লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর ও আরব সাগরে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় একাধিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ইরানের সরাসরি হস্তক্ষেপ। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালির কাছে ইসরায়েলসংশ্লিষ্ট পণ্যবাহী জাহাজ জব্দের দাবি করেছে ইরান। এতে এ অঞ্চলের সমুদ্রপথ ঘিরে বিদ্যমান সংকটের মাঝে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি চালু রাখতে জাতিসংঘের পদক্ষেপ চেয়েছে শীর্ষ শিপিং সংস্থাগুলো। খবর ইউরো নিউজ।
গত বছরের শেষদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হলে এশিয়া ও ইউরোপের অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ বিকল্প পথ বেছে নেয়। আফ্রিকার আশপাশের ওই রুটে অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হচ্ছে জাহাজগুলোকে। ফলে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ উভয় বেড়েছে। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রুট পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট শিপিং সংস্থাগুলো।
সম্প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেসকে উদ্দেশ করে চিঠি লেখে শিপিং কোম্পানিগুলোর কয়েকটি পক্ষ। চিঠিতে স্বাক্ষর করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ওয়ার্ল্ড শিপিং কাউন্সিল, ইউরোপিয়ান কমিউনিটি শিপওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (ইসিএসএ) ও ডজনের বেশি অন্যান্য শিল্প গ্রুপ।
চিঠিতে বলা হয়েছে, পণ্যবাহী জাহাজের ওপর সম্প্রতি উদ্বেগজনকভাবে আক্রমণ বেড়েছে। জাহাজ আটকে রাখার পাশাপাশি কর্মীদেরও জিম্মি করা হচ্ছে। জিম্মির ঘটনার স্থলভাগের মতো সমুদ্রেও আশঙ্কাজনক।
ইরানের জব্দ করা জাহাজের কথা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, ‘চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ ও তাদের ক্রুদের জিম্মি করা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে তাদের সবার জন্য একই ধরনের প্রতিক্রিয়া বা উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।’
বাণিজ্যপথের সংকট নিয়ে ইসিএসএ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে শিপিংয়ের খরচ বেড়েছে। এতে হুমকির মুখে ইউরোপীয় বাণিজ্য প্রবাহ।
সংস্থাটির সেক্রেটারি জেনারেল সোতিরিস রাপ্টিস বলেছেন, ‘এ অঞ্চলের পরিস্থিতি আমাদের নাবিকদের বিপদে ফেলেছে এবং ইউরোপের সরবরাহ চেইন তথা সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে ক্রমবর্ধমানভাবে প্রভাবিত করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সমুদ্রযাত্রায় নাবিকদের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া মূল শিপিং রুট ও জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতায় আন্তর্জাতিক নীতি রক্ষা করা অপরিহার্য। আমরা কূটনৈতিকসহ সব সমন্বিত প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করছি, যা এ অঞ্চলের চলমান সংকট হ্রাসে অবদান রাখতে পারে।’
কয়েক দিন আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরএনএ জানায়, পারস্য উপসাগর ছেড়ে যাওয়ার সময় ১৩ এপ্রিল সকালে হরমুজ প্রণালির কাছ থেকে পর্তুগিজ পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ জব্দ করে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। জাহাজটির নাম এমএসসি এরিস। শিপিং কোম্পানি জোডিয়াক মেরিটাইমের এ জাহাজে ইসরায়েলি ধনকুবের ইয়াল ওফারের আংশিক শেয়ার রয়েছে।
জাহাজটি জব্দের খবর নতুন করে অস্বস্তি বাড়িয়েছে শিপিং খাতে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজায় ইসরায়েলি হামলার পর থেকেই তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ছে তেল আবিবের। হুথিদের আক্রমণে ইরানের সমর্থন আছে বলা হলেও দেশটি কখনো বিষয়টি স্বীকার করেনি। এরই মধ্যে ১ এপ্রিল সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইরানের কনসুলেটে হামলা হয়। ওই হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে তেহরান। এর প্রতিশোধ হিসেবে পাল্টা হামলাও চালিয়েছে ইরান। পরে ইরানের ইস্পাহানে পুনরায় হামলা চালায় ইসরায়েল। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি প্রভাব ফেলেছে সমুদ্রপথে। ধারণা করা হচ্ছে, শিগগিরই এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
বিস্তৃত এ অঞ্চলে তীব্র সংঘাতের কারণে ইউরোপীয় বাণিজ্য প্রবাহ অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছে। এছাড়া আফ্রিকার আরো বেশিদিন রুট ব্যবহার করতে হলে ভবিষ্যতে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই জাতিসংঘের কাছে পদক্ষেপ চাইছে শিপিং সংস্থাগুলো।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে লোহিত সাগরে নৌবাহিনী মোতায়েন করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। মিশনের নাম দেয়া হয় ‘অ্যাসপিডস’। ইইউর এমন উদ্যোগকে তখন স্বাগত জানিয়েছিল ইসিএসএ।










