নায়ক লড়বেন সমন্বিত খারাপ শক্তির বিরুদ্ধে—বহুকাল ধরে বাণিজ্যিক সিনেমার এটাই গল্প। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এ গল্পই দেখানো হয়েছে বারবার। এর মধ্যে দক্ষিণ ভারতে তামিল ও তেলেগু সিনেমা ‘এক কাঠি সরেস’। তাদের নায়ক রীতিমতো সর্বশক্তিমান। একাই লড়েন একশ জনের বিরুদ্ধে। যুক্তি, বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে তাদের সিনেমা ও নায়করা। তবে বছর দশেক হয় তামিল ও তেলেগু সিনেমায় উন্নত গল্প পাওয়া যাচ্ছিল। ‘বাহুবলী’, ‘কেজিএফ’-এ ধারার সিনেমা হলেও তাতে নিরেট ও জটিল গল্প ছিল। ব্যবসাসফল হয়েছে, সমালোচকদের কাছেও প্রশংসা পেয়েছে। কিন্তু এবার সে ধারায় আটকে গেছে দক্ষিণের সিনেমা। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া জুনিয়র এনটিআর অভিনীত ‘দেবারা’।

দেবারা (তেলেগু উচ্চারণে দেব্‌রা) শব্দটির অনুবাদ করতে গেলে লৌকিক দেবতা বলা যায়। কোনো জনপদে পৌরাণিকের পাশাপাশি মিথ হয়ে থাকে অনেক দেবতা, এ সিনেমার দেবারা সে রকমই একজন। সমুদ্র তীরের চারটি গ্রামের মধ্যে এক গ্রামের নেতা সে। চার গ্রামের মানুষের পেশা সমুদ্রে চলমান জাহাজ থেকে মাল চুরি করে আনা। শহরের কোনো এক চোরাকারবারি তাদের এ কাজের ঠিকাদার। সাহায্য করে স্থানীয় পুলিশ অফিসার। কিন্তু চার গ্রামের অতীত ইতিহাস চোরাকারবারের সহযোগিতার নয়। এদের পূর্বপুরুষ যুদ্ধ করেছিল বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে। তারা নিজেদের ভূমি ও সমুদ্রসীমা মুক্ত রেখেছিল শত্রুর হাত থেকে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় অনেকেই ভুলে গেছে তা। ভুলেনি শুধু দেবারা। তাই ভৈরার সঙ্গে তার বিরোধ হয়।

সিনেমার গল্প অনেকটাই লিনিয়ার ন্যারেটিভে। পুলিশ অফিসার শিবম খুঁজে ইয়েতিকে। সে উদ্দেশ্যে লাল সমুদ্রে যায়। সেখানে ডিএসপি তুলসী ও পরে ভৈরার সঙ্গে দেখা করে। এরপর সিংগাপ্পার কাছে শোনে পর্বতের পুরনো গল্প। সেখানেই থাকে দেবারার গল্প, যা এরই মধ্যে বলা হয়েছে। দক্ষিণের সিনেমার সে চর্বিতচর্বণ আবারো শোনালেন কোরাতলা শিবা।

সিনেমার শুরুটাই দ্বিধান্বিত। মন্ত্রীর ব্রিফিংয়ে টাস্ক ফোর্স চিফ শিবমকে মোটেও কনফিডেন্ট মনে হয়নি। তুলসীর সঙ্গে তার কথোপকথন লাউড। একই ঘটনা ঘটে ভৈরার সঙ্গে দেখা হওয়ার দৃশ্যে। অজয় ভালো অভিনেতা হলেও নিজের চরিত্রে প্রবেশ করতে পারেননি। এদিকে ইন্ট্রোডাকশন সিনে ভৈরা চরিত্রে সাইফ আলী খান নজর কাড়েন এবং সিনেমার বাকি অংশেও মনোযোগ ধরে রাখেন। কিন্তু বিষয়টা দেবারার মধ্যে দেখা যায় না।

জুনিয়র এনটিআর সবসময়ই তামিল, তেলেগু সিনেমার ফর্মুলা হিরো ছিলেন। ‘আরআরআর’ সিনেমায় রাজামৌলি তাকে খুব একটা ভিন্ন চরিত্র দেননি। কিন্তু পিআর ক্যাম্পেইনে তিনি আরআরআরে রাম চরণের চেয়েও বেশি ফুটেজ পেয়েছেন। মনে হয়েছিল সে জোরেই দেবারা উতরে যাবে। কিন্তু যায়নি। সিনেমায় দেবারার ইন্ট্রোডাকশন সিন থেকেই জুনিয়র এনটিআরকেও বিভ্রান্ত বা কিছুটা লো মনে হয়। জাহাজ থেকে মাল খালাস করার দৃশ্যটি দীর্ঘ এবং সেখানে সংলাপের অভাব ছিল। দেবারার মুখভঙ্গি ও শরীরী ভাষার মাধ্যমে এখানে অনেক কিছু ফুটিয়ে তোলার ছিল। কিন্তু সাইফের সামনে পাত্তাই পাননি জুনিয়র এনটিআর। এর পরের অংশেও একই অবস্থা।

সিনেমাটোগ্রাফির ক্ষেত্রে বলতে হয়, আর রত্নভেল বেশ চেষ্টা করেছেন। পাহাড়, সমুদ্র, সেখানকার মানুষ নিয়ে আয়োজনটা ভালো ছিল। সেট নির্মাণ ভালো, কিন্তু সমুদ্রের ওই গ্রামে যে বাজার দেখানো হয়েছে শহুরে বাজারের আদলে এমন বাজার থাকার কথা নয়। এমনকি দেবারার ছেলে ভারার পোশাকের ক্ষেত্রেও রঙচঙা শার্ট হাওয়াই দ্বীপের ট্যুরিস্টদের কথা মনে করায়।

দেবারার সঙ্গে দর্শক সহজেই মিল খুঁজে পাবেন ‘বাহুবলী’, ‘কেজিএফ’, ‘কানতারা’ ও ‘পুষ্পা’র। বাহুবলীতে একটা দীর্ঘ সময় অমরেন্দ্র বাহুবলীর গল্প বলে কাটাপ্পা। এখানে শিবমকে দেবারার গল্প শোনায় সিংগাপ্পা। এ চরিত্রে প্রকাশ রাজের মতো অভিনেতা চোখ বড় করে রাখা ছাড়া কিছুই করলেন না বা পরিচালক তাকে দিয়ে করাননি। এদিকে দেবারার মৃত্যুর দৃশ্যতে বাহুবলীর মতোই একটা প্রশ্ন রেখে দেয়া।

কানতারার সঙ্গে মিলটা মূলত গ্রামের সেটআপ, সেখানে দেবারার পরিচিতির মতো। একটা সময় সেও কানতারার ‘দেইব’-এর মতো একটা মিথে পরিণত হয়। কেজিএফের সঙ্গে মিল মূলত জনতার মাসিহা ও ভীতি হয়ে ওঠার মধ্যে। এটা অবশ্য উপমহাদেশের সিনেমার অন্যতম অনুষঙ্গ। আর পুষ্পার সঙ্গে মিল পাওয়া যাবে ভারা ও থাঙ্গামের প্রেমের পুরো অংশটিতে। পুষ্পা আর শ্রীবল্লি যেন ফিরে এসেছে এ সিনেমায়। জাহ্নবী কাপুরের কোনো প্রয়োজনই ছিল না গল্পে। তাকে আনা হয়েছে কেবল দুটো গান ও উদর প্রদর্শনের জন্য। এর চেয়ে দেবারার স্ত্রীর চরিত্রটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

একাধিক সিনেমার ব্লেন্ড এ সিনেমাকে কোথাও নিয়ে যেতে পারে না। তার চেয়ে মজার ব্যাপার হলো সিনেমার শুরু হয়েছিল শিবমের ইয়েতি (কোনো এক সন্ত্রাসী) খোঁজার মধ্য দিয়ে। ওটাই ছিল তার মিশন। কিন্তু প্রথম ১০ মিনিটের পর সিনেমা শেষ হওয়া পর্যন্ত এ নাম আর উচ্চারণ হয়নি। সিনেমা কেবল দেবারার বীরত্বেই থেকে গেছে। কিন্তু জুনিয়র এনটিআরের দুই চরিত্রের কোনোটিতেই সে বীরত্বে দর্শক রোমাঞ্চিত হন না।