মুহাম্মদ কাইউমের প্রথম সিনেমা ‘‌কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’। প্রথম সিনেমা দিয়েই পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ২০২২ সালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পাচ্ছে সিনেমাটি। এছাড়া ‘‌কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’র জন্য শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসেবে পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন তিনি। সিনেমাটির নির্মাণ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন মুহাম্মদ কাইউম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিহা জামান শশী

প্রথম সিনেমা দিয়েই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন। এ অর্জন কীভাবে দেখছেন?

আমাদের সিনেমা দেখে জুড়ি বোর্ড মানসম্পন্ন সিনেমা মনে করেছেন বলে ‘‌কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ সিনেমা হতে পেরেছে। সত্যি নিঃসন্দেহে এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। আমি অনেক বেশি খুশি বিষয়টা নিয়ে। আর আমার সিনেমাটা পুরস্কার পেতে যাচ্ছে, এর মানে এর সঙ্গে যারা জড়িত ছিল সব কলাকুশলী ও স্টাফ, সবার অর্জন এটা। তাই আরো বেশি ভালো লাগা কাজ করছে আমার ভেতরে।

‘‌কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’ সিনেমাটি নির্মাণের জন্য অনুদান পাননি। এরপর সিনেমাটি মুক্তির সময় হল পাচ্ছিলেন না। আর সে সিনেমা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেতে যাচ্ছে...

প্রথমে অনুদানের কথা বলতে গেলে আমি এ সিনেমার জন্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আবেদন করেছিলাম। পরে অনুদান পাইনি। এরপর নিজেদের অর্থায়নেই সিনেমাটা নির্মাণ করি। সেন্সরের পর যখন আমরা সিনেমাটা মুক্তি দিতে যাই, তখন কোনো হল আমাদের সেভাবে স্বাগত জানায়নি। বরং তারা বলেছিলেন, এ সিনেমা চলবে না। যেহেতু প্রচলিত অর্থে তারকা নেই এবং বাণিজ্যিক সিনেমার উপাদান সে অর্থে নেই, তাই দর্শক আমাদের এ সিনেমা দেখবে না। পরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একটি মাত্র হলে আমাদের সিনেমা মুক্তি দিয়েছিলাম। 

সিনেমাটা কি আবারো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেয়ার পরিকল্পনা আছে?

অবশ্যই, আমার তো অনেক ইচ্ছা আছে সিনেমাটা আবার প্রেক্ষাগৃহে আনার জন্য। যাতে করে জনসাধারণ এটা দেখতে পারে। অনেকেই এটা দেখতে চাইছেন। তবে হল মালিকরাও এখনো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। আমার দিক থেকেও সেভাবে আমি এখনো যোগাযোগ করিনি। 

শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন। চিত্রনাট্য লেখার গল্পটা কেমন ছিল?

প্রথমে যখন আমি হাওর অঞ্চলে যাই, তখন সিনেমা বানানো বা চিত্রনাট্য লেখার পরিকল্পনা থেকে যাইনি। আমি ঘুরছিলাম, তখন কিছু বিষয় আমার সামনে আসে। হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের যে সংগ্রাম দারিদ্র্যের সঙ্গে, প্রতিকূলতার সঙ্গে সেটা আমাকে ভাবায়। সে ভাবনা থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিই, এটা নিয়ে সিনেমা লিখব। তখন চিত্রনাট্য আকারে নয় বরং বিভিন্ন বিষয়ে আমি নোট লিখতে থাকি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও যখন আমি সিনেমাটা নির্মাণের পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না, আমি এক প্রকার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। ২০১৭ সালে হাওর অঞ্চলে এক মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। ওই সময় সংবাদগুলো দেখে আমি হাওর অঞ্চলে ছুটে যাই। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, এ গল্প আমি পর্দায় তুলে ধরব। এরপরই আমি চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করি।

‘‌কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’র শুটিং অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? 

আমরা খুব প্রতিকূল পরিবেশে শুটিং করেছি। কারণ আমাদের বাজেট খুব কম ছিল। তাই আমরা খুব বেশি মানুষ শুটিং ইউনিটে যুক্ত করতে পারিনি। আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা খুব বেশি ভালো ছিল না। ভারী কোনো যন্ত্রপাতি আমরা দুর্গম অঞ্চলে নিয়ে যেতে পারিনি। বলা যায়, খুব কম যন্ত্রপাতি দিয়ে কম বাজেটের মধ্যেই সিনেমাটা নির্মাণ করেছি। আমাদের দীর্ঘ দুই বছর ধরে শুটিং করতে হয়েছে। কারণ হাওর অঞ্চলের ঋতুর যে পরিবর্তন সেটা আমরা দর্শককে দেখাতে চেয়েছিলাম। হাওরের মানুষের জীবনযাত্রা নিখুঁতভাবে দেখাতে চেয়েছিলাম বলে শুটিং করা আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল আমাদের জন্য।

ভিন্ন ধারার সিনেমার জন্য আমাদের দেশের দর্শক প্রতিক্রিয়া কেমন?

ভিন্নধারা নয়, আমি বলব যে একটু সিরিয়াসধর্মী, মানসম্পন্ন বিষয়, এমনকি মানুষের জীবন সংগ্রাম, শ্রমজীবী যে মানুষ তাদের নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করলে দর্শক পাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষ যারা সিনেমা দেখতে যান, তারা আসলে বিনোদনের উপকরণগুলো সিনেমায় খোঁজেন। তারকা, গান, অ্যাকশন, ভায়োলেন্সের মতো উপকরণ না পেলে তারা সিনেমা দেখতে চায় না। আর সৃজনশীল সিনেমা দেখার দর্শকের সংখ্যা খুবই কম। সব সিনেমার জন্য আসলে সব দর্শক আসবে, সেটা আশা করা ঠিক নয়। তবে দর্শকের রুচির পরিবর্তন হয়েছে এখন। 

আপনার পরবর্তী সিনেমা নির্মাণ নিয়ে কী ভাবছেন?

হ্যাঁ, আমার ইচ্ছা আছে নতুন সিনেমা নিয়ে কাজ শুরু করার। কবে সিনেমাটার কাজ করব, সেটা এখন বলতে পারছি না। সমাজের অনেক মানুষ আছে, যারা নিজের গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে। কেউ নদী ভাঙার শিকার হয়ে কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর‍্যোগে গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নেন। এসব মানুষের জীবন সংগ্রাম অনেক বেশি। এবার বৃহৎ পরিসরে তাদের চিত্র পর্দায় উপস্থাপন করার ইচ্ছা আছে।

বাংলাদেশের অনেক তরুণ নির্মাতা এখন চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন, যেগুলো বিদেশেও সমাদর পাচ্ছে। দেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

এ সময়ে আমি ক্ষীণ আশার আলো দেখছি। তরুণরা চিরাচরিত ধারার বাইরে গিয়ে সিনেমা নির্মাণ করছেন। সিনেমা নিয়ে এখন আমাদের দেশে পড়াশোনার সুযোগও অনেক বেড়েছে। আমাদের দেশের সিনেমা এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাদৃত হচ্ছে, এটা হচ্ছে মূলত আশার আলো। তবে কিছু সমস্যা থেকেই যাচ্ছে, যার একটি হচ্ছে বাজেট সংকট। সরকারের অনুদান কিংবা স্বাধীনভাবে যারা সিনেমা নির্মাণ করছেন, তারা সিনেমায় লগ্নীকৃত যে অর্থ, সেটা ফেরত আনতে পারছেন না। আর দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে সিনেমা নির্মাণের পর দেখানোর সুযোগ খুবই কম। হল মালিকদের আগ্রহ নেই এ ধরনের সিনেমা দেখানোর। বাজেট ও সিনেমা দেখানোর বিষয়ে সমাধান না হলে এ তরুণ নির্মাতারা কয়েক বছর পরই হতাশ হয়ে পড়বেন। তাই এ সংকট দূর করার উদ্যোগ নেয়া দরকার।