দেশের সংগীতজগতের অন্যতম নাম মাহমুদুল ইসলাম খান। যদিও তিনি বাংলাদেশের জিঙ্গেল কিং (বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত গান) রিপন খান নামেই বেশি পরিচিত। দুই যুগের অধিক সময় ধরে তিনি কাজ করছেন দেশের সংগীতের সঙ্গে। ‘পায়ের ছাপ’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২২-এর শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন তিনি। সংগীত এবং ব্যক্তি জীবনের নানা বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমন দে
অবশেষে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেন। আপনার অনুভূতি জানতে চাচ্ছি?
আসলে কিছু প্রাপ্তির অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। জাতীয় স্বীকৃতি পেয়েছি এটা আমার জন্য অনেক আনন্দের। পুরস্কারপ্রাপ্তির বিষয়ে আমার কখনই কোনো ভাবনা কাজ করেনি। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে আমি মানুষের অনেক ভালোবাসা ও সম্মান পেয়ে আসছি। তবে একটা সময়ে এসে মনে হলো ভালোবেসে যে কাজ করতে গিয়ে জীবনের প্রায় পুরোটা সময় ব্যয় করলাম, আমি কি জাতীয় স্বীকৃতি পাব না? আমি জিঙ্গেলের সঙ্গে যুক্ত আছি দীর্ঘ সময় ধরে। যেহেতু জিঙ্গেলে কোনো অ্যাওয়ার্ড নেই তাই এই ভাবনা আমার মনের মধ্যে উঁকি দিত, সেখান থেকেই আক্ষেপ বাড়ত। পাঁচ বছর ধরেই সেই আক্ষেপ আমাকে ভাবাচ্ছিল। এরপর চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করলাম। ভালো কাজ করলে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাস কাজ করত। আজ আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্তির পর সব শুভানুধ্যায়ী, ভক্তদের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছায় আপ্লুত আমি।
বিগত কয়েক বছরে আপনি বেশকিছু চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন। সঙ্গে মৌলিক গান ও জিঙ্গেল তো আছেই। সব মিলিয়ে কাজের ব্যস্ততা কীভাবে সামাল দেন?
আমার সঙ্গে যারা কাজ করেন তারা জানেন আমি অনেক দ্রুত প্রেশার নিয়ে কাজ করতে পারি। এমন রেকর্ডও আছে আমি একদিনে ১০টা জিঙ্গেল করেছি। তাই কোনো কাজকে আলাদা করে সময় না দিয়ে বরং একসঙ্গে জিঙ্গেলও করছি, আবার সিনেমার গান করছি। আসলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজের মধ্যেই আমি থাকি। কাজের জন্য আমি সময় বের করি। মিউজিক এমন একটা বিষয় যা ভেতরে থাকতে হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে মিউজিক নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে, আবার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভাবতে হবে আমি আগামী দিন গান নিয়ে কী করব। আসলে মিউজিক একটা ধারা, যেটার ভেতরে থাকলে কাজের গতি বেড়ে যায়। যখন আপনি প্রতিনিয়ত কাজ নিয়ে থাকবেন তখন কাজের জন্য অফুরন্ত সময় পাওয়া যায়। স্টুডিওতেই আমার দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে। আড্ডা দেয়া বা বাইরে খুব কম ঘুরতে যাই। আমার বাসায়ই স্টুডিও। তাই বলা যায় আমার জীবনের প্রায় সবটা সময় আমি মিউজিকের সঙ্গে আছি।
আপনি অনেক নতুন সংগীতশিল্পীকে নিয়ে কাজ করেন। নতুন জেনারেশনের শিল্পীদের সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?
নতুন শিল্পীদের অনেকেই ভালো কাজ করছেন। কিছু নতুন ছেলেমেয়ে দিয়ে আমার জিঙ্গেলের কাজ করাচ্ছি। ওদের কাজে আমি অভিভূত। আমি প্রায় সময় সিঙ্গার পরিবর্তন করি। আমি খুব আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করছি, তারা অসম্ভব রকমের ট্যালেন্ট এবং সংগীত সম্পর্কে তাদের ধারণা অনেক ভালো। নিয়মিত শেখা এবং চর্চার কোনো বিকল্প নেই। মাঝখানে আমি নতুন জেনারেশন নিয়ে শঙ্কায় ছিলাম। তবে এটা ভুল ধারণা। তরুণরা অনেক ভালো কাজ করছে এখন।
আপনার দুই ছেলে হৃদয় খান এবং প্রত্যয় খান। তারা দুজনই প্রতিষ্ঠিত। একজন মিউজিশিয়ান হিসেবে। তাদের আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
বাবা হিসেবে তো তাদের কাজ নিয়ে সন্তুষ্টি থাকবেই, সেটা আমারও আছে। আসলে সন্তানদের দোয়া আর আদর ছাড়া কিছু দেয়া যায় না। তবে একজন সংগীত পরিচালক হিসেবে যদি বলি তাহলে আমি বলব ওদের কিছুটা কমতি তো আছেই। প্রত্যয়ের বিষয়ে আমি বলব, ও খুব ট্যালেন্ট। প্রত্যয় আমার সঙ্গে একই স্টুডিওতে কাজ করে। তাই খুব কাছ থেকে ওর কাজ দেখে মনে হয়েছে ভবিষ্যতে ও সংগীত পরিচালক হিসেবে ভালো করবে। আর হৃদয়ের জায়গাটা তো অনেক বড়। সেক্ষেত্রে কাজের মাধ্যমেই ওর জায়গা ধরে রাখতে হবে।
বর্তমানে চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা নিয়ে ব্যস্ততা কেমন?
একটা সরকারি অনুদানের সিনেমার কাজ চলছে। ওই সিনেমায় তিনটা গান হয়ে গেছে, বাকি ডাবিংসহ অন্যান্য কাজ চলছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটা সিনেমা নির্মাণ হচ্ছে, সেটায় একটা গান করেছি। বাকি গানগুলো খুব শিগগির করব। তো এই হলো সিনেমার গানের আপডেট এখনকার।
বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রের সামগ্রিক অবস্থা দেখে আপনার কী মনে হচ্ছে? আমরা কি আন্তর্জাতিক মানের কাজ করছি?
আসলে চলচ্চিত্রে এখন ভালো গান হচ্ছে। আমি দেখছি ইদানীং আমাদের দেশের অনেক সিঙ্গার এবং মিউজিশিয়ান আছেন যারা আন্তর্জাতিক মানের। তরুণরা এখন খুব ভালো গান গাইছে, মিউজিক নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে, অনেক মিউজিশিয়ান তৈরি হচ্ছে। তাছাড়া আমাদের দেশে কিছু ভালো ব্যান্ড আছে, যারা খুব দারুণ মিউজিক করে। সব মিলিয়ে বলব, আমাদের দেশের সংগীত এগিয়ে যাচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে এটা আরো এগিয়ে যাবে এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে।










