ইউক্রেনে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত দুই বছরে ধারাবাহিকভাবে পশ্চিমা বিধিনিষেধের মুখোমুখি হয়ে আসছে রাশিয়া। এ নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যে, বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস খাতে উল্লেখযোগ্যভাবে আয় কমেছে। বিষয়টি স্বীকারও করে নিয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি গ্যাজপ্রম। ২৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার বার্ষিক হিসাবে লোকসানের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। তারা বলছে, মূলত পশ্চিমা চাপের কারণে গ্যাস রফতানি কমাতে বাধ্য হওয়ায় আয় ও মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে জ্বালানি তেল খাতে প্রবৃদ্ধি দেখেছে গ্যাজপ্রম। খবর আরটি।

গ্যাজপ্রম গ্রুপ জানিয়েছে, সর্বশেষ ১৯৯৯ সালে বছরওয়ারি আয়ে লোকসানে পড়েছিল। ওই সময় বৈদেশিক মুদ্রাজনিত ঋণের কারণে প্রভাবিত হয় কোম্পানিটি। এরপর গত বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় কমেছে।

আর্থিক প্রতিবেদনে গ্যাজপ্রম জানিয়েছে, ২০২৩ সালে কোম্পানির নিট লোকসানের পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার ৯০০ কোটি রুবল, যা মার্কিন মুদ্রায় ৬৭০ কোটি ডলার। এর এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২২ সালে গ্যাজপ্রমের নিট মুনাফা ছিল ১ হাজার ৩২০ কোটি ডলার।

এছাড়া ২০২২ সালে গ্যাজপ্রমের সামগ্রিক আয় ছিল ১২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। এর বিপরীতে ২০২৩ সালে আয় নেমে আসে ৯ হাজার ২০০ কোটি ডলারে।

প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছরে গ্যাস বিক্রি বাবদ গ্যাজপ্রমের আয় ৪০ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৭৪ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। তবে একই সময় বেড়েছে জ্বালানি তেল থেকে আয়। এ খাতে ৪ শতাংশ আয় বেড়ে ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ৯ শতাংশ বেড়েছে পাওয়ার ইউটিলিটি ব্যবসা, এ খাতে ২০২৩ সালে আয় হয়েছে ৬৬০ কোটি ডলার।

গ্যাজপ্রমের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। নিট লোকসানের খবর প্রকাশের পর কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে ৪ শতাংশেরও বেশি।

রাশিয়ার গ্যাসের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলো। কিন্তু গত দুই বছর হাতছাড়া হয়েছে বাজারটি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমাদের লাগাতার নিষেধাজ্ঞার হুমকি উপেক্ষা করে ইউক্রেনে হামলা করে রাশিয়া। এ সময় সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর কারণে ইইউর বাজারে গ্যাস রফতানি রাতারাতি হ্রাস পায়।

২০২৩ সালে বিদেশে কী পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি করেছে গ্যাজপ্রম, সে তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। তবে রয়টার্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছর ইউরোপে গ্যাজপ্রমের প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছিল ২৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ঘন মিটারে (বিসিএম)। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) তথ্যানুসারে, ১৯৭০-এর দশকের শুরু থেকে রাশিয়ার গ্যাস রফতানি সর্বনিম্ন স্তরে নেমে আসে ২০২৩ সালে।

একসময় ইউরোপের বাজারে একচেটিয়াভাবে গ্যাস রফতানি করত গ্যাজপ্রম। তবে বর্তমানে দেশীয় বাজারের দিকে নজর দিয়েছে। রাশিয়াজুড়ে গৃহস্থালি গ্যাস সরবরাহের কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে রয়টার্স।

এদিকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রচলিত বাজার হারালেও বিকল্প খুঁজে নিতে দেরি করেনি গ্যাজপ্রম। এশিয়ার বাজারকে সামনে রেখে এ দুই বছরে জ্বালানি খাত পুনর্গঠন করেছে মস্কো। এ সময় রাশিয়ার অন্যতম বড় ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। পূর্বাভাস অনুসারে, পাওয়ার অব সাইবেরিয়া পাইপলাইন সম্পূর্ণরূপে চালু হলে চীনে রুশ গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ বার্ষিক প্রায় ১০০ বিসিএমে পৌঁছে যাবে। এতে রুশ গ্যাস কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের পুরনো অবস্থানকে পুরোপুরি দখল করে নেবে চীন।

এশিয়ার বাজার নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা আগেই খোলাসা করেছে গ্যাজপ্রম। সম্প্রতি সেন্ট পিটার্সবার্গভিত্তিক বহুজাতিক এ কোম্পানির সিইও আলেক্সি মিলার বলেছেন, ইইউর বাজার প্রতিস্থাপনের কৌশলের অংশ হিসেবে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা আরো জোরদার করবে গ্যাজপ্রম।

এদিকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রুশ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এর মূল কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে রাশিয়ার উপস্থিতি। যুদ্ধের আগে রাশিয়ার জ্বালানি তেলের মূল ক্রেতা হিসেবে ইউরোপ থাকলেও তখন সামনে চলে আসে চীন। একই সময় থেকে দেশ দুটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক দেখিয়ে আসছে।