েন্ট সামওয়ান বই থেকে প্রভাবিত। তবে ছবিতে তাকে ঠিকমতো ক্রেডিট না দেয়া ও চিত্রনাট্য তাকে না দেখনোয় তিনি বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু পরিচালক রাজু হিরানি অবশ্য দলিলসহ চেতনের দাবিকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করেছেন। অবশ্য চেতনের নিজের সময়ও বদলেছে থ্রি ইডিয়টসের সাফল্যের পর। তার কথায়, ‘এখন নির্মাতারা আমাকে ক্রেডিট দিতে চান। এমনকি তারা আমার নামের ব্র্যান্ড ছবির প্রচারণায় ব্যবহার করতে আগ্রহী। কারণ এতে আমার পাঠকরা ছবিটি হলে গিয়ে দেখতে আগ্রহী হন। এজন্য আমি ভাগ্যবান।’

 

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া