দেশের কৃষি অর্থায়নে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। গত দুই বছরে ৮ হাজার ৫০০ এর বেশি কৃষক পরিবারের মাঝে মোট ৫৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকটি। এতে প্রায় ৩৫ হাজার গ্রামীণ মানুষের জীবন ও জীবিকা উন্নত হয়েছে।

এই অর্থায়ন কর্মসূচি বিশেষ করে প্রান্তিক ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। ব্র্যাক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই প্রান্তিক ও ছোট কৃষকদের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। ব্যাংকের নিজস্ব ডিজিটাল কৃষিঋণ প্ল্যাটফর্ম ‘সুবিধা’র মাধ্যমে কৃষকরা মাত্র ২০ মিনিটে শাখায় না গিয়ে ঋণ নিতে পারছেন। এতে তাদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

এই ফিনটেক ভিত্তিক মডেল শুধু অর্থায়ন নয়, প্রযুক্তি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতেও সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিতে অবদান রেখে আসা কৃষকদের আত্মবিশ্বাস ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে এটি।

ব্র্যাক ব্যাংক কৃষকদের কাছে আরো সহজে পৌঁছাতে সিনজেনটা, আইফার্মার, পেট্রোকেম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ বহু প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কৌশলগত চুক্তি করেছে। এর মাধ্যমে ২২টি জেলায় ৩ হাজার ২৫৬ জন কৃষকের মাঝে ১৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে। এসব ঋণ গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ, হলুদ চাষ ও অন্যান্য কৃষি কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে।

ব্যাংকের সহায়তায় ১ হাজার ৮৪৪ জন কৃষক ৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকার ঋণ পেয়েছেন। এতে তাদের ফসল উৎপাদনশীলতা বেড়ে টেকসই জীবিকা নিশ্চিত হয়েছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ২৫১ জন কৃষককে ভুট্টা, পেঁয়াজ, আলু ও ধান চাষে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। চরাঞ্চলের গাইবান্ধায় ৭০ জন গবাদিপশু খামারিকে পরীক্ষামূলকভাবে ৫১ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। খুলনা ও সাতক্ষীরায় ১৩৪ জন কৃষক জলবায়ু-সহনশীল কৃষি অর্থায়ন পেয়েছেন।

গবাদিপশু ও দুগ্ধ খাতে গতি এনেছে ব্যাংকটি। ৫৫২ জন কৃষকের মাঝে ৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কৃষকদের সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সুবিধা মিলেছে।

ধান, গরু, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, হলুদ, বাদাম, সয়াবিন, মরিচ, রসুনসহ বিভিন্ন ফসল ও খাতে মোট ৮ হাজার ৪১০টি ঋণ দেয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশের কৃষকের জীবন ও জীবিকায় আমূল পরিবর্তন এসেছে।

এই ঋণগুলোও কৃষকদের একেকটি সংগ্রামের গল্প বলে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের কয়েকটি সফল গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সাতক্ষীরার কৃষক স্বপ্না পারভিন মাত্র ৫১ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে কাঁকড়া চাষ শুরু করেছিলেন। ছয় মাসের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করে ব্যবসা বাড়িয়েছেন। দুই নারীরও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখন সবাই আমাকে আমার এলাকায় নেতা মনে করে। আমি সিজনাল কাজে নির্ভরশীল নই, বরং বছরজুড়েই আয় করছি।’

রংপুরের মো. নাজমুল ইসলাম উন্নত বীজ ও সেচ ব্যবস্থার কারণে এক মৌসুমে ফসলের ফলন দ্বিগুণ করতে পেরেছেন। তিনি ঋণ থেকে মেশিন কিনে মেয়েকে কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। নাজমুল বলছেন, ‘ব্র্যাক ব্যাংক আমাকে আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ দিয়েছে।’

ব্র্যাক ব্যাংকের মডেল প্রমাণ করেছে, সময়োপযোগী, সহজলভ্য আর অভিজ্ঞতাভিত্তিক অর্থায়ন শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, টেকসই উন্নয়নের শক্তিশালী চালিকা শক্তি।

বর্তমানে ব্যাংক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রিস্ক স্কোরিং ও রিয়েল-টাইম ডিসিশন টুল নিয়ে কাজ করছে, যা চালু হলে গ্রাহকরা আরো দ্রুত ও ভালো সেবা পাবেন। ব্র্যাক ব্যাংকের লক্ষ্য কৃষকদের অ্যাগ্রি-এন্টারপ্রাইজ গঠন, রফতানি মার্কেটে প্রবেশ ও ভ্যালু চেইনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

এই উদ্যোগ এসেছে ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের ‘ব্যাংকিং দ্য আনব্যাংকড’ দর্শনের আলোকে। যখন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছে, তখন ব্র্যাক ব্যাংকের এই অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃষি অর্থায়ন মডেল গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা ও টেকসইতা নিয়ে এসেছে। এভাবেই বাংলাদেশের হাজার হাজার কৃষক ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

—বিজ্ঞপ্তি