বাংলা সাহিত্যে বহু গোয়েন্দা চরিত্র আছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের নিয়ে সিনেমা, সিরিজ তৈরি করছেন নির্মাতারা। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে জনপ্রিয়ও হচ্ছে খুব। বাংলা সাহিত্যের গোয়েন্দাদের বইয়ের পাতা থেকে চলচ্চিত্রে আসা এবং সেসব চলচ্চিত্র ও চরিত্রদের নিয়ে এ আয়োজন প্রকাশ হবে পাঁচ পর্বে। আজ দ্বিতীয় পর্ব
গোয়েন্দা গল্প থেকে সিনেমা বানানো কোনো নতুন কথা নয়। স্যার কোনান ডয়েলের শার্লকের জনপ্রিয়তা, হিচককের কুশলতায় গোয়েন্দারা রুপালি পর্দায় হাজির হয়েছেন বারবার। হালের বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ অভিনীত শার্লকের তো জয়জয়কার। সে তুলনায় কম হলেও আমাদের দেশেও হয়েছে কিছু গোয়েন্দা সিনেমা, টেলিফিল্ম ও নাটক। পশ্চিমের বাজেটবহুল গোয়েন্দা সিনেমার দিক থেকে যদি দেশের দিকে তাকাই, কেস্টনারের গল্প থেকে আমরাও বানিয়েছি ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’, মুহাম্মদ জাফর ইকবালের গল্প থেকে ‘দিপু নাম্বার টু’। পুরোপুরি ‘গোয়েন্দা গল্প’ না হলেও রহস্য, তদন্ত ও সমাধান নিয়েই এ গল্পগুলো। তবে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ মিলে সবচেয়ে জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র নিঃসন্দেহে একজনই।

যেমনটা আগে বলা হয়েছে, বাংলা সাহিত্যের গোয়েন্দা চরিত্রগুলোর মধ্যে সন্দেহাতীতভাবে সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম ফেলুদা। মানিক বাবুর (সত্যজিৎ রায়ের ডাকনাম) সৃষ্টি এ চরিত্রের মতো জনপ্রিয় কেউ হতে পারেনি এখনো। এ চরিত্রের নির্মাতা নিজেই সিনেমা নির্মাণ করেছিলেন। ফেলুদার দুটো গল্প থেকে সত্যজিৎ রায় সিনেমা তৈরি করেন। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ‘সোনার কেল্লা’ ও ১৯৭৯ সালে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’। সৌমিত্র চ্যাটার্জি অভিনীত সিনেমা দুটি, বিশেষত ‘সোনার কেল্লা’—এখনো তুমুল জনপ্রিয়। সেলুলয়েডে যেভাবে তিনি দৃশ্য চিত্রায়িত করেছেন তা গোয়েন্দা গল্পের সঙ্গে মিলে এক অদ্ভুত রেশ রেখে যায়।
সন্তোষ দত্তর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর নাকি সত্যজিৎ রায় তার জটায়ুর ‘লুক’ বদলে ফেলেছিলেন। প্রথমে তার চিন্তায় জটায়ু ছিলেন মাথাভর্তি চুলওয়ালা একজন স্টাইলিশ লোক। পরবর্তী সময়ে সন্তোষ দত্তকে দেখেই তিনি নতুন করে জটায়ুকে আঁকেন। সন্তোষ দত্তর মৃত্যুর পর আর কাউকে জটায়ু হিসেবে পছন্দ না হওয়ায় সত্যজিৎ আর সিনেমা করেননি ফেলুদাকে নিয়ে। কিন্তু সত্যজিৎপুত্র সন্দীপ রায় এরপর সব্যসাচী চক্রবর্তীকে নিয়ে ফেলুদা করে গেছেন। টালিগঞ্জের যখন মৃতপ্রায় অবস্থা, তখনো তিনি ফেলুদা করেছেন। কয়েকটি করেছেন টেলিফিল্ম হিসেবে।

শুরুটা হয়েছিল ‘বাক্স রহস্য’ দিয়ে। জয় বাবা ফেলুনাথের ১৭ বছর পর ১৯৯৬ সালে মুক্তি পায় এটি। ফেলুদার চরিত্রে সব্যসাচীর পাশে তোপসে হন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় ও জটায়ু চরিত্রে রবি ঘোষ। সিনেমার সঙ্গে সত্যজিৎ রায় যুক্ত ছিলেন। সংগীত তো বরাবরই তার, তবে এ সিনেমার চিত্রনাট্যে সত্যজিৎ রায়ের ভূমিকা ছিল। এরপর সন্দীপ একে একে নির্মাণ করেছেন ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’ (২০০৩), ‘কৈলাসে কেলেঙ্কারি’ (২০০৭), ‘টিনটোরেটোর যীশু’ (২০০৮), ‘গোরস্থানে সাবধান’ (২০১০) ও ‘রয়েল বেঙ্গল রহস্য’ (২০১১)। এর পরও সন্দীপ রায় তিনটি সিনেমা নির্মাণ করেছেন এবং মধ্যবর্তী সময়ে ফেলুদার গল্প থেকে নির্মাণ করেছেন টিভি ড্রামা। তবে সে আলাপে যাওয়ার আগে আরো কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে।
জয় বাবা ফেলুনাথের পর থেকে বাক্স রহস্য পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে সেভাবে গোয়েন্দা গল্প থেকে সিনেমা হয়নি। অন্যতম কারণ সম্ভবত টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা ও দর্শক চাহিদা। আশির দশকে কিছু রাজনৈতিক ও বাকি সব পারিবারিক সিনেমা নির্মাণ হয়েছে। ছিল কমেডিও। তরুণ মজুমদার, তপন সিংহ, বুদ্ধদেব বসু, গৌতম ঘোষ—কেউই গোয়েন্দা গল্পে আগ্রহ দেখাননি। নব্বইয়ের দশকও বাদ। অতঃপর ‘শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের’ আগমন ও কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পুনরুজ্জীবন। ২০০৬-০৭ এর দিকে কিছু পরিচালক এলেন, যারা ব্যবসায়িক সিনেমার বাইরে সিনেমা বানাতে শুরু করলেন। অঞ্জন দত্ত তাদের মধ্যে একজন।
‘পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাং খোঁড়া’ হয়ে যাওয়ার ভয়ে ‘রঞ্জনা আমি আর আসবো না’ বলে গান গাওয়া দত্ত সাহেব একটা অভাবনীয় কাণ্ড করে বসলেন। কয়েকটি সিনেমা বানানোর পর ২০১০ সালে তৈরি করলেন ব্যোমকেশ। এখন পর্যন্ত এ লেখায় ব্যোমকেশ নিয়ে কিছু বলা হয়নি, ইচ্ছা করেই।
ব্যোমকেশ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ও বাংলা সাহিত্যের গোয়েন্দা চরিত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দৃঢ়। কেননা বাংলা সাহিত্য যেগুলো নিয়ে আবর্তিত, তার বেশির ভাগ গল্পেরই ক্রাইম খুব সাদামাটা। বাংলা গোয়েন্দা গল্পের গোয়েন্দারা ‘আদর্শবান ভালো মানুষ’। বলা যায়, অনেকটা টাইপড ক্যারেক্টার তারা। সেখানেই ব্যোমকেশ খানিকটা হলেও আলাদা। তিনি বিবাহিত, সংসার ও সন্তান আছে। বেপরোয়া, সংসারে খানিক অমনোযোগী হলেও কেসের ক্ষেত্রে দায়িত্ববান।
১৯৩৯ সালে প্রথম প্রকাশ হয় ব্যোমকেশের গল্প। কিন্তু সে সময় ধারাটি তুমুল জনপ্রিয় হলেও গোয়েন্দা সাহিত্যকে ‘বটতলার সাহিত্য’ হিসেবে ধরা হতো। এর একটি কারণ হলো উনিশ শতকে লেখা ‘গোয়েন্দা গল্প’র মাঝে অতিনাটকীয়তা এবং বড়লোকের কেচ্ছা কাহিনী বেশি ছিল। পরকীয়া, যৌন ঈর্ষা ছিল অপরাধের নেপথ্য কারণ। বর্ণনাও হতো রগরগে। সাহিত্যের ছিটেফোঁটা নিয়ে কেবল রগরগে বর্ণনা দিয়েই তা চলত। সে কারণেই শরদিন্দু তার চরিত্রকে ‘গোয়েন্দা’ না বলে বলেছেন সত্যান্বেষী।
বাংলা সাহিত্যের এ গোয়েন্দা বেশ অনেকটা সময়ের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলেন ফেলুদার পেছনে। ২০১০ সালে অঞ্চন দত্ত আবীর চ্যাটার্জিকে দিয়ে চমৎকার ফুটিয়ে তুললেন ব্যোমকেশকে। কলকাতা সম্ভবত ততদিনে ব্যোমকেশকে ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু তাকে ভোলা উচিত ছিল না। কেননা সত্যজিতের হাতেই প্রথম পর্দায় হাজির হয়েছিল ব্যোমকেশ। ‘চিড়িয়াখানা’ অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় একই নামে সিনেমা বানিয়েছিলেন ১৯৬৭ সালে—‘সোনার কেল্লা’র সাত বছর আগে। উত্তম কুমার হয়েছিলেন ব্যোমকেশ। শৈল্পিক দিক দিয়ে চমৎকার চ্যালেঞ্জিং গল্পটা সত্যজিৎ ইউটিলাইজ করেছিলেন সর্বোচ্চ। কিন্তু বেশকিছু কারণে সিনেমাটি জনপ্রিয় হয়নি। কেননা সত্যজিৎ যে ম্যাচিওরিটি দিয়েছিলেন ব্যোমকেশকে, তা দর্শকের মনে ধরেনি। আর ব্যোমকেশের চরিত্রায়ণ ও উপস্থাপনায় খোদ শরদিন্দুরও কিছুটা আপত্তি ছিল। সত্যজিতের ব্যোমকেশকে তিনি পছন্দ করতে পারেননি।
এরপর ব্যোমকেশ হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া সে চরিত্রকে অঞ্জন পুনরুজ্জীবিত করেন বললে ভুল হবে না। ‘আদিম রিপু’ গল্প অবলম্বনে প্রথম সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত কলকাতায় সম্ভবত ব্যোমকেশকে নিয়ে সর্বাধিক সিনেমা তৈরি হয়েছে। এখনো হচ্ছে। কিন্তু তার মাঝে থেকে যায় আরো কিছু বিষয়। ব্যোমকেশ এর আগেও জনপ্রিয় হয়েছিল টেলিভিশনে। সে আরেক গল্প।
(তৃতীয় পর্ব আগামী মঙ্গলবার)










