নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে সুতার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত এক মাসের ব্যবধানে এখানে সব কাউন্টের সুতার দাম বেড়েছে ৩-১২ টাকা। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সুতার মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলা ও সুতার বাড়তি দাম এবং করোনা মহামারীর মধ্যে দেশের গার্মেন্টসগুলোয় পর্যাপ্ত রফতানি চাহিদা বজায় থাকাকে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, চাহিদা যত বাড়ছে টানবাজারে সুতার দাম ততই চাঙ্গা হয়ে উঠছে। যা আগামী দিনগুলোয় বর্তমানের তুলনায় আরো বাড়তে পারে।

গতকাল টানবাজারে সুতার দোকানগুলো ঘুরে ১০ কাউন্টের প্রতি পাউন্ড সুতা মানভেদে ৩৭-৫৩ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। এক মাস আগেও একই কাউন্টের সুতা পাউন্ডপ্রতি ৩৪-৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এক মাসের ব্যবধানে ১০ কাউন্টের সুতার দাম পাউন্ডে ৩ টাকা বেড়েছে।

বর্তমানে টানবাজারে ২০ কাউন্টের সুতা বেচাকেনা হচ্ছে পাউন্ডপ্রতি ৭২-৭৯ টাকায়। একই মানের সুতা ২০-২৫ দিন আগেও বেচাকেনা হয়েছিল পাউন্ডপ্রতি ৬৭-৭৫ টাকায়। সে হিসাবে টানবাজারে ২০ কাউন্টের সুতার দাম পাউন্ডপ্রতি সর্বোচ্চ ৫ টাকা বেড়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বাড়তির দিকে রয়েছে রফতানিযোগ্য ৩০, ৩২ ও ৪০ কাউন্টের সুতার দাম। গতকাল এক্সপোর্ট কোয়ালিটির এসব সুতা পাউন্ডপ্রতি ১১০-১১২ টাকায় বিক্রি হয়। এক মাস আগেও এসব সুতার দাম ছিল পাউন্ডপ্রতি ১০০ টাকা। অর্থাৎ, মাসের ব্যবধানে টানবাজারে রফতানিযোগ্য কয়েকটি কাউন্টের সুতার দাম পাউন্ডে সর্বোচ্চ ১২ টাকা বেড়েছে।

গতকাল বাজার ঘুরে ৪০ কাউন্টের সুতা পাউন্ডপ্রতি ১৩৫-১৪৭ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। একই কাউন্টের সুতা ১৫-১৬ দিন আগেও ১৩০-১৪৩ টাকায় বেচাকেনা হয়েছিল। সে হিসাবে ৪০ কাউন্টের সুতার দাম পাউন্ডে সর্বোচ্চ ৫ টাকা বেড়েছে।

একইভাবে দাম বেড়েছে ৬০ ও ৮০ কাউন্টের সুতার। এদিন ৬০ কাউন্টের সুতা পাউন্ডপ্রতি ১৬০-১৭০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। ২০-২৫ দিন আগেও এ মানের সুতা পাউন্ডপ্রতি ১৫৫-১৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। অন্যদিকে সর্বশেষ কার্যদিবসে ৮০ কাউন্টের প্রতি পাউন্ড সুতা বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ২৪৫ টাকায়। এক মাস আগে ৮০ কাউন্টের প্রতি পাউন্ড সুতার সর্বোচ্চ দাম ছিল ২৩৮ টাকা। এ মানের সুতার দাম পাউন্ডে ৭ টাকা বেড়েছে।

টানাবাজরে সুতার ব্যবসা করেন সুলতান আহমেদ। করোনাকালীন হতাশার কথা জানিয়ে এ ব্যবসায়ী বণিক বার্তাকে বলেন, করোনা মহামারী টানবাজারে সুতার বেচাকেনা কার্যত স্থবির করে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায় মন্দা ভাব বজায় ছিল। আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ পরিস্থিতিতে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার চিন্তাভাবনা করেছেন।

এক-দেড় মাস ধরে টানাবাজারে সুতার বেচাকনোয় গতি ফিরে এসেছে বলে জানান সুলতান আহমেদ। তিনি বলেন, এক-দেড় মাসে ব্যবসা পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। বেড়েছে সুতার দাম। এ সময় সবচেয়ে বেশি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে রফতানিযোগ্য ৩০, ৩২ ও ৩৪ কাউন্টের সুতার দাম। দেশীয় গার্মেন্টসগুলোয় বাড়তি অর্ডার আসায় তারা এ তিন কাউন্টের সুতা কেনা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে এসব সুতার দাম।

সুতার সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিটন সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, করোনা মহামারীর প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ওঠার পর দেশীয় গার্মেন্টসগুলোয় অর্ডার বাড়তে শুরু করেছে। আর দেশের গার্মেন্টসগুলোয় ৩০, ৩২ ও ৩৪ কাউন্টের সুতার চাহিদা বেশি। এ বাড়তি চাহিদা টানবাজারে দীর্ঘদিন পর সুতার দাম চাঙ্গা করে তুলেছে। এক মাসের ব্যবধানে তা সর্বোচ্চ ১২ টাকা বেড়েছে।

দেশীয় গার্মেন্টসগুলোয় চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি সুতার সাম্প্রতিক দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার ধারাবাহিক বাড়তি দাম। ইন্টারন্যাশনাল কটন অ্যাডভাইজরি কমিটির তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি তুলার গড় দাম ছিল ১ ডলার ৬৫ সেন্ট, যা আগের মাসের তুলনায় ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। নভেম্বরে সুতা তৈরির এ কাঁচামালটির গড় দাম আগের মাসের তুলনায় আরো ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ১ ডলার ৭১ সেন্টে উন্নীত হয়েছে। দেশের বাজারে সুতার দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে এর সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে।

এ বিষয়ে লিটন সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, তুলার দামে ওঠানামার সঙ্গে দেশে সুতার বাজারে মূল্যনির্ধারণের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালটির ধারাবাহিক বাড়তি দাম দেশে সুতার দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনা মহামারীর শুরুর দিকে দেশে তাঁতগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গার্মেন্টসের বাইরে থেকে অর্ডার আসাও কমে গিয়েছিল। ধাক্কা সামলে এখন বস্ত্র উৎপাদন শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করায় টানবাজারে সুতার চাহিদা, বেচাকেনা ও দাম—সবকিছুই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। চাহিদা বৃদ্ধির এ হার ধরে রাখা সম্ভব হলে আগামীতে সুতার দাম আরো বাড়তে পারে।