চলচ্চিত্র নিয়ে কমল হাসানের বসবাস দীর্ঘদিন ধরেই। শুরুটা দক্ষিণী সিনেমা দিয়ে হলেও পরবর্তী সময়ে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন বলিউডেও। তবে হিন্দি ভাষার সিনেমায় পা রাখার প্রথম গল্পটা স্বাভাবিক ছিল না তার। সম্প্রতি সে গল্প উন্মোচন হয়েছে হারপার কলিন্স থেকে বের হওয়া তার জীবনীগ্রন্থ ‘কমল হাসান— আ সিনেমাটিক জার্নি’-তে।
কমল হাসান অভিনীত প্রথম হিন্দি সিনেমার নাম ‘এক দুজে কে লিয়ে’। পরিচালক কে. বলচান্দের সিনেমাটি নির্মাণ হয় তেলেগু ভাষায় নির্মিত তারই সিনেমা ‘মারো চরিত্র’ অবলম্বনে। ১৯৮১ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন কমল হাসান ও রতি অগ্নিহোত্রী। এর ঘটনা আবর্তন হয়েছে প্রেমিক ও প্রেমিকা এবং তাদের মধ্যকার ভাষিক পার্থক্যকে ঘিরে। বলচান্দ সব ধরনের প্রচেষ্টাই করেছিলেন, যেন সিনেমাটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়। প্রযোজক ও দর্শক উভয়কেই খুশি করার জন্য মুখিয়ে ছিলেন তিনি।
সব কাজ শেষ হয় মাদ্রাজে। বোম্বেতে প্রাথমিকভাবে দেখা হয়, কিন্তু তার ফলাফল দাঁড়ায় ভয়াবহ। প্রায় সবাই নারাজ হয়ে পড়ে সিনেমাটি নিয়ে প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে। এমনকি প্রস্তাব ওঠে মুক্তি না দেয়ার ব্যাপারেও। কিন্তু আশির কোঠায় থাকা কিংবদন্তি প্রযোজক ও পরিচালক এলভি প্রসাদ বুঝেছিলেন বিষয়টি। তিনি এত সহজে হাল ছাড়তে নারাজ। তিনি কমলকে তলব করেন। কমলও তার ডাকে সোজা বোম্বে চলে যান। সেখান থেকে এক দুজে কে লিয়ে সিনেমার ১৪টি রিলসহ তারা এক পরিবেশকের সঙ্গে দেখা করেন। সে পরিবেশক এসেছিলেন দিল্লি থেকে। তাকে দেখানো হবে সিনেমাটি, তারপর নেবেন সিদ্ধান্ত। এলভি প্রসাদ তার সঙ্গে কমলের পরিচয় করিয়ে দিলেন। প্রথম রিল শুরু হতেই প্রসাদ এক অজুহাতে চলে গেলেন। কমলকে পরামর্শ দিয়ে গেলেন বিরতির সময় যেন অতিথির সঙ্গে হালকা নাশতা করেন। পরিবেশকের পাশে চুপচাপ বসে রইলেন কমল হাসান। খুব একটা কথা হলো না। কিন্তু পঞ্চম রিল পর্যন্ত পৌঁছতে না পৌঁছতেই খেয়াল করলেন পরিবেশক ঘুমিয়ে গেছেন।
কয়েক দফা এমন প্রদর্শনের পর অনেকটা হতাশ হয়ে পড়েন কমল হাসান। ফিরে আসেন মাদ্রাজ। বোম্বেতে কারো মনোযোগ টানতে ব্যর্থ হয়ে প্রসাদ সে সময় দেখা করেন হিন্দি সিনেমার খ্যাতিমান পরিবেশক ও তার বন্ধু গুলশান রায়ের সঙ্গে। তাকে অনুরোধ করেন, যেন তার প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে সিনেমাটিকে মুক্তি দেয়া হয়। গুলশান সম্মত হন। খুব অল্প পরিসরে রক্সি নামের এক প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয় সিনেমাটি। প্রতি শোর আগে প্রসাদ সামনে বসে থাকতেন মানুষের প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য। সিনেমা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শক চোখের পানি মুছতে মুছতে বের হচ্ছে। কারো কণ্ঠে ছিল কষ্ট, ‘পৃথিবী বড় নিষ্ঠুর’।
প্রসাদ বুঝতে পারলেন দর্শক সিনেমাটিকে পুরোদস্তুর ট্র্যাজেডি হিসেবে নিয়েছে। হিন্দি ও তামিল দর্শকও সমানভাবে আপ্লুত ছিল। তিনি দ্রুত তার পুত্র রমেশ প্রসাদকে ফোন দিলেন। নির্দেশনা দিলেন আরো ৪০টি প্রিন্ট ভারতের বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দিতে। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি এক দুজে কে লিয়ে সিনেমার জন্য।
সিনেমাটি ৫৫ সপ্তাহ ধরে চলেছিল। কমল হাসান আরো একবার বোম্বে যান, তবে এবার সিনেমার সাফল্য উদযাপন করার জন্য। ব্যর্থ নয়, কমল হাসান এখন সুপারস্টার। প্রসাদ ও বলচান্দের পাশে বসেছিলেন তিনি। পরবর্তী সময় এ সিনেমার জন্যই এসপি বালাসুব্রামানিয়াম পান জাতীয় পুরস্কার।
দক্ষিণের তারকার এ সফলতা পরবর্তী চলচ্চিত্রের বাঁকবদলে ভূমিকা রেখেছে। হিন্দিভাষী অঞ্চলে দক্ষিণের সংস্কৃতি ও উচ্চারণ গ্রহণযোগ্য মাত্রা পেতে শুরু করেছে। সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া ক্রমে আরো গভীর হতে শুরু করল। চেন্নাই থেকে এআর রহমান এলেন বলিউডে। বলিউড থেকে দক্ষিণে গেলেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে ও উদিত নারায়ণ। দক্ষিণের নায়ক-নায়িকারাও হিন্দি সিনেমায় নাম লেখাতে শুরু করলেন।
সূত্র: স্ক্রল ডট ইন










