মুহাম্মদ কাইউমের প্রথম সিনেমা ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’। এ সিনেমায় তিনি হাওরাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প তুলে ধরেছেন। সম্প্রতি সিনেমাটি ২৮তম কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘ইন্টারন্যাশনাল কমপিটিশন ইনোভেশন ইন মুভিং ইমেজ’ বিভাগে সেরা সিনেমা হিসেবে যৌথভাবে গোল্ডেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার অ্যাওয়ার্ড জিতেছে। নির্মাণ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন মুহাম্মদ কাইউম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিহা জামান শশী
কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছেন। সেখানে গিয়ে কেমন আতিথেয়তা পেয়েছেন?
আমাদের দেশের মানুষের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের বিশেষ আবেগ আছে। কারণ পশ্চিম বাংলার অনেকে রয়েছেন, যাদের পূর্বপুরুষ দেশভাগের সময় আমাদের দেশ থেকে স্থানান্তর হয়েছেন। এছাড়া দুই বাংলার ভাষা আর সংস্কৃতিগত মিলের কারণেও আলাদা একটা টান রয়েছে। আমার সিনেমাটা কলকাতায় যাওয়ার পর দেখেছি, বাংলাদেশ থেকে একটি সিনেমা প্রতিযোগিতা করতে এসেছে, এ নিয়ে তারা উচ্ছ্বসিত। সিনেমাটা দেখার পর তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনাও করেছে, অন্যদের দেখতে বলেছে। ফলে কলকাতার নজরুল তীর্থ-১ মিলনায়তনে কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়ার দ্বিতীয় প্রদর্শনী হাউজফুল ছিল।
সিনেমাটি কি অন্যান্য দেশে মুক্তির কথা ভাবছেন?
এ নিয়ে পরিকল্পনা চলছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক পরিবেশক সংস্থা কন্টিনেন্টাল এন্টারটেইনমেন্ট পিটিই লিমিটেড আমার সিনেমাটি ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশনের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী। এখন প্রতিষ্ঠানটির এশিয়া অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী শ্রেয়সী সেনগুপ্তের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা চলছে, বিস্তারিত এলে জানতে পারবেন।
বাংলাদেশের আকাশে কি আবারো কুড়া পক্ষী দেখানো হবে?
নিশ্চয়ই। আমার দেশের মানুষকে তো সিনেমাটা দেখাতে পারলাম না। ভারতের আগে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে দেখাতে চেয়েছিলাম। সিনেমাটি দুটি হলে দেখাতে পেরেছি, তাও মাত্র এক সপ্তাহ। আশা করছি, আবারো হয়তো দেশের মানুষকে সিনেমাটা দেখাতে পারব।
সিনেমার নাম ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’ কেন?
কুড়া পাখি হাওরাঞ্চলের একটা প্রতীক। কারণ হাওরের জলমগ্ন অঞ্চলেই এর বসবাস। এটা জলমোরগ প্রজাতির একটি পাখি। এটি সাধারণত উঁচু স্থান বা পাহাড়ে-ঝোপে-বনে থাকে। হাওরে পানি শুকিয়ে গেলে, ওখান থেকে খাবার সংগ্রহ করে খায়। আবার পানি বেড়ে গেলে নিরাপদ একটা স্থানে চলে যায়। এ বিষয়ই দেখিয়েছি পর্দায়। সিনেমায় যে ছোট মেয়েটা রয়েছে, সে তার দাদার কাছে শুনেছে, কুড়া পাখি কীভাবে চলে যায় বিপদের দিনে। মেয়েটাও তার শিশুমনের কল্পনায় ভাবে, তারা যদি কুড়া পাখির মতো অন্য কোথাও চলে যেতে পারত, তাহলে জীবনের সংকট থেকে মুক্তি পেত। সিনেমার এ নাম প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করেছি।
হাওরের মানুষের গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণের পেছনের কারণ?
রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম লম্বা একটা সময়। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে তাই আমার কথা হতো। আমাদের সংস্কৃতিটা অনেক সমৃদ্ধ। অথচ আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষ অনেক সংগ্রাম করে টিকে থাকে। তার ঠিকমতো খাদ্যপুষ্টি পায় না। বিষয়টা আমাকে স্পর্শ করত। অন্যদিকে সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবেও আমি দেশের নানা অঞ্চলে গিয়েছি। হাওরে যেতাম, ওই অঞ্চলের মানুষের যে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, তা নিয়ে কথা হতো আমার সঙ্গে তাদের। সেসব দেখতাম আর নোট করে রাখতাম। তবে তখনো আমি ভাবিনি, সিনেমা নির্মাণ করব এ নিয়ে। একবার বর্ষায় হাওরে গিয়ে দেখলাম, নিজেদের ঘর-বাড়ি রক্ষার জন্য তারা বাঁধ নির্মাণ করছে, সবাই মিলে। সে মুহূর্তে ওই মানুষগুলোর লড়াই আমাকে ভাবিয়েছিল আর তখনই ভেবেছি, এমন একটা গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করা যেতে পারে।
প্রথম সিনেমা বাণিজ্যিক ধারার বাইরে গিয়ে নির্মাণের কারণ কী?
দেশ ও সমাজ নিয়ে একেক জনের ভাবনা একেক রকম। অন্যদিকে শিল্পের প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। আমার মনে হয় অনেক সহজেই সিনেমার মাধ্যমে মানুষের কাছে যাওয়া যায়। তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়। ভিজুয়াল মাধ্যমের শক্তি অনেক বেশি। এর আলাদা একটা ভাষা আছে, যেটা সহজে মানুষের কাছে বার্তা দিতে পারে। সিনেমার প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ ছিল। একে অনেক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখি। সিনেমার মধ্য দিয়ে আনন্দের সঙ্গে মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়া যায়। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই কেবল আনন্দের জন্য সিনেমা না করে, শিল্পের মান রেখে জীবনবোধসম্পন্ন সিনেমা নির্মাণের দিকে এখন অনেকেই ঝুঁকছেন। আমিও সে ভাবনা থেকেই এটা করেছি।
নতুন সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা?
কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়ার শেষে একটি পরিবারের নতুন যাত্রা আমরা দেখতে পেয়েছি। নতুন পরিবেশে আসার পর তাদের জীবনসংগ্রামটা কেমন হলো, এ নিয়ে আরেকটা সিনেমা নির্মাণ করতে চাই। এটি নিজস্ব অর্থায়নে করলেও পরবর্তী সিনেমায় আমি অন্যদের অংশগ্রহণও কামনা করি।









