বাংলাদেশের গুণী অভিনেত্রী ডলি জহুর। মঞ্চ থেকে অভিনয়ের শুরু। এরপর টেলিভিশন ও সিনেমায় নিয়মিত হয়ে ওঠেন। এখনো সমানতালে অভিনয় করছেন তিনি। ২০২১ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হয়। তার ঈদের সারা দিন নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিহা জামান শশী
আপনার ঈদ কেমন গেল?
আমি এ সময়ে এসে ঈদ পালন করি না। অন্য সব দিনের মতোই ঈদ আমার কাছে একটা দিন। আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি ৬০ শতাংশ ঈদ পালন করা বন্ধ করে দিয়েছি। বাচ্চারা বিদেশে চলে যাওয়ার পর আমার ঈদ বলে কিছু নেই।
তাহলে ঈদের দিনটা যায় কীভাবে?
তিনদিন পুরো সময়টার বেশির ভাগই বাসায় কাটাই। ভালো লাগলে কোথাও যাই। তাও খুব কাছের আপনজনদের বাসায় যাই। নয়তো তিনদিন একটানা বাসায় থাকি। আর রান্নাও আমি করি না একার জন্য। অন্যান্য দিন যা খাই ঈদেও তেমনটাই। আর রোজার ঈদে মাসজুড়ে রোজা রাখার আনন্দ উপভোগ করি। রোজার মাসে আমি কোরআন শরিফ খতম দিলাম। এটা একটা আনন্দ আমার জন্য। এছাড়া রোজায় অনলাইনে একটা আরবি ক্লাস করি আমরা আজিমপুর গার্লস স্কুলের বন্ধুরা মিলে। ঈদের আনন্দ করার জন্য বয়স থাকা দরকার আর সঙ্গে লাগে পরিবার। আগে যেমন স্বামী-সন্তানদের জন্য রান্না করতাম। বাবার বাড়িতে থাকলে বাবার জন্য রান্না করতাম। ভাই-বোনদের রান্না করে খাওয়াতাম। এখন কার জন্য করব। আমি ঈদে কয়েকবার বাসায় রান্না করে দেখেছি কেউ আসে না। আমি থাকি উত্তরায় আর সব আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুরা থাকে ধানমন্ডির ওইদিকে। তাই আমি আমার মতো থাকি। আমি আমার ঘরের মধ্যে চুপচাপ বসে থাকি আর টেলিভিশন ছেড়ে ঈদের নাটক দেখি। এর সঙ্গে প্রতি ওয়াক্তে নামাজ পড়ি।
দেশের বাইরে ঈদ করতে যান?
এবার রোজার আগে আমার যাওয়ার কথা ছিল। আমার ছেলের খুব ইচ্ছা ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় এখন ঠাণ্ডা। আমার যাতে রোজা রাখতে কষ্ট না হয়, তাই সে আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পরে আমি ছেলেকে জানাই, রোজায় এখানেই থাকব। আমাদের এখানকার মানুষ তো কষ্ট করে রোজা রাখে, আমিও তো আগে রেখেছি।
এবার ছোটবেলার ঈদের স্মৃতি নিয়ে বলুন।
ঈদের আনন্দ মানেই আসলে ছোটবেলা। তখন আমরা সবাই সেজেগুজে নতুন জামা পরে ঘুরতে বের হতাম। সারা দিন ঈদের ঘোরাঘুরি লেগে থাকত। সালামি যা পেতাম তা দিয়ে আইসক্রিম খেতাম। আর সামনে যা পেতাম, ভালো লাগত, তা কিনে খেতাম। তখন ব্যাপারটাই অন্য রকম ছিল। ওই জীবন আর এ জীবন অনেক তফাত। এখনকার সময়ে কেউ দলবলে ঘুরেও বেড়ায় না। হ্যাঁ, এখনো কয়েকজন করে। তবে আমাদের সময় আমরা সবাই ঈদে ঘুরে বেড়াতাম সালামি নিয়ে। বন্ধুদের সঙ্গে ভালো সময় কাটত। কার জামা-জুতা কেমন হলো, এটা দেখা নিয়েও আলাদা আনন্দ ছিল ছোটবেলায়। সময়ের সঙ্গে এখন অনেক কিছু বদলে গেছে।
আপনি ছোটবেলায় সালামি কার কাছ থেকে বেশি পেতেন?
খুব বেশি পেতাম না। তবে সবাই দিত, এটা ছিল মূল মজা। আম্মা-আব্বা সালামি দিত, সঙ্গে আমার বড় বোন। এছাড়া আত্মীয়-স্বজনও ঈদে সালামি দিত। এমনকি বাসায় আসা মেহমানরাও ছোটদের সালামি দিতে ভুল করতেন না। সালাম না করলেও ছোটবেলায় দেখতাম ডেকে সালামি দিয়ে দিত হাতে। যেমন এখন ঈদে আমার বিল্ডিংয়ের বাচ্চারা যখন আসে, ওরা সালাম করার আগেই আমি সালামি দিয়ে দিই। ওরা অনেক খুশি হয়। এটা দেখতেও ভালো লাগে।
ঈদের দিন ওই বাচ্চাগুলোকে দেখে নাতি-নাতনিদের মিস করেন?
না, আমি খুব বেশি মিস করি না। সারা দিন কয়েকবার ভিডিও কলে ওদের সঙ্গে কথা হয়। ওরা কী করছে দেখতে পাই। ইফতারের সময়ও কী করে দেখি, বাবা-মায়ের সঙ্গে ইফতার করে। ওরা টুকটুক করে খায়, ছেলে-ছেলের বউ সেসব দেখায়। এই তো। মিস না করার আরেকটা কারণ হচ্ছে আমি সময়টাকে মেনে নিতে পারি। আমি মনে করি, সময় মেনে নেয়াটা সবচেয়ে বড় সার্থকতা। তাহলে জীবনে কোনো ব্যর্থতা থাকে না। আমি সেটা মেনে নিয়েছি। এখন আমি চাইলেই উড়াল দিতে পারব না। আমার অঢেল টাকা নেই যে চাইলে গেলাম আর এলাম ছেলেদের কাছে। সবকিছু হিসাব করে করতে হবে জীবনে। এখন খামাখা পয়সা নষ্ট করতে গায়ে লাগে। এখন মনে হয় কেন করব, অনেকে তো এটাও করতে পারে না। এখন মনের ভেতরে বিলাসিতা নেই, আগেও ছিল না। কিন্তু কিছুটা উড়নচণ্ডী ছিলাম, যেটা এখন নেই।










