জনপ্রিয় ধারায় তাকে নিয়ে আলোচনা হয় কম। কিন্তু লোকসংগীতে তার অবদান কম নয়। অনেকটা নিভৃতেই চলে গেলেন লোকশিল্পী সুষমা দাশ। গতকাল সিলেট শহরে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। তার প্রয়াণের সঙ্গে হয়তো হারিয়ে গেল কিছু গানও। কেননা সুষমা দাশ আড়াই হাজারের বেশি লোকগান জানতেন। এর অনেক গানই তিনি লিখে রাখেননি। গানগুলো মুখস্থ ছিল তার।
বাংলা লোকসংগীতের অন্যতম প্রধান শিল্পী সুষমা দাশ। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে জন্ম তার। সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার শাল্লা থানার পুটকা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিকভাবেই সংগীতের সঙ্গে তার পরিচয়। সুষমা দাশের পিতা প্রখ্যাত লোককবি রসিকলাল দাশ। তার মা দিব্যময়ী দাশও সংগীত রচয়িতা। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সুষমা দাশ সবার বড়। তার আপন ছোট ভাই প্রয়াত পণ্ডিত রাম কানাই দাশও সংগীতে অবদান রেখে একুশে পদক পেয়েছিলেন।
বাবা ছিলেন সুষমা দাশের সংগীতের ওস্তাদ। বাড়িতেই সংগীত সাধনা শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হন তিনি। এর পর থেকে নিয়মিত সেখানে গান পরিবেশন করেছেন। তার স্বামী প্রাণনাথ দাশের বাড়ি সুনামগঞ্জের শাল্লার চাকুরা গ্রামে। ১৯৮৮ সালে প্রাণনাথের সঙ্গে সিলেট শহরে আসেন। সেখানেই বসবাস শুরু করেন।
পিতামহ-পিতামহী, মা-বাবাসহ অনেকের কাছ থেকে লোকগান শিখেছেন সুষমা। তার গাওয়া ও জানা কিছু গান আড়াইশ বছরেরও পুরনো। কোনোটির গীতিকবির নামও অজানা। চণ্ডীদাস থেকে শুরু করে সৈয়দ শাহনূর, দীন ভবানন্দ, শিতালং শাহ, রাধারমণ, কালা শাহ, আজিম ফকির, অধর চান্দ, লুচন দাশ, রূপমঞ্জুরি, শ্যাম সুন্দর, ব্রজনাথ, শ্রীরুক্ষিণী, রামজয় সরকার, হরিচরণ সরকার, দুর্গাপ্রসাদ, রসিকলাল দাশ, মধুসূদন, কামাল উদ্দিন, শাহ আবদুল করিম, দুর্বিন শাহ, গিয়াসউদ্দিন আহমদ প্রমুখের গান করেন তিনি। সেসবের মধ্যে আছে কীর্তন, সূর্যব্রত, ধামাইল, গোষ্ঠ, সুবল মিলন, পালা, হোলিগান, পদ্মপুরাণ, বাউলা, সন্ন্যাস, বটকিরা ও কবিগান।
হাওরে ও সংগীতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পরিবারে জন্ম হওয়ায় সুষমার জীবনই ছিল সংগীতময়। তার কোনো গানের খাতা ছিল না। বেশি বয়সে গিয়ে মাঝে মাঝে ভুল হলেও তিনি মুখস্থই গাইতেন। বেতার, টেলিভিশন, স্থানীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি করোনার সময় তিনি ফেসবুক লাইভেও গেয়েছেন। সে সময়ও তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন আবারো সবার সামনে গাইবেন।
সুষমা দাশ চলে গেলেন। তার সঙ্গে হয়তো চলে যাবে কিছু গানও। তবে তার গাওয়া ২২৯টি প্রাচীন গান, জীবনী ও সাক্ষাৎকার নিয়ে বই করেছেন আলিমুল রাজা চৌধুরী। বইয়ের নাম ‘সুষমা দাশ ও প্রাচীন লোকগীতি’। তার কিছু গান অন্তত তাই থেকে যাবে।
সংগীত ও লোকসংগীতে অবদানের জন্য সুষমা দাশ বেশকিছু স্বীকৃতি পেয়েছেন। এর মধ্যে আছে কলকাতা ‘বাউল ফকির উৎসব’ সম্মাননা। ২০২৫ সালে জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা পান। ২০১৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া ২০১৯ সালে পেয়েছিলেন রবীন্দ্র পদক।










