তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) ২০২৫-২৭ নির্বাচন উপলক্ষে ৯ দফা প্রস্তাব দিয়েছে রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খানের (বাবু) নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকেন্দ্রিক জোট ফোরাম। নির্বাচনে জিতে এলে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছে এ জোটটি। আগামী ৩১ মে বিজিএমইএর দুই বছর মেয়াদি পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

রোববার (১১ মে) রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফোরাম জোটের ৯ দফা কৌশলগত প্রস্তাব উপস্থাপন করেন এ জোটের প্যানেল লিডার মাহমুদ হাসান খান।

তিনি বলেন, দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বিজিএমইএ গড়ে তুলতে ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির স্বার্থে সামনে থেকে সংগঠনটিকে নেতৃত্ব দিতে হবে। আমাদের প্রার্থীরা পর্ষদে ফিরে এলে তাদের হাতে গড়ে উঠবে আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক বিজিএমইএ এবং ফিরে আসবে হারানো ঐতিহ্য ও সুনাম।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পোশাক খাতে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পোশাক খাতের অগ্রযাত্রা, উন্নয়ন ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে আমাদেরকে বেশ কিছু অগ্রাধিকার দিক বিবেচনা করতে হবে। সে লক্ষ্যে আমরা কয়েকটি কৌশলগত প্রস্তাব উপস্থাপন করছি। নির্বাচনে জয়ী হলে আমরা এ প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করব। প্রস্তাবগুলো হলো—

পোশাক শিল্পের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন

পোশাক শিল্পের অগ্রযাত্রার জন্য সরকারের নীতি সহায়তা চলমান থাকতে হবে। এ মুহূর্তে পোশাক শিল্প সম্পর্কিত যেকোনো সমস্যার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী হতে হয়। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অনেক বিষয়ের কারণে ব্যাপক সময় ব্যয় করতে হয়। যেখানে শুধুমাত্র পোশাক শিল্পকে যথেষ্ট সময় দেয়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব হয় না। পোশাক শিল্পের সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আমাদের অনেক দিনের। আমাদের প্রস্তাব, এ লক্ষ্যে নতুন কোনো মন্ত্রণালয় না করে বস্ত্র মন্ত্রণালয়কে পুনঃগঠন করে ‘‌বস্ত্র ও পোশাক শিল্প মন্ত্রণালয়’ গঠন করা দরকার।

এসএমই, নন-বন্ড ফ্যাক্টরি ও নতুন উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ সহায়তা

পোশাক খাতের ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের চ্যালেঞ্জ অনেক দিনের। আমাদের মনে রাখা দরকার, আজকের ছোট শিল্পই আগামী দিনের বড় শিল্পে পরিণত হবে। তাই এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থ্য করা জরুরি। একই সঙ্গে তাদের প্রযুক্তি সহায়তা ও বাজারগম্যতা বৃদ্ধিতে বিশেষ তহবিল গঠন করা দরকার।

কাস্টম অটোমেশন ত্বরান্বিতকরণ

কাস্টমস নিরীক্ষা (অডিট) নিয়ে আমাদের হয়রানি থামছে না। আমরা এ হয়রানিতে যেতে চাই না। প্রয়োজনে সর্বোচ্চ র‌্যাংকধারী অডিট ফার্ম নিয়োগ দিয়ে অডিট প্রক্রিয়া আউটসোর্সিং করতে হবে। ডিজিটাল ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম চালু করে আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায় সময় ও ব্যয় কমানো দরকার।

শিল্পের নিরাপত্তা, শ্রম অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষা

আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের বয়স ৪৫ বছর। তবে এখনো খাতটি টেকসই করে গড়ে তোলা যায়নি। পোশাক খাত টেকসই করতে আমাদের শিল্পের নিরাপত্তা, শ্রম অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষা—এ তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য দরকার সমন্বিত সুশাসন ও কমপ্লায়েন্স সনদ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। এ লক্ষ্যে শিগগিরই উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করি।

প্রকৃত রফতানিকারকদের সদস্যপদ নিশ্চিতকরণ

বিজিএমইএর সদস্য সংখ্যা বর্তমানে ৭ হাজারের বেশি। কিন্তু বিগত বছরে অনেককেই সদস্য করা হয়েছে নির্দিষ্ট মানদণ্ড উপেক্ষা করে। এগুলো কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে। কোনো একটি কারখানায় দুর্ঘটনা সংগঠিত হলে, তার দায় পুরো খাতের ওপর চলে আসবে। নির্দিষ্ট মানদণ্ড উপেক্ষা করে সদস্য পদ দেয়া থেকে ফোরাম বিরত থাকবে।

প্রধান রফতানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ও পণ্যের বহুমুখীকরণ

বংলাদেশের পোশাকের বাজারের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। বাজার বহুমুখীকরণের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে চাই। আমর কটন ভিত্তিক পণ্য থেকে মেন মেইড ফাইবার পণ্যের দিকে নজর দিতে চাই।

নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা

আমরা যারা নির্বাচিত হতে চাই, তারা মালিক-উদ্যোক্তাদের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকি। কিন্তু নির্বাচনের পর তা ভুলে যান অনেকে। ফোরাম থেকে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হবে, তা বাস্তবায়ন করা এবং সদস্যদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তদারকি করার জন্য প্রতিজন নির্বাচিত পরিচালক ৫০ থেকে ৭০টি কারখানার দায়িত্বে থাকবেন। অনেকটা বছজাতিক কোম্পানির রিলেশনশিপ ম্যানেজার বা পরিচালকের মতো দায়িত্ব পালন করা।

শিল্পাঞ্চল ভিত্তিক ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেল

বিজিএমইএর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেল এখন কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয়। এটিকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। শিল্পাঞ্চলভিত্তিক সেল গড়ে তোলা হবে, দায়িত্ব দেয়া হবে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিচালকদের। সঙ্গে বিজিএমইএর কর্মকর্তারা ও শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারাও সম্পৃক্ত থাকবেন। যেকোনো সমস্যায় যাতে তারা দ্রুত উদ্যোগ নিতে পারে, সেজন্য অঞ্চলভিত্তিক ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেল গঠনের কথা বলছি আমরা।

এক্সিট পলিসি

মালিক-উদ্যোক্তার অনিয়ন্ত্রিত কারণে কোনো শিল্প রুগ্ন হলে, তার এক্সিট সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি নীতিমালা রয়েছে, যেটা যথেষ্ট নয়। আমরা একটি বাস্তবমুখী এক্সিট পলিসি চাই।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন ফোরামের মহাসচিব ড. রশিদ আহমেদ হোসাইনী, প্রধান নির্বাচন সমন্বয়ক ফয়সাল সামাদ প্রমুখ।