আধুনিক মানুষের বিনোদন কিংবা শিল্পজগতের অন্যতম প্রভাবশালী মাধ্যম সিনেমা। করোনা মহামারীতে গত এক বছর দুনিয়াজুড়েই এ শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এশিয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ইউরোপ এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। করোনার লকডাউন সিনেমা হলের ভবিষ্যৎ এমনকি সিনেমা নির্মাণের পদ্ধতি নিয়েও নানা রকমের ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

দুনিয়াজুড়েই পরিচালক, প্রযোজক, দর্শক, হল মালিকরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। বলা যায়, মহামারী মানুষের জীবন থেকে সিনেমাকে দূরে সরাতে পারেনি। বরং যেকোনো মাধ্যমে টিভি থেকে স্ট্রিমিং সাইটে মানুষ সিনেমা দেখছে। কিন্তু দর্শক সিনেমা হলে গিয়ে প্রিয় তারকার ছবি দেখার অভিজ্ঞতার তুলনা হয় না।

স্টিভেন স্পিলবার্গের পরিচয় নতুন করে দেয়ার কিছু নেই। তিনি জিতেছেন একাডেমি অ্যাওয়ার্ড, আবার ইতিহাসের অনেক সেরা ব্যবসাসফল ছবির নির্মাতাও তিনি। তিনি যেমন দর্শকদের উপহার দিয়েছেন ইন্ডিয়ানা জোনস, জুরাসিক পার্ক, মিউনিখসহ আরো অনেক স্মরণীয় চলচ্চিত্র, তেমনি নিজের ব্যক্তিজীবনেও অন্যদের ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। চলচ্চিত্র তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক অঙ্গ। কৈশোরে ৭০ মিলিমিটারে দেখেছেন লরেন্স অব অ্যারাবিয়া। সম্প্রতি তিনি দি এম্পায়ার ম্যাগাজিনের জন্য তার নিজের সিনেমাপ্রীতি ও অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে একটি ছোট লেখা লিখেছেন। তার মতে, মাহমারী সিনেমাকে যতই চাপে রাখুক না কেন সিনেমা টিকে থাকবে। এম্পায়ার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত স্টিভেন স্পিলবার্গের লেখাটির নির্বাচিত অংশের ভাষান্তর—

বর্তমান স্বাস্থ্য সংকটে বৈশ্বিক মহামারীর কারণে কোথাও সিনেমা হলগুলো বন্ধ, আবার কোথাও দর্শকদের উপস্থিতি একেবারে কমে গেছে। আমি এখনো আশাবাদী এবং নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে পরিস্থিতি নিরাপদ হলেই দর্শকরা সিনেমা হলে ফিরবে। আমি সবসময় কাজ করেছি সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখা সিনেমাপ্রেমীদের জন্য। ঘর ছেড়ে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখা মানে অন্য দর্শকদের সঙ্গে এক ধরনের সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। এখানে সবাই যার যার ঘর ছেড়ে পাশাপাশি আসনে বসে একই বিষয় উপভোগ করে।

সিনেমা হলে আপনি প্রিয়জনকে বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো মানুষকে নিয়ে ছবি দেখেন। আবার কখনো একেবারে অচেনা কারো পাশে বসে পর্দায় দৃশ্য উপভোগ করেন। এটাই সেই জাদু যা আমরা সিনেমা হল, মঞ্চ, কনসার্টে প্রত্যক্ষ করি। আমরা কেউই জানি না আমাদের চারপাশে কারা বসে আছে, কিন্তু যখন সিনেমার কোনো দৃশ্য আমাদের হাসায়, কাঁদায়, উল্লসিত করে কিংবা ভাবায় এবং তারপর আলো জ্বলে ওঠার পর সবাই যার যার আসন ছেড়ে বাইরের বাস্তব দুনিয়ায় বের হয়ে আসি, তখন কিন্তু আমরা আর অপরিচিত মানুষ থাকি না। আমরা ততক্ষণে একটি কমিউনিটিতে পরিণত হই। আমরা সবাই হূদয়ে ও আত্মায় কয়েক ঘণ্টা ধরে একই শক্তিশালী অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিই।

সিনেমা হলে আমরা যে সামান্য সময়টা কাটাই তাতে আমাদের মধ্যকার অনেক বিভক্তি মুছে যায় না, যেমন—বর্ণ, শ্রেণী কিংবা আমাদের রাজনৈতিক বা লৈঙ্গিক ধারণার পার্থক্য। কিন্তু মনে হবে যে আমাদের দেশ এবং পৃথিবী একটু কম বিভক্ত, একটু কম ভঙ্গুর। কারণটা হলো আমরা অপরিচিত অনেকে একই সময়ে হেসেছি, কেঁদেছি, সিট থেকে লাফিয়ে উঠেছি।

শিল্প আমাদের একই সঙ্গে বিশেষ ও সর্বজনীন অবস্থা বিষয়ে সচেতন হতে বলে। এ কারণেই আমাদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারে এমন যত বিষয় আছে সেগুলোর মধ্যে শিল্পের গোষ্ঠীগত অভিজ্ঞতা বা উপভোগের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু নেই।

 

সূত্র: দি এম্পায়ার ম্যাগাজিন