যে সময়ের কথা বলছি সেটা সত্তরের দশকের শুরু ও মাঝামাঝি একটা সময়। আমরা কয়েকজন বন্ধু তখন কেবল কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমাদের কয়েকজনের ভেতর তখন এ রকম একটা উত্সাহ অনুপ্রাণিত করল যে আমরাও একটা সিনে ক্লাব তৈরি করি। সংক্ষেপে যার নাম ছিল, ঈঅঞডঅ. মানে সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ওয়াচারস অ্যাসোসিয়েশন। উল্লেখ না করলেই নয়, তখন ফিলিপসের তত্কালীন মহাব্যবস্থাপক ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক কর্মী, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য উপদেষ্টা শ্রদ্ধেয় মাহবুব জামিল এ আন্দোলনে  ভূমিকা রেখেছেন। আমাদের কাটোয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন ঢাকার দিলু রোডের অধিবাসী তরুণ ও সুদর্শন ব্যবসায়ী মাসুদ চৌধুরী। মাসুদ চৌধুরী আমাদের ইতিহাস শিক্ষাবিদ, প্রফেসর আফসান চৌধুরীর বড় ভাই। পরে কাটোয়ার সঙ্গে যুক্ত হলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় ড. আলাউদ্দিন আজাদ। প্রফেসর ডাক্তার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সংগীত পরিচালক, সুরকার ও গীতিকার সেলিম আশরাফ। বাংলা রেডিও ও টেলিভিশনের সুপরিচিত এবং প্রখ্যাত সংবাদ পাঠক, উপস্থাপক ও সংবাদ বিশ্লেষক সরকার কবীরুদ্দীন। সরকার কবীর বর্তমানে আমেরিকায় ‘ভয়েস অব আমেরিকা’য় যুক্ত। আমাদের সারথি বলি বা সঙ্গী বলি কিংবা কর্মী বলি, ছিলেন ফিল্ম নির্মাতা তারেক মাসুদ, ওই সময়ের মেধাবী ছাত্র পিয়াস করিম এবং আরো অনেকে, যাদের নাম এ মুহূর্তে মনে আসছে না। এ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মঈন করিম চৌধুরী। মঈন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আছেন ওয়াশিংটনের মেরিল্যান্ডে।

কাটোয়ার সুবাদেই ফিল্ম ও মুভি কাকে বলে, এ বিষয়ে কিছুটা জ্ঞাত হতে পারি, এ বিশেষ বিষয়ে কিছুটা আক্ষরিক অভিজ্ঞতা হয়। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই সাদামাঠা কিছু কথা শেয়ার করছি পাঠকের সঙ্গে। বলা যেতেও পারে কিছুটা একটি সময়ের স্মৃতিচারণা কিনা। আমাদের বন্ধু দলটা ছিল বেশ বড়। নানা দিকে যাদের বিচরণ ছিল। সৃজনশীল কাজে পরে যারা সুপরিচিত হয়েছেন রাষ্ট্রীয় মহলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং কবিতা ও সাহিত্যের জগতে তাদের কারো কারো নাম নিতে ইচ্ছে করছে। যেমন কবিতা চর্চা এবং এ শিল্পের নান্দনিক জগতে যারা ভীষণ জনপ্রিয় ছিল তাদের মধ্যে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, কবি কামাল চৌধুরী, মোহন রায়হান, জাফর ওয়াজেদ, তুষার দাশ, আঞ্জুমান আরা মুক্তি জনপ্রিয় ছিল। রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল বন্ধু আলী রীয়াজ। রীয়াজ পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের মানে ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদকও নির্বাচিত হয়। রীয়াজ এখন যুক্তরাষ্ট্রে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্র এবং সরকার বিভাগের একজন বিশিষ্ট ও সম্মানিত অধ্যাপক। কথাসাহিত্য জগতের যারা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন তাদের মধ্যে মঈনুল আহসান সাবের, লেখক গল্পকার মঈনুস সুলতান, ফারুক মঈনউদ্দীন অন্যতম।

আমাদের শৈশবে ও কৈশোরে যেসব চলচ্চিত্র বা মুভি আমরা দেখেছি বা দেখতাম এর মধ্যে কয়েকটি নাম স্মৃতির অ্যালবামে উজ্জ্বল এখনো। যেমন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের নির্মিত ছবি, মুখ ও মুখোশ, জাগো হুয়া সভেরা, রাজধানীর বুকে, পিচঢালা পথ, এতটুকু আশা। সুতরাং, কাচের দেয়াল, ময়নামতি, জীবন থেকে নেয়া, ধারাপাত, ছুটির ঘণ্টা, লেট দেয়ার বি লাইট—এ রকম আরো কিছু ছবি যার গল্প, চলচ্চিত্রায়ন, অভিনয়, সংগীত মান, এসব কিছু হূদয়ের গিটারে এখনো অনুরণিত হয়। 

স্বাধীনতার পর আমাদের চলচ্চিত্র জগতে কিছুটা যেন ভাটা পড়ে নানাবিধ কারণে। তবু এর মধ্যেই নির্মিত হয়েছে কিছু ছবি, যেগুলোর নাম উল্লেখ করতে হয়। যেমন— অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, ওরা ১১ জন, আবার তোরা মানুষ হ, সীমানা পেরিয়ে, পদ্মা নদীর মাঝি। এ ছবিগুলো নিঃসন্দেহে সুস্থ চলচ্চিত্রের মান, এর নান্দনিক দিক, এর চলচ্চিত্রায়ন, অল্প অভিনয়, এর কোনোটাকেই আন্তর্জাতিক মান থেকে দূরে রাখা সম্ভব না। এগুলো যেমন বাণিজ্যিকভাবে সফলতা পেয়েছে, তেমনিভাবে সিনেমা সচেতন মানুষদের কাছেও প্রশংসা পেয়েছে। মোটাদাগে এ ছবিগুলোর ভেতর সমালোচকদের দৃষ্টিকোণে ও এর শিল্পিত মান এবং বাণিজ্যিক ছবি বলতে যদি সংক্ষেপে মুভিজ বলি, তারও একটা সফলতা আমরা দেখেছি। যেমন জীবন থেকে নেয়া ছবিটিকে একাধারে শিল্পিত বা আর্ট ছবি এবং বাণিজ্যিক মুভি দুটোই বলা যায়। এক্ষেত্রে ছবি লেট দেয়ার বি লাইটের কথা বলতে হয়। 

আমাদের চলতি ছবিগুলোকে হলিউড ও বলিউডের বাণিজ্যিক এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রতিযোগিতা ভীষণভাবে প্রভাবিত করছে। আমরা ভুলে যাই হলিউড ও বলিউডের জীবন সংস্কৃতি ভাবনা, এর সঙ্গে আমাদের জীবন সংস্কৃতির ভাবনাতে মৌলিকভাবেই পার্থক্য আছে। 

ছবি প্রদর্শনের প্রেক্ষাগৃহ ও সময় নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচকদের অনেকের মতে, যেসব ছবি প্রধানত অবাণিজ্যিক সেগুলোর প্রদর্শনে প্রেক্ষাগৃহগুলো আকারে ছোট হলে ভালো হয় যাতে সেই হলগুলো অর্ধেক খালি না থাকে। এতে প্রদর্শনের লোকসানের অংকটা কমে যাবে। দৃষ্টান্ত দেয়া যায় তধনত্রংশরব ঢ়ড়রহঃ এই ছবিটি নির্মিত হয় ১৯৩৯ সালে, এমজিএম সিনেমায় মুক্তি পেয়ে তখন সেটা মুখ থুবড়ে পড়ে। বাংলা ছবির ক্ষেত্রে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিত্ রায়ের পথের পাঁচালী, নির্মিত হয় ১৯৫৫ সালে এবং ঋত্বিকের ছবি, কোমল গান্ধার নির্মিত হয় ১৯৬১-তে, একই পরিণতি হয়েছিল। ছবির পরিচালক মৃণাল সেন তার ছবি ভুবন সোম, যা নির্মিত হয় ১৯৬৯ সালে সেটা আবার বড় রকমের লোকসান থেকে বেঁচেও যায়, ছবিটি প্রথম একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য গৃহে প্রদর্শিত হয়। জাপানের কুরোসাওয়ার ঝবাবহ ঝধসঁত্ধর ১৯৫৪ সালে নির্মিত, জাপানে এ ছবিটির ব্যবসায়িক সাফল্য ভালো হলেও পরবর্তী সময়ে সেটা যখন সাবটাইটেলসহ বিশ্বের অনেক জায়গায় মুক্তি পায়, তখন সেটা বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি। এখানে যেকোনো ছবির সময় নির্বাচন, স্থান, গল্প ও সমসাময়িক প্রজেক্ট একটা ব্যবহার এবং উপস্থাপনা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটার একটা আভাস মেলে। কারণ পরে একই রকম গল্প নিয়ে জন স্টার্চের পরিচালনায় আমেরিকান ওয়েস্টার্ন ছবি ঞযব গধমহরভরপবহঃ ঝবাবহ, যা নির্মিত হয় ১৯৬০ সালে, সেটা ব্যাপক বাণিজ্যিক সফলতা অর্জন করে। উল্লেখ্য, সত্যজিত্ রায়ের ছবি পথের পাঁচালী, প্রথম প্রদর্শনী ব্যবসায়িক সফলতা না পেলেও পরবর্তীকালে এ ছবিটি দেখতে হলে গিয়ে অনেকে টিকিট না পেয়ে ফিরে আসেন। এই বিষয়ে এবার আরেকটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। ১৯২০ দশক থেকে বাংলা ভাষাতে চলচ্চিত্রের বিশ্লেষণমূলক আলোচনা ও সমালোচনার একরকম শুরু বলা যায়। তখনকার ভারতবর্ষে বাংলা অঞ্চলে কিছু চলচ্চিত্র বিষয়ে ম্যাগাজিন বা পত্রিকা প্রকাশ হতো। নামগুলো যেমন, প্রবাসী, নাচঘর, চিত্রলেখা, চিত্রপঞ্জি। এসব পত্রিকাতে চলচ্চিত্র বিষয়ে নানা আলোচনা ও সমালোচনা উঠে আসত। ১৯২৪ সালে ভারতের সৌরীন্দ্রমোহন, নাচঘর পত্রিকাতে লেখেন, ‘ফিল্মকে আর্টিস্টিক করিতে সর্বাগ্রে চাই গল্পের সুসামঞ্জস্য বিকাশ এবং তার অভিনয় মনস্তত্ত্বের নিখুঁত লিলা’। এখানে জোর দেয়া হয়েছে আরেক অর্থে মানবতা ও স্বাভাবিকতার ওপরে, যেখানে গল্প বলার কাজটি ন্যাচারাল চেইন ধরে এগোবে, ট্রেন অব ইভেন্টস স্বাভাবিক হবে। বলতে দ্বিধা নেই যে আমাদের অঞ্চলে বলতে বাংলাদেশ মুখ ও মুখোশ চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে সত্তরের প্রথম দশকের বেশির ভাগ সময় আমাদের চলচ্চিত্রের শিল্পমান এবং বুদ্ধিমান সার্বিক অর্থে উঁচু মানের ছিল। সময়, পরিবেশ, রাজনীতি অর্থনীতি এবং বুর্জোয়া সংস্কৃতির প্রভাবে উনিশ শতকের শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের চলন-বলন, এর সাহিত্য, কবিতা, নাটক, সবকিছুতে এক রকম বাণিজ্য প্রধান বিষয়কে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। এর ফলে বিশ্ব মানবিক সংস্কৃতি এবং চর্চায় এক ধরনের আবর্জনার স্তূপ বাড়ছে। মনে পড়ে পশ্চিমবাংলার ছবি, যেমন—হারানো সুর, হাসপাতাল, অপুর সংসার, সাড়ে চুয়াত্তর, জেলে যাই, সাগরিকা, রাজার দেশে। এ রকম ছবি ইদানীং আমরা পর্দায় দেখছি না। ওখানেও এখন নির্মিত হয়, পিয়া রে, উনিশ বিশ, ধর্মের জয়, পার্টনার ধরনের বাণিজ্যিক ছবি। বাংলাদেশও কম না, আমাদের ছবির নাম এ রকম হয়—লাঠি, শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ, বাটপার, গরিবের সংসার, নিষ্পাপ, মুন্না ইত্যাদি। ভালো ছবির চাহিদা কমছে। এটা কি মানুষের রুচির পরিবর্তন নাকি চাহিদার রূপান্তর, অথবা এটা কি দুটোরই এক রকম সমন্বয়। চিত্রবোদ্ধারা ভালো জানবেন। দর্শকরা চলচ্চিত্রে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, সমাজের অন্তর্গত এক বিস্তৃত নৈতিক ও সামাজিক ভেতরের অংশ হিসেবেও দেখতে চান। 

ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্র সেটা বাণিজ্যিক হোক কিংবা শিল্পিত। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের সব রকম গভীরতাকেও যেন আমরা সেলুলয়েডের ফিতায় দেখতে পারি। আমাদের সংস্কৃতির প্রতিটা ক্ষেত্রেই আমাদের যে ঐতিহ্য আছে, সেটাকে উন্নত রাখা, মনোযোগী করা চলচ্চিত্রের সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট এবং দর্শক যাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে করণীয় যেটা, তা হলো আমরা মন্দকে যেন মন্দ বলি, ভালোকে যেন প্রশংসা করি, উত্সাহিত করি এবং প্রয়োজনে অর্থায়ন করি। জীবনের কোনো কিছুই একলা পথে চলে না, কেউ ডাক না শুনলেও চেষ্টা অব্যাহত থাকে যেন সেই ডাক শোনার জন্য পরিবেশ পরিস্থিতি, রাজনীতি এবং অর্থনীতি এসবকে আমাদের সংস্কৃতির কবিতা, সাহিত্য, গল্প, চলচ্চিত্র, নাটকে তুলে ধরতে পারি। 

 

মাহমুদ রেজা চৌধুরী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক