ব্যোমকেশের প্রচুর জনপ্রিয়তার পর শরদিন্দুকে খুঁচিয়ে বের করা হয় বইয়ের পাতা থেকে। ভদ্রলোক প্রচুর গল্প লিখেছেন। তার মধ্যে অনেক গল্পই চিত্তাকর্ষক। ফলে স্ক্রিপ্ট তৈরি হতেও সময় লাগে না। ব্যোমকেশ ছাড়াও তার গল্প থেকে সিনেমা হয়েছে অনেক আগেই। অ্যান্টনি হোপের ‘দ্য প্রিজনার অব জেন্ডা’র আদলে লেখা শরদিন্দুর ‘ঝিন্দের বন্দী’ থেকে সিনেমা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। পরিচালক তপন সিংহ। গোয়েন্দা না হলেও ক্রাইম স্টোরি বলা যায়। তবে আমাদের আলোচনার কেন্দ্র মূলত ডিটেকটিভ স্টোরি আর সেক্ষেত্রে স্পটলাইট অবশ্যই ব্যোমকেশে।
অঞ্জন দত্ত শুরু করেছিলেন নতুন করে। এরপর হিড়িক লাগে ব্যোমকেশ নির্মাণে। অঞ্জন ছাড়াও বিক্রম শীল ও আরো কয়েকজন পরিচালক ব্যোমকেশকে নিয়ে সিনেমা তৈরি করেছেন। বাদ যাননি ঋতুপর্ণ ঘোষও। ‘কাহানি’র পরিচালক, সুজয় ঘোষকে ব্যোমকেশ বানিয়ে ‘চোরাবালি’ গল্প থেকে তিনি তৈরি করলেন ‘সত্যান্বেষী’ (২০১৩)। ব্যোমকেশকে যেভাবে শরদিন্দু এঁকেছিলেন সে তুলনায় অনেক ভিন্ন ছিল ঋতুপর্ণের উপস্থাপনা। সুজয়ের ব্যোমকেশ আত্মবিশ্বাসী হলেও তিনি শরদিন্দুর ব্যোমকেশের মতো সোজাসাপ্টা নয়, অনেক বেশি কাব্যিক, যেমনটা ঋতুপর্ণের চরিত্ররা হন।

চলচ্চিত্রে ব্যোমকেশের বিবর্তন হয়েছে অনেক। শরদিন্দুর ব্যোমকেশ ছিল বাঙালি মধ্যবিত্ত চরিত্রের প্রতিনিধি। সে গোয়েন্দা হয়েও গোয়েন্দা শব্দটিকে আপন করে নিতে পারে না, হয়ে যায় সত্যান্বেষী। তদন্ত করতে গিয়ে প্রেমে পড়ে, তবে শরদিন্দু তাকে শার্লক হয়ে আইরিনের প্রেমে পড়তে দেন না—সত্যবতীও আইরিন নন—একেবারে বিয়ে করিয়ে দেন। তারপর ব্যোমকেশ আত্মবিশ্বাসী, বিবেচক, বুদ্ধিমান গোয়েন্দা হলেও সংসারী। তাকে নিয়মিত ছুটিতে যেতে হয় স্ত্রীকে নিয়ে, বাজারের খবর রাখতে হয়। এমনকি গাড়ি কেনার চিন্তাও করতে হয়। কিন্তু চলচ্চিত্রের ব্যোমকেশ তেমন নন। তিনি অনেক বেশি ‘ব্যাডঅ্যাস’।
আধুনিক এ ব্যাডঅ্যাস বৈশিষ্ট্য ব্যোমকেশকে দিয়েছেন অঞ্জন দত্ত। প্রথম সিনেমাটি থেকেই ব্যোমকেশের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্য আছে। দিনে দিনে তা কমেনি। আবির চ্যাটার্জিকে নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন তিনটি সিনেমা—‘ব্যোমকেশ বক্সী’ (২০১০), ‘আবার ব্যোমকেশ’ (২০১২) ও ‘ব্যোমকেশ ফিরে এলো’ (২০১৩)। লেখকের ব্যক্তিগত মত, এ তিন সিনেমায় ব্যোমকেশ সবচেয়ে দারুণ। তবে এ ব্যোমকেশও শরদিন্দুর নয়, অঞ্জনের। এর পেছনে অন্যতম অবদান সত্যজিতের।

সত্যজিৎ রায়ের ব্যোমকেশ শরদিন্দুর পছন্দ হয়নি নানা কারণে। তিনি সরাসরিই ব্যোমকেশকে চশমা পরানোর বিরোধী ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এরপর যারাই সিনেমা বানাবে, তারাই ব্যোমকেশকে চশমা পরাবে। বাস্তবিক সেটাই হয়েছিল। অঞ্জন দত্তের আবির-ব্যোমকেশ চশমা পরেন। তার যিশু-ব্যোমকেশও [যিশু সেনগুপ্তকে ব্যোমকেশ চরিত্রে রেখে নির্মাণ করেছেন ‘ব্যোমকেশ বক্সী’ (২০১৫), ‘ব্যোমকেশ ও চিড়িয়াখানা’ (২০১৫), ‘ব্যোমকেশ ও অগ্নিবান’ (২০১৭)] চশমা পরে। চলচ্চিত্র হিসেবে অঞ্জনের প্রথম তিনটির মান পরের তিনটিতে নেই।
ব্যোমকেশকে রীতিমতো ‘ক্যাশ করা’ টালিগঞ্জের একটা বদ অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। কেননা অঞ্জন দত্তের সঙ্গে আবির চ্যাটার্জির কোনো কারণে পড়তা না হওয়ায় তিনি যিশুকে নিয়ে ব্যোমকেশ করলেন এবং একই সময় অরিন্দম শীল আবিরকে নিয়ে নির্মাণ করলেন ‘হর হর ব্যোমকেশ’ (২০১৫), ‘ব্যোমকেশ পর্ব’ (২০১৬), ‘ব্যোমকেশ গোত্র’ (২০১৮) ও ‘ব্যোমকেশ হত্যামঞ্চ’ (২০২২)। এর মধ্যে প্রথম তিনটি থিয়েটারে এলেও শেষটি নির্মিত হয় ওটিটির (হইচই) জন্য। শরদিন্দু তার ব্যোমকেশকে পারিবারিক আবহে আঁকলেও সেখানে সত্যবতীর সঙ্গে তার পারফেক্ট দাম্পত্যের চিত্র আছেন যা বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের সম্পদ। অরিন্দমের ব্যোমকেশকে তিনি ইমরান হাশমি গোত্রের প্রেমিক পুরুষ দেখিয়েছেন। ব্যোমকেশের রীতিমতো চরিত্রই বদলে দেন তিনি।

এত সিনেমার মধ্যে একটা সিনেমা চাপা পড়ে গেছে নানা কারণে। সম্ভবত সিনেমার ক্ষেত্রে এটিকে ব্যোমকেশের সেরা বললে ভুল হবে না। সুশান্ত সিং রাজপুতকে ব্যোমকেশ চরিত্রে রেখে তিনি ২০১৫ সালে নির্মাণ করেন ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’। ব্যোমকেশের মোটামুটি তিনটি গল্প ব্লেন্ড করে তিনি এ সিনেমা নির্মাণ করেন। কিন্তু এখানে ব্যোমকেশ ভালনারেবল। অঞ্জনের ব্যোমকেশের মতো সে ব্যাডঅ্যাস নয়। শরদিন্দুর ব্যোমকেশের মতো আত্মবিশ্বাসীও নয়। কিন্তু যুদ্ধের পটভূমি, চিনেপাড়া, চোরাকারবারি মিলিয়ে সিনেমাটি ছিল দারুণ। ডা. অনুকুল গুহ চরিত্রে খলনায়ক ছিলেন নিরাজ কবি। ব্যোমকেশের সিনেমা এমন চমৎকার খল চরিত্র আর পায়নি। মরিয়ার্টির ভূত হয়ে উঠেছিলেন যেন তিনি। কিন্তু গল্পটা দর্শক নিতে পারেনি সে সময়।
ব্যোমকেশ নিয়ে একের পর এক নির্মাণ হয়েছে সিনেমা ও টিভি সিরিজ। ‘ইটিভি’তে হয়েছে এক বিশাল সিরিয়াল। সেখানে ব্যোমকেশ হয়েছেন সব্যসাচী চক্রবর্তীর পুত্র গৌরব চক্রবর্তী। ২০১৪-১৬ সালের মধ্যে ১৩৬টি এপিসোড নির্মাণ হয়েছিল। এছাড়া অরো টিভি সিরিজ হয়েছিল, যেখানে ব্যোমকেশ চরিত্রে অভিনয় করেছেন সপ্তর্ষি রায় ও শুভ্রজিৎ দত্ত। সিনেমার ক্ষেত্রে চিড়িয়াখানার পর ১৯৭৪ সালে মঞ্জু দে নির্মাণ করেছিলেন ‘সজারুর কাঁটা’। ব্যোমকেশ হয়েছিলেন শ্যামল ঘোষাল। একই গল্প থেকে ২০১৫ সালে শৈবাল মিত্রের নির্মাণে ব্যোমকেশ হয়েছিলেন ধৃতিমান চ্যাটার্জি।

বর্তমানে এ চরিত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় সম্ভবত অনির্বাণ ভট্টাচার্য। হইচই তাকে ব্যোমকেশ চরিত্রে রেখে নির্মাণ করেছে সিরিজটি। দুই পর্ব করে একেকটি গল্প নির্মাণ করা হয়েছে। ক্যামেরার কাজ, সেট নির্মাণ ও আলোর ব্যবহারে সিরিজটি অসাধারণ একটি দৃষ্টান্ত। এরপর সে চরিত্র ও মোটামুটি সেটআপ ধরেই সৃজিত মুখার্জি গত বছর নির্মাণ করেছেন দুর্গ রহস্য। একই বছর বিরসা দাশগুপ্তর পরিচালনায় দেবও হয়েছেন ব্যোমকেশ। ২০১৯ সালে দুটো গল্পের ব্লেন্ড নিয়ে সায়ন্তন ঘোষালের ‘সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ’ সিনেমায় ব্যোমকেশ হন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।
এ সবের আড়ালে পড়ে গেছে এক ক্ল্যাসিক ব্যোমকেশ। ১৯৯৩ সালে গুণী নির্মাতা বাসু চ্যাটার্জি নির্মাণ করেন দীর্ঘ এক টিভি সিরিজ। ব্যোমকেশ হয়েছিলেন রজত কাপুর ও অজিত চরিত্রে কেকে রায়না। সে সময় ব্যোমকেশকে প্রায় কেউ মনে রাখেনি। বাসু চ্যাটার্জির ব্যোমকেশ তখন মনে করিয়ে দিয়েছিল বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের সবচেয়ে ম্যাচিওর চরিত্রটিকে। ৩৪ পর্বের টিভি সিরিজটি এখনো বেশ জনপ্রিয়। এখন পর্যন্ত ক্যামেরার সামনে যত ব্যোমকেশ এসেছে, তার মধ্যে বাসু চ্যাটার্জির ব্যোমকেশ আলাদা মনোযোগের দাবিদার।
(পরবর্তী পর্ব আগামী মঙ্গলবার)










