বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মানে বড় একটা পরিবর্তন ঘটেছে। গরমে অর্ধসিদ্ধ হয়ে নোংরা পরিবেশে, ঝাপসা পর্দায়, বাজে সাউন্ড সিস্টেমে চলচ্চিত্র উপভোগ করার পর্যায় পার হয়ে গেছে। পাশাপাশি ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার দরুন ক্রমে রুচির পরিবর্তন ঘটছে। হলিউড, বলিউডসহ সারা বিশ্বের নামিদামি নির্মাতাদের চোখ ধাঁধানো কনটেন্ট এখন হাতের মুঠোয়। মোট কথা, তথ্যপ্রবাহের এ প্রবল জোয়ারে বাঁধ দেয়ার সাধ্য কারো নেই। সুতরাং সে জোয়ারের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে কোয়ালিটি কনটেন্টের বিকল্প নেই। সেখানে রায়হান রাফী পাল্লা দিয়ে দর্শকের আস্থা অনেকটাই অর্জন করে নিয়েছেন। 

নির্মাণের টেকনিক্যাল দিকগুলোয় রাফী বরাবরই মনোযোগী। সেট, ভিজুয়াল, বিজিএমে রাফী এর আগেও মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। সে ধারা অব্যাহত ছিল তুফানেও। তাহসিন রাহমানের ক্যামেরার সঙ্গে দেবজ্যোতি ঘোষের কালার গ্রেডিং একটা চকচকে ভিজুয়াল এক্সপেরিয়েন্স উপহার দিয়েছে। এডিটিং টিমকেও কৃতিত্ব দিতে হয়। ছিল কমার্শিয়াল সিনেমার উপযোগী বিজিএম, তবে এতে বিশেষ কোনো সিগনেচার থাকলে আরেকটু জমে যেত।

উপমহাদেশের সিনেমায় গান একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তুফান এখানেই করেছে বাজিমাত! গানগুলো ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে সিনেমা মুক্তির আগেই। প্রীতম, কনার মতো জনপ্রিয় গায়কদের প্লেব্যাক করা গানগুলো এখন সবার মুখে মুখে। সিনেমায় হাবিব ওয়াহিদের গানের ব্যবহার বেশ ভালো লাগে দর্শকের। মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট টপ নচ। আকাশ সেন কৃতিত্বের দাবিদার। সিনেমায় গানগুলোর টাইমিং ও কোরিওগ্রাফি বেশ উপযোগী।

রাফী চমক রাখতে ভালোবাসেন। ‘উরাধুরা’ গানের দৃশ্যে গায়ক প্রীতমের এন্ট্রি কিংবা পরিচালকের নিজের উপস্থিতি সব জায়গায়ই চমক। 

স্টোরিটেলিংয়েও সে প্রবণতা বজায় ছিল। সিনেমার প্রথম দৃশ্য থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত চমকে দেয়ার প্রচেষ্টা (কখনো কখনো জোর করে করা মনে হলেও) বাণিজ্যিক ছবির পালস ধরে রাখতে রসদ জুগিয়েছে। প্রথমার্ধ কিছুটা ধীর লয়ে শুরু হলেও পরে গতি বাড়তে থাকে। মূলত চরিত্রগুলোর বিল্ডআপের জন্যই এ সময়টুকুর প্রয়োজন ছিল। শান্ত চরিত্রের ক্যারেক্টার বিল্ডআপে যতটা সময় নেয়া হয়েছে, তুফান চরিত্রে ততটা সময় দেয়া হয়নি বলে মনে হয়েছে। একটা দৃশ্যের মাধ্যমে তুফানের তুফান হওয়ার প্রক্রিয়াটা দেখানো হয় শুধু। সে দৃশ্যে কিশোর তুফানের অভিনয় মুগ্ধ করেছে। দ্বিতীয়ার্ধে ফাস্ট ফরোয়ার্ড গতিতে তুফানের অদম্য হয়ে যাওয়ার গল্পটা বলে যাওয়া হয়েছে শুধু, কিন্তু সেখানে ইনটেনসিটির যথেষ্ট অভাব বোধ করেছি। ঘটনাপ্রবাহ ছিল, কিন্তু সেগুলোয় মানবিক অনুভূতির তীব্রতা দুঃখ, রাগ, ঘৃণা ইত্যাদি যথেষ্ট মনে হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধে চঞ্চল চৌধুরী সিনেমার দৃশ্যপটে নিজের শক্ত উপস্থিতির জানান দেন। কুল ব্লাডেড মাস্টার মাইন্ড যিনি নিজেই সিনেমার বাকি অংশের নিয়ন্ত্রক বনে যান।

রায়হান রাফীর আগের সিনেমাগুলোয়ও একটা ব্যাপার লক্ষ করেছি। তিনি লিনিয়ার ওয়েতে গল্প বলতে পছন্দ করেন। ‘পরান’ সিনেমায় যখন অনন্যা আর সিফাতের গল্প বলছিলেন, রোমানকে দেখানো হয়নি। আবার তুফানেও তুফানের গল্প বলার ধরন ওয়ান ডাইমেনশনাল। বিশাল ক্যানভাসের একটা সিনেমায় সমান্তরালভাবে অন্য পাশে কী হচ্ছে দেখানোটা জরুরি মনে হয়। 

তুফানের গল্প নিয়ে টিজার প্রকাশের পর যে ধারণাটি দানা বেঁধেছিল, দেখা গেল যে সে ধারণা ভুল। তবে এ কথা ঠিক যে তুফান নকল গল্পের ছবি না হলেও পুরোপুরি মৌলিকও নয়। একই বিষয়বস্তু ও গল্পের আঙ্গিকের  সিনেমা পার্শ্ববর্তী দেশে অনেক নির্মাণ হয়েছে। 

সুপারস্টার শাকিব খান ঠিক সুপারস্টারসুলভ অভিনয়ই করেছেন। শান্ত ও তুফান দুই চরিত্রেই আলাদা বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছেন। তুফান চরিত্রে শাকিব খানের লুক, অভিব্যক্তি চমকপ্রদ।

চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় দেখে বিস্মিত হতে হয়। শুধু তার অভিনয়ই অন্য আর দশটা সিনেমার সঙ্গে তুফানের পার্থক্য গড়ে দিতে সক্ষম। অভিনয়ের পরিমিতিবোধ, কমিক টাইমিং, সাসপেন্স সবকিছুই দুর্দান্তভাবে সামলেছেন। সিনেমায় অনেকদিন পর নাবিলাকে দেখে ভালো লেগেছে। শান্ত চরিত্রের সঙ্গে মানানসই অভিনয় করেছেন। মিমি চক্রবর্তীর গ্ল্যামার ও অভিনয় দুটোই প্রভাব রেখেছে সিনেমায়। শহীদুজ্জামান সেলিম, মিশা সওদাগর, ফজলুর রহমান বাবু, গাজী রাকায়েতের উপস্থিতি সিনেমার কলেবর নিঃসন্দেহে বাড়িয়ে দিয়েছে। 

তুফান বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে। একটা সিনেমাকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করার জন্য যা যা দরকার রায়হান রাফী তার সব দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছেন তুফানকে। স্টারডম, অ্যাকশন, গ্ল্যামার, রোমান্স, গান সবকিছু জড়ো করেছেন এক জায়গায়। যেগুলোকে বলা হয় বাণিজ্যিক সিনেমার মাসালা। সব মিলিয়ে তুফান একটি বিশাল কলেবরের সিনেমা, যেখানে মাস এন্টারটেইনমেন্টের জন্য অধিকাংশ উপাদানই আছে। যদিও সিনেমা দেখা শেষ হলে মনে হয় কী যেন নেই! অনেক দিন মনে রাখার মতো কোনো গল্প নেই, তুফান ক্যারেক্টারের ইনটেনসিটি নেই।

তবু আশাবাদী ‘তুফান ২’ নিয়ে। রায়হান রাফী এমন একজন ডিরেক্টর, সিনেমাকে হিট করার সব মেকানিজমই যার জানা। বাদবাকি খামতিটুকু  মিটিয়ে  আগামীতে হয়তো মাস্টার মেকার রূপে  আবির্ভূত হওয়ার পালা।