সাত দিন ধরে টানা বৃষ্টির কারণে ধান সেভাবেই রয়েছে। এরই মধ্যে স্তূপ করে রাখা ধান থেকে চারা গজিয়েছে। ধান পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
নেত্রকোনার মেদনী ইউনিয়নের বাসিন্দা সবুজ মিয়াও একই দুঃখের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘৩০০-৩৫০ মণ ধান ঘরে তোলার স্বপ্ন ছিল। এখন সেই ধানই শ্রমিক সংকটে কাটতে না পারায় বেশির ভাগ চোখের সামনে পচে যাচ্ছে। এত কষ্টের ফসল এভাবে নষ্ট হবে, কখনো ভাবিনি।’
শুধু জহিরুল ইসলাম কিংবা সবুজ মিয়া নন, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাজার হাজার কৃষকের সামনে তাদের স্বপ্নের পাকা ধান পানির নিচে নষ্ট হচ্ছে। হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটলেও এখন পানিতে নিমজ্জিত ধান শ্রমিক সংকটে কাটতে পারছেন না। এ দুই জেলায় বৃষ্টির কারণে এখনো প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর বোরো পাকা ধান পানির নিচে রয়েছে। চড়া সুদে নেয়া ঋণ, শ্রমিক সংকট এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে এখন চারদিকে কেবল হাহাকার।
নেত্রকোনা: জেলার ১০ উপজেলার মধ্যে মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি, কলমাকান্দা, বারহাট্টা, কেন্দুয়া, আটপাড়া ও জেলা সদরে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকরা। পূর্বধলার জারিয়া পয়েন্টে কংস নদীর পানি এবং খালিয়াজুরিতে ধনু নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার হাওরাঞ্চলে তলিয়েছে ১১ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান। তবে বাস্তবে আরো বেশি হবে বলে জানান স্থানীয়রা। হাওরে ৭১ ভাগ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি কৃষি বিভাগের।
চোখের সামনে মাঠের পর মাঠ কাঁচা-পাকা ধান এখনো পানির নিচে পচে নষ্ট হতে দেখে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন জেলার হাজারো প্রান্তিক কৃষক। জেলার বিভিন্ন হাওরপারের অনেক কৃষক কষ্ট করে ধান কেটে তুললেও সময়মতো শুকানো ও সংরক্ষণ করতে না পারায় সেই ধান স্তূপাকারে পচে যাচ্ছে। কোথাও উঠানে, কোথাও গোলাঘরের পাশে জমে থাকা ধানে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও হালকা রোদে ধান শুকানোর চেষ্টা চলছে। বহু কৃষকের মাঠের ধান এখনো কাটা হয়নি। শ্রমিকের অভাবে সেই ধানও পানিতে ও আর্দ্রতায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
চলতি মৌসুমে ধান কাটার জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব শ্রমিক রয়েছেন তাদের মজুরি সাধারণ কৃষকের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, আবারো বৃষ্টি হলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব ধান ঘরে তুলতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন তারা। তাদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। তবে নতুন করে বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আবারো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম। নেত্রকোনার আটপাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার আশ্বাস দিয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অফিস জানায়, জেলার হাওরে এখন পর্যন্ত বোরো ধান কাটা হয়েছে ৬৩ শতাংশ এবং পানিতে নিমজ্জিত ৭ শতাংশ। কাটা বাকি আছে ৩০ শতাংশ। গতকালও বৃষ্টিপাত হওয়ায় কৃষকরা ধান কাটতে পারছেন না। হাওরের একমাত্র ফসল পানিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মাথায় হাত।
ইটনার কৃষক মধু মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টি আমাদের ফসল কেড়ে নিয়েছে। এখন সারা বছরের খাবার ধান ঘরে তুলতে পারব না। আমার চার বিঘা জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। তিন বিঘার ফসল কোনো রকমে কেটেছিলাম। কীভাবে সারা বছর সংসার চলবে, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’
কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘জেলায় এবার ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। তার মধ্যে ৬৩ শতাংশ ফসল কাটা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকরা বিপাকে আছেন।










