বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত আছে লাখো বাঙালির আত্মত্যাগ। ১৯৭১ সালে নয় মাস যুদ্ধ করার পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। আর দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস নানাভাবে উঠে এসেছে পর্দায়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সিনেমাও তৈরি করেছে নতুন ইতিহাস। এদের মধ্যে আছে ‘ওরা ১১ জন’, ‘জীবন থেকে নেয়া’ ও ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’র মতো সিনেমা। বর্তমান সময়ে নির্মাতারাও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আসছেন তাদের সিনেমায়। চলতি বছরে দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ১২টি সিনেমা।

চলতি বছরে স্বাধীনতার মাস মার্চে মুক্তি পেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চারটি সিনেমা। প্রথম সপ্তাহেই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত দুই সিনেমা ফাখরুল আরেফীন খানের ‘জেকে ১৯৭১’ এবং খিজির হায়াত খানের ‘ওরা ৭ জন’। সিনেমা দুটি দর্শক মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত প্রথম আন্তর্জাতিক সিনেমা জেকে ১৯৭১। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে শরণার্থী শিবিরে ছিল অসংখ্য মানুষ। এর মধ্যে লাখো অসহায় শিশু সে সময় স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের সহায়তা করতে চেয়েছিলেন ফরাসি যুবক জ্যঁ ক্যুয়ে। এজন্য ফ্রান্সের অর্লি বিমানবন্দরে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) একটি বিমান ছিনতাই করেছিলেন তিনি। এ ঘটনাকে ঘিরেই সিনেমাটির গল্প। সিনেমার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পশ্চিমবঙ্গের শুভ্র সৌরভ দাশ। পাইলটের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। অন্যদিকে ভিন্ন ভিন্ন পেশা থেকে আসা সাত বীর মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বগাথা নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘ওরা ৭ জন’। সিনেমাটির মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনের গল্প। এতে অভিনয় করেছেন জাকিয়া বারী মম, ইমতিয়াজ বর্ষণ, খিজির হায়াত খান, নাফিস আহমেদ, ইন্তেখাব দিনার, সাইফ খান, শাহরিয়ার ফেরদৌস সজীব, খালিদ মাহবুব তূর্য। পরের সপ্তাহেই ১০ মার্চ প্রেক্ষাগৃহে আসে পঙ্কজ পালিত পরিচালিত ‘একটি না বলা গল্প’। ১৭ মার্চ মুক্তি পায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপটে তৈরি অনন্য মামুন পরিচালিত ‘রেডিও’। এরপর একে একে মুক্তি পেয়েছে ‘মা’, ‘ফিরে দেখা’, ‘১৯৭১ সেইসব দিন’, ‘মাইক’, ‘দুঃসাহসী খোকা’, ‘আজব ছেলে’ ও ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’। এ সিনেমাগুলোয় নানাভাবে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প।

অন্যদিকে চলতি বছরের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমা ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’। শ্যাম বেনেগাল পরিচালিত সিনেমাটি গত ১৩ অক্টোবর দেশের ১৫৩টি হলে মুক্তি পেয়েছিল। সিনেমাটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শৈশব-কৈশোর থেকে শুরু করে তার ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবন তুলে ধরা হয়েছে। এ সিনেমার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধ। দেশে যুদ্ধ চলাকালীন অনেক ঘটনা উঠে এসেছে এ সিনেমার মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধ-পরবর্তীকাল এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধুসহ সপরিবারের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সিনেমাটি। দেশে মুক্তির পর ভারতে মুক্তি পেয়েও সিনেমাটি প্রশংসা কুড়িয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সিনেমা নির্মাণের এ ধারাবাহিকতা নিয়ে বলতে গিয়ে নির্মাতা খিজির হায়াত খান বলেন, ‘‌এটা খুবই ভালো বিষয় যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ বছর অনেক সিনেমা নির্মাণ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার কথা শুনলেই অনেকেই ভাবেন যে এ সিনেমাগুলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হয়। সরকারের পাশাপাশি যদি প্রাইভেট সেক্টরগুলোও মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণে পাশে থাকত তাহলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরো বেশি কাজ হতে পারত। মুক্তিযুদ্ধ অনেক বড় বিষয় আমাদের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের অনেক না বলা গল্প আছে, যেগুলো এখনো পর্দায় উঠে আসেনি, সেগুলো নিয়ে সামনে আরো সিনেমা নির্মাণ হবে বলে আমি আশা রাখি। আমাদের সাত বীরশ্রেষ্ঠ নিয়ে এখনো সেভাবে কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি। সামনে তাদের গল্প নিয়েও চলচ্চিত্র নির্মাণ হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’ সিনেমা নির্মাণে বাজেট খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণ করতে গেলে বাজেট সংকটের প্রসঙ্গে খিজির হায়াত খান বলেন, ‘হলিউড-বলিউড প্রতি বছর যুদ্ধনির্ভর সিনেমা নির্মাণ করে বড় বাজেট নিয়ে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণ করতে গিয়ে আমাদের দেশের নির্মাতাদের অনেক লড়াই করতে হয়। তাই মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণে আরো বেশি পৃষ্ঠপোষকতার দরকার। তাহলে তরুণ নির্মাতা যারা আছেন তারা নতুনভাবে নতুন প্লটে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নিয়ে আসতে পারবেন।’

বছরজুড়ে একের পর এক সিনেমা মুক্তি পায়। আর এ বছর মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নিয়ে দর্শকের আগ্রহ প্রসঙ্গে ফাখরুল আরেফীন খান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণের সংখ্যা বাড়ছে এখন আরো বেশি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। তবে অনেক সময় দেখছি দর্শক হলে সেভাবে আসছে না। এর পেছনের কারণ কী সেটা এখন খতিয়ে দেখার সময়। আমার মনে হয় মুক্তিযুদ্ধকে আগের মতো প্রচলিত গল্পে বাঁধা যাবে না। নতুন আঙ্গিকে নতুনভাবে এখনকার সময়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণ করতে হবে। যারা আগামী দিনে সিনেমা নির্মাণ করবে তাদের জন্য আমি এটাই বলতে চাই যে নতুনভাবে মুক্তিযুদ্ধকে সামনে আনতে হবে।’

আর কিছুদিন পরই নতুন বছর শুরু হতে যাচ্ছে। নতুন বছরকে সামনে রেখে অনেক নির্মাতাই তাদের সিনেমার ঘোষণা দিচ্ছেন। নতুন বছরের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমাগুলোয় নতুন গল্পে নতুনভাবে মুক্তিযুদ্ধ উপস্থাপন করা হবে এমনটাই প্রত্যাশা দেশের নির্মাতাদের। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতা দরকার বলেও মত দিয়েছেন নির্মাতারা।