হলিউডের আকাশ থেকে খসে পড়ল আরেকটি নক্ষত্র। নক্ষত্রের নাম ভ্যাল কিলমার। তাকে ঘিরে রয়েছে নানামুখী আলোচনা। তবে একটা কথা সত্য। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অবিশ্বাস্য প্রতিভা দেখানোর পরও তার নামের পাশে স্বীকৃতি জুটেছে সামান্যই।
ভ্যাল কিলমারের গতিবিধি ছিল বহুমাত্রিক। কমেডি, ওয়েস্টার্ন, ক্রাইম ড্রামা, মিউজিক্যাল ও অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্র—সব ঘরানাতেই দেখিয়েছেন মুনশিয়ানা। সমানভাবে কাজ করেছেন মঞ্চ ও সিনেমায়। সঙ্গে ছিল চমৎকার গান গাওয়ার ক্ষমতা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের বহুমাত্রিক পরিস্থিতিতে অবিশ্বাস্য দক্ষতার সঙ্গে নিজেকে মেলে ধরেছেন তিনি। এজন্যই চলচ্চিত্র সমালোচক রজার এবার্ট তার প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘যদি কিলমারের প্রজন্মের সবচেয়ে কম কীর্তিত কাউকে পুরস্কৃত করা হয়, সেটা তিনিই পাবেন।’
ভ্যাল কিলমার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৯ সালে। লস অ্যাঞ্জেলেসের মধ্যবিত্ত পরিবারে। শৈশব থেকেই নাটকের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয়। চেয়েছিলেন লন্ডনের রয়েল একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্টে পড়াশোনা করবেন, কিন্তু বয়স কম ছিল বলে পারেননি। পড়াশোনা করেন নিউইয়র্কের জুলিয়ার্ড স্কুলে। মঞ্চে তার কাজের শুরুটা হয় জার্মান জীবন নিয়ে রচিত ‘হাউ ইট অল বিগান’ নাটকের মাধ্যমে। এখানে তিনি একই সঙ্গে সহলেখক ও অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন। দ্রুত দক্ষতার প্রমাণও দেন। অভিনয় করেন শেকসপিয়রের ‘হেনরি দ্য ফোর্থ’ ও ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ নাটকে।
চলচ্চিত্রে কিলমার পা রাখেন টপ সিক্রেট সিনেমার মধ্য দিয়ে। সেখানে তার অভিনয় ও কণ্ঠের মুনশিয়ানা বোদ্ধাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। একটা কবিতার বইও প্রকাশ করেন এ সময়, নাম মাই এডেন্স আফটার বার্নস। এর ঠিক দুই বছরের মাথায় তাকে দেখা যায় টপ গান সিনেমায়। সিনেমাটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। তারপর আর ক্যারিয়ারে পেছনে তাকাতে হয়নি।
সিনেমায় জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকার পরও কিলমার মঞ্চনাটক থেকে সরে যাননি। তিনি ১৯৮৮ সালে হ্যামলেটে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৯০ সালে পা রাখেন সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে। জিম মরিসনকে নিয়ে সে সময় পরিচালক অলিভার স্টোন চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবছেন। দ্য ডোরস নামের সে সিনেমায় কিলমার থাকেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে, যার অন্যতম কারণ ছিল তার কণ্ঠস্বর। সিনেমাটির জন্য কিলমার ওজন কমান; গান মুখস্থ করেন ৫০টি। তার এ গায়কি গুণকে পরবর্তী সময়ের পরিচালকরাও কাজে লাগিয়েছেন। এজন্যই ‘ট্রু রোমান্স’ সিনেমায় তাকে ফের দেখা যায় এলভিস প্রিসলি চরিত্রে। অভিনেতা হিসেবে কিলমার ছিলেন কঠোর। প্রায়ই তার সঙ্গে পরিচালকদের টানাপড়েন গেছে। তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন নির্মাতারা। নব্বইয়ের দশকে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নেয়া হলিউড তারকা।
২০০৪ সালের দিকে কিলমার আবার থিয়েটারে ফিরে আসেন। লস অ্যাঞ্জেলেসে তিনি দ্য টেন কমান্ডমেন্টস নাটকে অভিনয় করেন। ২০০৬ সালে অভিনয় করেন পরিচালক স্কটের সিনেমা দেজাভুতে। এছাড়া টেলিভিশন সিরিজ কিট দ্য ফিউচারিস্টিক কার সিনেমায় তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। এখানেই শেষ নয়। তাকে পরিচালক হিসেবেও দেখা গেছে স্বল্প সময়ের জন্য। এ বহুমাত্রিক পদচারণার জন্য হলেও সমকালীন অন্য তারকাদের থেকে তাকে আলাদা করে চেনা যায়।
২০১৪ সালে কিলমার গলার ক্যান্সারের জন্য চিকিৎসা নেন। তারপর আর কখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। চিকিৎসাও চলতে থাকে। এমন অবস্থা নিয়েই কাজ করতে থাকেন তিনি। ২০২১ সালে তাকে নিয়ে তৈরি হওয়া ‘ভ্যাল’ প্রামাণ্যচিত্রে অভিনয় করেন। ২০২২ সালে শেষবারের মতো তাকে দেখা যায় পর্দায়। টপ গান: ম্যাভেরিকে তিনি পুনরায় একত্র হন টম ক্রুজের সঙ্গে তিন দশকের বেশি সময় পর।
কিলমারের প্রস্থানে হলিউডের বহুমাত্রিক নক্ষত্রের পতন ঘটল। বিনোদন দুনিয়ায় তাকে মনে রাখা হবে বিচিত্র মানুষ ও কঠোর অভিনেতা হিসেবে। হলিউডের পার্টিপ্রধান জীবনকে তিনি মেনে নেননি। সময় কাটিয়েছেন তার পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে। থেকেছেন নিজের সঙ্গে। সবার মতো করেননি খ্যাতি ও সম্মাননার খোঁজ। যেমনটা তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘সাফল্য ও খ্যাতি জিনিসটা আমি ঠিক বুঝি না।’










