দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে তুরস্কের ওপর ইসরায়েলের নির্ভরশীলতা ক্রমেই বেড়ে চলছিল। আঙ্কারার রফতানির তালিকাও বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। এতে রয়েছে ডিম, শাকসবজি ও কাপড়ের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে ইলেকট্রনিক, লোহা, প্লাস্টিক ও ইস্পাতের বিভিন্ন খাতের পণ্য। দুই দেশের এ বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন না হলেও কভিড-১৯ মহামারীকাল থেকে নতুন মোড় নেয়। তুরস্ক সম্প্রতি সেই বাণিজ্য স্থগিত করায় ইসরায়েলের লোহা, ইস্পাত, পরিবহন ও ইলেক্ট্রনিক খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। খবর দ্য ন্যাশনাল।
গাজায় নিরবচ্ছিন্নভাবে মানবিক সহায়তা প্রবাহের অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ রাখবে বলে জানিয়েছে তুরস্ক। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুসারে, ‘বাণিজ্য স্থগিতের আওতায় সব ধরনের পণ্য পড়বে। গাজায় নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবাহের সুযোগ না দেয়া পর্যন্ত তুরস্ক কঠোর ও সন্দেহাতীতভাবে বাণিজ্য স্থগিতের এ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করবে।’
এ সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের সমালোচনা করেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। পাশাপাশি বিকল্প সরবরাহ খুঁজতে ও স্থানীয় উৎপাদনে জোর দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
অনমনীয় অবস্থা ও সম্ভাব্য বিকল্প অনুসন্ধান সত্ত্বেও বাণিজ্য স্থবিরতার প্রভাব যুদ্ধের বোঝা ঘাড়ে চাপা ইসরায়েলের ওপর ব্যাপক হতে পারে। কারণ ভৌগোলিক নৈকট্য, প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন খরচ ও গুণগত মানের কারণে তুরস্ক কয়েক বছরে ইসরায়েলে শীর্ষ রফতানিকারক হয়ে উঠেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালে তুরস্ক থেকে ইসরায়েলে রফতানি হওয়া পণ্যের মূল্য ছিল ২৩৯ কোটি ডলার, যা ২০২২ সালে ৭০৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছিল।
এর মধ্যে ২০২২ সালে লোহা ও ইস্পাত বিক্রিতে ইসরায়েলে শীর্ষ অবস্থান ছিল তুরস্কের, যার মূল্য প্রায় ১১৯ কোটি ডলার। দ্বিতীয় স্থানে ছিল ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ডলারের যানবাহন। এর পরেই রয়েছে ৫১ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলারের প্লাস্টিক ও ৩৮ কোটি ৪৫ লাখ ৯০ হাজার ডলারের ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম।
তুরস্কের পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল ৬৮০ কোটি ডলারের বেশি। এর ৭৫ শতাংশেরও বেশি ছিল তুরস্কের রফতানি।
মূলত মহামারীর সময়ে চীনের বাইরে বিকল্প বাণিজ্য উৎস হিসেবে ইসরায়েলের জন্য তুরস্ক আকর্ষণীয় হয়ে উঠে। ইসরায়েলি লজিস্টিক ও সরবরাহ চেইন ফার্ম গাশ ওয়ার্ল্ডওয়াইড গত বছর বলেছিল, চীনে প্রচুর উৎপাদন হলেও সে তুলনায় তুরস্কের কারখানায় উৎপাদিত পণ্য উন্নত মানের ও দীর্ঘস্থায়ী। এছাড়া পরিবহনের সময় ও খরচ তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী।
এখন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্থগিত হওয়ার পর রফতানিকারকরা বিকল্প পথ খুঁজছেন। তুরস্ক ও ইসরায়েল উভয় দেশে রফতানি করে এমন আমস্টারডামভিত্তিক খাদ্য প্যাকেজিং ও মসলা কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার অনুজ গুলাটি বলেন, ‘আমরা তুরস্কের পাশাপাশি ইসরায়েল থেকে ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করেছি। বর্তমানে আমাদের চালান তুরস্কের কাস্টমসে রয়েছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা নেই। ইসরায়েলে আমাদের পণ্য সরবরাহ করার জন্য মিসর বা লেবাননের মধ্য দিয়ে বিকল্প পথ খুঁজতে হতে পারে।’
তুরস্ক-ইসরায়েল রুটের মাধ্যমে ফিলিস্তিনেও পণ্য পাঠিয়ে থাকেন গুলাটি। তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য স্থগিতাদেশ ফিলিস্তিনের পণ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলবে। কারণ তাদের ইসরায়েলি শুল্ক ছাড়পত্রের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।’
তুরস্কের একটি চকোলেট ও মিষ্টান্ন রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলের বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন করে, তারা সম্পূর্ণ হিব্রুতে প্যাকেজিংও করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বলেন, ‘ইসরায়েলে এমন কিছু সংস্থা রয়েছে যেগুলোর কাছ থেকে আমাদের অর্থ পাওনা রয়েছে। বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেলে এ প্রাপ্যগুলোর কী হবে?’
১৯৯৩ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নত করতে গঠন করা হয় তুরস্ক-ইসরায়েল বিজনেস কাউন্সিল। ডিজিটাল পেমেন্ট প্রযুক্তি থেকে ধাতব প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন খাতের কোম্পানি এ কাউন্সিলের অন্তর্ভুক্ত। স্থগিতাদেশের ঘোষণার পর কাউন্সিল সব পণ্যের রফতানি ও আমদানি বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৭ সাল থেকে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চালু রয়েছে। এছাড়া ২০২২ সালে চালু হয় কূটনৈতিক সম্পর্ক। তবে গাজা যুদ্ধ শুরু এবং ইস্তানবুল ও তেল আবিবের মধ্যে ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার পর পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হয়ে ওঠে। তা সত্ত্বেও দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদার একই ছিল। এরপর এপ্রিলে গাজায় আকাশ থেকে সাহায্য দেয়ার অনুমতি না পাওয়ায় ৫৪টি পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ দেয় তুরস্ক। এর আওতায় ছিল মার্বেল, সিমেন্ট, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো নির্মাণসামগ্রী। এখন সব বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করল আঙ্কারা।










